প্রথম বিশ্বকাপে একটা ব্যাপারে সংগঠকদের হুঁশ ছিল না—তৃতীয় স্থানাধিকারীর জন্য নির্বাচন ব্যবস্থা। সেমিফাইনালে যুগোশ্লাভিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একই ফল, ১—৬ গোলে হারে এবং তাদের মধ্যে প্লে—অফ খেলা হয়নি। তবে গ্রুপের খেলায় যুক্তরাষ্ট্রের গোলের গড় একটু ভাল থাকায় তারা হয়তো তৃতীয় স্থান দাবি করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ইওরোপে অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই একমত হলেও কোন দেশে সেটি হবে স্থির করার জন্য ফিফা—কে দীর্ঘ আটটি বৈঠক করতে হয়। অবশেষে স্থির হয় ১৯৩৪—এ দ্বিতীয় বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নশিপ হবে ইতালিতে।
১৯৩৪
ইতালি
ইতালিতে তখন মারমুখো ফাসিস্ত দলের রাজত্ব। দলের প্রধান বেনিতো মুসোলিনির একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ইতালিকে বলশালী, সমৃদ্ধবান, মহান ও স্বাধীন রূপে বিশ্বে জাহির করা। বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের সুযোগটা পেয়ে তিনি অকাতর অর্থব্যয়ে একে স্মরণীয় ও বিশাল উৎসবের আকার দিতে মনস্থ করলেন ফাসিস্ত মতবাদের গৌরব প্রকাশের জন্য। আর এটাও সেইসঙ্গে বোঝা গেল, মুসোলিনি চাইছেন ইতালি বিশ্বকাপ জয় করুক—যে কোন মূল্যে।
ফিফার সদস্য সংখ্যা তখন ৪৬। নাম দিয়েছিল ২৯টি দেশ। চূড়ান্ত পর্বের ১৬টি দেশকে বাছাইয়ের জন্য বিশ্বের নানা দেশে যোগ্যতা নির্ধারক খেলা হয়। ঠিক হয় ১৬টি দেশের মধ্যে সোজা নকআউট পদ্ধতিতে, আটটি প্রথম রাউণ্ডের চারটি দ্বিতীয় রাউণ্ডের, দুটি সেমিফাইনালের ও ফাইনালের খেলা হবে। প্রথম বিশ্বকাপের গ্রুপ পদ্ধতিতে খেলার ব্যবস্থাটা এবার বাতিল হয়ে গেল। তৃতীয় স্থানাধিকারী নির্ণয়ের জন্য পরাজিত দুই সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে খেলার ব্যবস্থাও রাখা হল।
চার বছর আগে ইওরোপের দেশগুলি অবহেলা দেখিয়ে যে ব্যবহার করেছিল উরুগুয়ে তা ভোলেনি। তাই তারা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ বর্জন করে। অবশ্য অন্য কারণও ছিল। টাকার ব্যাপারে তাদের দেশের খেলোয়াড়রা তখন ধর্মঘটের হুমকি দিচ্ছে, তাছাড়া দুটি ওলিম্পিক ও বিশ্বকাপ জেতান খেলোয়াড়রা অবসর নেওয়ায় উরুগুয়ে খুব দুর্বলও হয়ে পড়েছিল। আর্জেন্তিনা একটা কাঁচা দল পাঠায় এই ভয়ে যে, ভাল খেলোয়াড় পাঠালেই তো ইতালীয় ক্লাবগুলো টাকার জালে তাদের ধরে নেবে! এই ভয়টা মোটেই অমূলক নয়। ১৯৩০ ফাইনালের আগে উইঙ্গার ওরসিকে তারা হারিয়েছে। তারপর হারিয়েছে সেণ্টার হাফ অধিনায়ক মন্তি এবং অপর উইঙ্গার গুইতাকে। ইতালির ম্যানেজার এবং ফুটবলের অন্যতম প্রবাদপুরুষ ভিত্তোরিও পোজ্জো তার দলে এই তিনজনকে স্থান দিলেন ‘ওরিউণ্ডি’ অর্থাৎ ইতালিয়ানদের সন্তান হিসাবে। দুটি দেশের হয়ে যারা বিশ্বকাপে খেলেছে মন্তি হলেন তাদের মধ্যে প্রথমজন।
চূড়ান্ত পর্বে খেলার জন্য ইতালিতে হাজির হয় ষোলর বদলে সতেরোটি দেশ। বাড়তি অতিথিটি যুক্তরাষ্ট্র। এত দেরি করে তারা নাম পাঠায় যে যোগ্যতা নির্ধারক পর্বে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এসে যখন পড়েছে তখন কি আর করা যায়, তাদের জন্য একটা বিশেষ যোগ্যতা নির্ধারক খেলার ব্যবস্থা হল মেক্সিকোর সঙ্গে। হাইতি আর কিউবাকে হারিয়ে মেক্সিকো ইতালিতে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা ২—৪ গোলে হেরে বিদায় নিল।
দ্বিতীয় বিশ্বকাপ রোমে শুরু হল ইতালি আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ম্যাচটি দিয়ে আর ইতালি জিতল ৭—১ গোলে। শিয়াভিও হ্যাটট্রিক করল। অনুষ্ঠাতাদেশ এখন যেমন সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে খেলে তখন সেই নিয়ম ছিল না। ইতালিকে যোগ্যতা নির্ধারক পর্বে খেলতে হয়েছিল গ্রীসের সঙ্গে এবং সহজেই ম্যাচদুটি জেতে। পোর্তুগালকে প্রথম ম্যাচে ৯—০ গোলে হারিয়ে রিটার্ন ম্যাচে স্পেন ১—২ হেরে যায়। তখন ঠিক হয় স্পেনই ইতালিতে খেলতে যাবে এবং বিশ্বকাপে তারাই প্রথম দল যারা গোলের গড় ভাল থাকার জন্য চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা পায়। বিশ্বকাপের একটি ম্যাচে চারটি গোল দেওয়া প্রথম লোক আইরিশ ফ্রি স্টেটের অর্থাৎ এখনকার আয়ারল্যাণ্ড প্রজাতন্ত্রের প্যাডি মুর। যোগ্যতা পর্বে বেলজিয়ামের সঙ্গে ৪—৪ ফলে তার নিজের দলের সবকটি গোলই মুরের। আয়ারল্যাণ্ড অবশ্য ইতালি যেতে পারেনি হল্যাণ্ডের কাছে হেরে যাওয়ায়।
প্যারিসে ১৯২৪ ওলিম্পিকে পদক জিতবে বলে খেলতে গিয়ে হাঙ্গেরি দল প্রথম রাউণ্ডেই অখ্যাত মিশরের কাছে ০—৩ গোলে হেরে দেশে ফিরে গেছল। এবার তাদের সঙ্গেই প্রথম খেলা। হাঙ্গেরি ৪—২ গোলে জেতে। দক্ষিণ আমেরিকার দুটি দল, ব্রাজিল ও আর্জেন্তিনা প্রথম রাউণ্ডেই যথাক্রমে স্পেনের কাছে ১—৩ ও সুইডেনের কাছে ২—৩ গোলে হেরে যাওয়ায় দ্বিতীয় রাউণ্ডে ইওরোপীয়ানরা ছাড়া আর কেউ রইল না। স্পেনের বিরুদ্ধে পেনাল্টি পেয়ে ব্রাজিলের ডি ব্রিটো গোল করতে পারেননি। বিশ্বকাপে এমন ঘটনা এই প্রথম। এই ডি ব্রিটোই পরবর্তীকালে পেলেকে আবিষ্কার করে খেলা শিখিয়ে ছিলেন।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম অমীমাংসিত খেলা, প্রথম অতিরিক্ত সময় খেলা এবং প্রথম সফল পেনাল্টি কিকটি ঘটে অস্ট্রিয়া বনাম ফ্রান্সের খেলাতে। ফল ১—১ হওয়ায় অতিরিক্ত সময় খেলা হয়। ফ্রান্সের ভেরিয়েত পেনাল্টি কিকে গোল দেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত উগো মিজলের ‘ভুণ্ডার টিম’ রূপে খ্যাত অস্ট্রিয়া দল ৩—২ জেতে। প্রথম রি—প্লে ম্যাচটি হয় স্পেন ও ইতালির মধ্যে খেলা ১—১ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পরই। স্পেনের বিশ্বখ্যাত গোলকিপার ও অধিনায়ক রিকার্ডো জামোরা এমন অসাধারণ খেলছিলেন যে তাকে আঘাতের পর আঘাত সহ্য করতে হয় কিন্তু সুইস রেফারি মার্সেট তা উপেক্ষা করেন। রি—প্লে ম্যাচে জামোরা আর মাঠে নামতে পারেনি তাই নয়, স্পেনকে সাতজন খেলোয়াড় বদলাতে হয় চোট পাওয়ার জন্য। ইতালি মিয়াজ্জার একমাত্র গোলে ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে উঠে অস্ট্রিয়াকেও গুইতার গোলে ১—০ হারিয়ে ফাইনালে যায়। অপরদিকে চেকোশ্লোভাকিয়া সেমিফাইনালে জার্মানিকে ৩—১ হারিয়ে ইতালির মুখোমুখি হল।
