ইওরোপের চারটি দেশ খেলতে আসার জন্য খুব ইচ্ছুক ছিল না। অনেক দেরিতে তারা সিদ্ধান্ত জানায়। ফ্রান্স তো প্রতিযোগিতার মাত্র একমাস আগে ঠিক করে খেলতে যাবে। তাদেরই দেশের লোক ফিফা প্রেসিডেণ্ট এবং তিনি ১২1/2ইঞ্চি উচ্চতার নিরেট সোনার একটি ট্রফি প্রদান করেছেন সুতরাং খেলতে না গেলে সেটা ভাল দেখাবে না ভেবেই তারা উরুগুয়ে পাড়ি দিয়েছিল। রুমানিয়া দল নির্বাচন করেছিলেন তাদের রাজা ক্যারল স্বয়ং। সেখানে ব্রিটিশ অয়েল কম্পানিতে দেশের বেশিরভাগ শীর্ষস্থানীয় ফুটবলাররা চাকরি করতেন। কম্পানি থেকে বলা হয়, উরুগুয়েতে খেলতে যাবার অনুমতি দেওয়া হবে না। কেউ যদি যায় তাহলে চাকরি থাকবে না। এই সময় রাজা ক্যারল হস্তক্ষেপ করেন তার ফলে অনুমতি মিলে যায়। রাজা নিজেই খেলোয়াড় বেছে দল গড়ে পাঠিয়ে দেন। যুক্তরাষ্ট্র দলটিতে ছিলেন ছয়জন প্রাক্তন ইংলিশ ও স্কটিশ পেশাদার। সবাই বয়স্ক। যুক্তরাষ্ট্র দলকে কেউই বিশেষ পাত্তা দেয়নি। ট্রেনিংয়ের সময় তাদের চেহারা আর গাজোয়ারি খেলা দেখে এক ফরাসি সাংবাদিক মন্তব্য করেন, ফুটবল না খেলে ওদের শট পাটার হওয়া উচিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দলকে এরপর সবাই ‘শট পাটার’ বলে ডাকত।
সবাই ধরে নিয়েছিল উরুগুয়ের কঠিনতম প্রতিদ্বন্দ্বী হবে তার প্রতিবেশী আর্জেন্তিনা। তার কারণও আছে। দু বছর আগে আমস্টারডাম ওলিম্পিকস ফাইনালে তাদের খেলার ফলটা ছিল খুব কাছাকাছি (১—১, ২—১)। যদিও আর্জেন্তিনার চমকপ্রদ লেফট উইঙ্গার রেইমন্দো ওরসি—কে ইতালির জুভেন্তাস ক্লাব টাকার টোপ দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে তাহলেও আবার তারা কঠিন ও শক্তিশালী দল গড়ে নিতে পেরেছে অ্যাটাকিং সেণ্টার হাফ লুইসিতো মন্তি—কে কেন্দ্র করে। এই মন্তিও অবশ্য পরে জুভেন্তাসে চলে যাবেন এবং ওরসিকে সঙ্গে নিয়ে ইতালিকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ে সাহায্য করবেন।
পেরুকে ১—০, রুমানিয়াকে ৪—০, সেমিফাইনালে যুগোশ্লাভিয়াকে ৬—১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে উরুগুয়ে দেশবাসীকে প্রায় পাগল করে তোলে। অন্যান্য খেলাতেও কিছু ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের সঙ্গে খেলায় আর্জেন্তিনা ১—০ জিতছে, খেলা শেষের ছয় মিনিট আগেই ব্রাজিলীয় রেফারি সমাপ্তির বাঁশি বাজিয়ে মাঠে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ হন। অবশ্য ১৫ মিনিট পর খেলা আবার শুরু হয় এবং শেষপর্যন্ত ফল একই থাকে। আর একটি মজার ব্যাপার ঘটে আর্জেন্তিনা—যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে। তাঁর দলের একজন আহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেনার মেডিক্যাল ব্যাগ হাতে মাঠে ছোটেন এবং রেফারির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে হাতের ব্যাগটিকে মাটিতে আছাড় মারেন। ব্যাগের মধ্যে ছিল ক্লোরোফর্মের বোতল। সেটি ভেঙে তো যায়ই তিনিও হুমড়ি খেয়ে পড়েন তার উপর। এরপর অজ্ঞান ট্রেনারমশাইকেই স্ট্রেচারে মাঠের বাইরে আনতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র সেমিফাইনালে উঠে কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। বেলজিয়াম ও প্যারাগুয়ে প্রত্যেককে ৩—০ গোলে হারিয়ে তারা সেমিফাইনালে পড়ে আর্জেন্তিনার সামনে এবং ১—৬ গোলে হারে। আর্জেন্তিনা তার আগে ফ্রান্সকে ১—০, মেক্সিকোকে ৬—৩ এবং চিলিকে ৩—১ গোলে হারায়।
১৯৩০—এর ৩০ জুলাই ফাইনাল খেলার ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই মন্তিভিদিওর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরালো করা হয়। সারারাত ধরে বুয়েনস এয়ারেস থেকে নৌকোয় হাজারে হাজারে আর্জেন্তিনীয় সমর্থকরা আসতে থাকে। দাঙ্গা বাধার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু বাধেনি। স্টেডিয়ামে এক লক্ষ দর্শকের বসার ব্যবস্থা থাকলেও ৯০ হাজারের বেশি লোক ঢোকান হয়নি তাও তাদের প্রত্যেককে দেহ তল্লাশির পর। শেষ পর্যন্ত একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিসংবাদ ছাড়া আর কিছুই কিন্তু ঘটেনি। খেলা শুরুর আগে উরুগুয়ানরা বললেন তাদের বল দিয়ে খেলা হবে, আর্জেন্তিনীয়রাও ওই একই দাবি তুললেন। অবশেষে বেলজিয়ামের রেফারি জাঁ ল্যাঙ্গেনাস, সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে গোছের একটা ব্যবস্থা নিয়ে দু’পক্ষকে বাগে আনেন। দুই দলের বলেই খেলা হবে তবে দুই অর্ধে। যারা টস জিতবে তাদের বল খেলা হবে প্রথম অর্ধে। আর্জেন্তিনা টস জেতে।
১২ মিনিটে পাবলো দোরাদো উরুগুয়েকে ১—০ এগিয়ে দেন, ৩৫ মিনিটে কার্লস পসেল্লে ১—১ করেন এবং গিলারমো স্ত্যাবিলে ৪০ মিনিটে ২—১ করে আর্জেন্তিনাকে এগিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধের ১০ মিনিটে পেড্রো সিয়ার গোলে ২—২ হয়। ৬৫ মিনিটে স্যাণ্টোস ইরিয়ার্তে ও খেলার শেষ মুহূর্তে হেকটর কাস্ত্রো গোল দিয়ে উরুগুয়েকে ৪—২ গোলে বিজয়ী এবং বিশ্বকাপের প্রথম অধিকারী করে।
১৯৩০ প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় ১৩টি দলকে চারটি গ্রুপে ভাগ করে, গ্রুপ জয়ীদের নিয়ে সেমিফাইনাল খেলা হয়। প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ফ্রান্স ও মেক্সিকোর মধ্যে খেলাটির মাধ্যমে। বিশ্বকাপে প্রথম গোলটি করেন ৪—১ গোলে বিজয়ী ফ্রান্সের লুই লরেঁ। এই খেলায় ফ্রান্সের গোলকিপার ১০ মিনিটেই আহত হয়ে মাঠ ছাড়ায় তাদের লেফট হাফ জাঁ স্যাঁত্রেল বাকি ৮০ মিনিট গোলরক্ষা করেন। প্রথম বিশ্বকাপে মোট ১৮টি ম্যাচে ৭০টি গোল হয়। সবথেকে বেশি গোল করেন আর্জেন্তিনা, ১৮টি। তারপর উরুগুয়ে, ১৫টি। বলিভিয়া ও বেলজিয়াম একটিও গোল করতে পারেনি। উরুগুয়ে তিনটি মাত্র গোল খেয়েছিল। গোলদাতাদের শীর্ষে ছিল আর্জেন্তিনার গিলারমো স্ত্যাবিলে, ৮টি গোল। আর্জেন্তিনা অধিনায়ক ফেরেইরা প্রথম ম্যাচে আহত হওয়ায় দ্বিতীয় ম্যাচে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে স্ত্যাবিলে তার জায়গায় খেলেন এবং বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন। মেক্সিকো ৩—৬ গোলে হেরেছিল। বিশ্বকাপে প্রথম মারপিট করে খেলার জন্য মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হন পেরুর অধিনায়ক ডি লা কেসিয়াস। এই ম্যাচে পেরু ১—৩ হারে রুমানিয়ার কাছে। আর্জেন্তিনা ও মেক্সিকো দুই ভাইকে খেলিয়েছিল তাদের দলে। আর্জেন্তিনার পক্ষে উয়ান ও মিগুয়েল এভারিস্তো এবং মেক্সিকোর পক্ষে ফারনাণ্ডো ও ম্যানুয়েল রোজাস। ওলিম্পিক এবং বিশ্বকাপ সোনার পদক জেতা প্রথম ফুটবলাররা হয় উরুগুয়ের সাতজন। এদের মধ্যে চারজন—নাসাজ্জি, আনদ্রেদে, স্কারোনে ও সিয়া আবার ‘ডাবল’ ওলিম্পিক (১৯২৪ ও ১৯২৮) সোনার পদকজয়ী। বিশ্বকাপ জয়ী দলে এখন পর্যন্ত উরুগুয়ের কাস্ত্রোর মত প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কেউ খেলেনি। শিশুবয়সে দুর্ঘটনায় তার বাঁ হাতের বেশিরভাগটাই কেটে বাদ দিতে হয়। পেরুর বিরুদ্ধে একমাত্র গোলটি করে তিনি দেশকে জেতান বটে কিন্তু পরের দুটি ম্যাচে তাকে বসান হয়। ফাইনাল খেলায় তিনি রিজার্ভে ছিলেন। খেলার দু ঘণ্টা আগে আনসেলমো অসমর্থ বিবেচিত হওয়ায় কাস্ত্রো দলে স্থান পান এবং উরুগুয়ের চতুর্থ গোলটি করেন।
