মধ্যরাত্রে, নির্জন পথে, রিকশায় বসে ননীর চোখ দিয়ে টপটপ জল পড়তে লাগল। শিবা রিকশা চালানো বন্ধ করে পেছনে তাকাল।
”শেষ কবে আমি কেঁদেছি জানিস? হাসপাতালে যখন তোদের সবাইকে আমার বেডের পাশে দেখলুম। মনে হল আমি যেন আবার জন্মাচ্ছি। তখন মনে—মনে বলেছিলুম, আমি ফিরব, আবার রিংয়ে উঠব।”
শিবার ঘাড় থেকে ননী পা নামাল। দু’জনের যেন বলার মতো আর কথা নেই, তারা চুপ করে বসে থাকল। একসময় ননী বলল, ”তর নবজনম অইল।”
”হ্যাঁ।”
”তইলে কানতাচস না ক্যান? মায়ের প্যাট থেকে পইড়াই ত বাচ্চচারা—”
হঠাৎ দু’ হাত তুলে শূন্যে ঘুসি ছুড়ে, বিশাল অট্টহাসিতে নিশুত রাত, শূন্য পথ, জনবসতি এবং অন্ধকার ভরিয়ে দিয়ে শিবা হেসে উঠল। তারপর রিকশা থেকে নেমে সে ছুটতে শুরু করল।
সঙ্গে—সঙ্গে সাইকেল রিকশাটা তার পেছনে বনবনিয়ে ধাওয়া করল।
বিশ্বজোড়া বিশ্বকাপ
বিশ্বজোড়া বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপ শুরুর আগের কথা
খেলার কথা উঠলে প্রথমেই যে নামটি জিভের ডগায় এসে যাবে সেটি হল ফুটবল। আর ফুটবল বললেই প্রথমে মনে পড়বে বিশ্বকাপের কথা। এক মাস ধরে এর দক্ষতা, এর স্টাইল, এর সব কিছুই খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে যায় ফুটবলপ্রেমী কোটি কোটি মানুষ। বিশ্বব্যাপী সংযোগ ব্যবস্থার ফলে এর ফলাফল পৃথিবীর কোণে কোণে মুহূর্তে ছড়িয়ে যায় আর এই টেলিভিশনের যুগে হাজার মাইল দূরের মানুষও আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক খেলার প্রবাদ পুরুষ হয়ে ওঠে। অথচ সত্তর—আশি বছর আগেও যদি কেউ ফুটবল পেশাদারদের জন্য বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার সম্ভাবনার কথা বলত তাহলে লোকে ধরে নিত তার মাথার স্ক্রু ঢিলে হয়ে গেছে।
১৯০৪ সালের ২১ মে, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, হল্যান্ড, স্পেন আর সুইৎজারল্যান্ড এই ছয়টি দেশের কয়েকজন লোক প্যারিসে ফুটবলের যে বিশ্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেশন ইন্ট্যারন্যাশনাল দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনস (ফিফা) গড়েছিলেন, তার সংবিধানে তাঁরা একটি ধারা রেখেছিলেন—ভবিষ্যতে যদি কখনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয় তাহলে একমাত্র ফিফা—ই হবে তার সংগঠক। ওই সময় বিশ্ব প্রতিযোগিতা বলতে ছিল শুধুমাত্র অপেশাদারদের জন্য ওলিম্পিক গেমস। কিন্তু পেশাদার ফুটবলাররাও সেখানে অংশ নিয়ে ওলিম্পিক আদর্শ নষ্ট করছিল। ১৯২৪ প্যারিস ওলিম্পিক গেমসেই ইওরোপ ও আমেরিকার মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফুটবল যোগাযোগ ঘটে। আর তখনই সারা বিশ্বের চোখ খুলে যায়। ৫০ হাজার দর্শকের সামনে উরুগুয়ে চমৎকার দক্ষতায় পাঁচটি খেলায় ২০ গোল দিয়ে ও দুটি মাত্র খেয়ে ওলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হতেই বিশ্বকাপ সংগঠনার সম্ভাবনা, এই প্রতিযোগিতা থেকেই মাথা চাড়া দিল।
এর দু বছর পর ফিফা কংগ্রেসে ফ্রান্সের প্রতিনিধি দেলুনি বললেন, ”আন্তর্জাতিক ফুটবল এখন আর শুধুমাত্র ওলিম্পিকসের গণ্ডিতেই বাঁধা থাকতে পারে না। বহু দেশে এখন পেশাদারিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে তাই তারা তাদের সেরা খেলোয়াড়দের ওলিম্পিকসে পাঠাতে পারছে না। এবার পেশাদারদের জন্য নিজস্ব প্রতিযোগিতার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।” এই ধরনের ভাবনা—চিন্তার জোরেই ১৯২৯—এ বার্সিলোনায় ফিফা—র বার্ষিক কংগ্রেসে, পাঁচটি ইওরোপীয় দেশের আপত্তি ভোটের ফলাফলে অগ্রাহ্য হয়ে, প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠানের ভার দেওয়া হল ১৯২৪ ও ১৯২৮ ওলিম্পিক গেমস চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েকে। আশ্চর্যের কথা, সংগঠিত ফুটবল খেলায় যারা বিশ্বে প্রথম পথ প্রদর্শক সেই ব্রিটেনের চারটি— ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলশ ও উত্তর আয়ারল্যান্ড—কিন্তু ফিফা গড়ার ব্যাপারে বা বিশ্বকাপের প্রথম তিনটি অনুষ্ঠানে কোন অংশ নেয়নি।
উরুগুয়ে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠান করতে চেয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, রাজধানী মন্তিভিদিওতে নতুন একটি আধুনিক স্টেডিয়াম গড়বে এক লক্ষ দর্শকের জন্য আর যে সব দেশ অংশ নিতে আসবে তাদের যাবতীয় খরচ মিটিয়ে দেবে। কিন্তু প্রতিযোগিতা শুরুর দু মাস আগেও ইওরোপের কোন দেশ যোগ দেবার সম্মতিপত্র পাঠাল না। তাদের ভাবখানা ছিল এইরকম,—জাহাজে অত দূরে গিয়ে খেলার জন্য তিন মাস সময় লাগবে। অত দিন ধরে পরিবার আর কাজকর্ম ছেড়ে যাবার জন্য তারা তাদের খেলোয়াড়দের বলতে পারবেন না। অবশেষে অনেক ধরাধরির পর চারটি ইওরোপীয় দেশ—ফ্রান্স, যুগোশ্লাভিয়া, বেলজিয়াম আর রুমানিয়া—খেলতে যেতে রাজি হয়। এই চারটি দেশ ছাড়া প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিল আরও নয়টি দেশ। তারা—আর্জেন্তিনা, মেক্সিকো, চিলি, ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু, প্যারাগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র এবং উরুগুয়ে। ১৯৩০—এ ফিফা—র সদস্য দেশের সংখ্যা ছিল ৪১। বিশ্বকাপ ট্রফির তখন কোন নাম ছিল না। ১৯২০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত তাদের প্রেসিডেণ্ট ফ্রান্সের জুল রিমে (Jules Rimet), যাঁর ঐকান্তিক ও নিরলস চেষ্টায় বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা সম্ভব হয়ে ওঠে, তাঁর নামে ট্রফির নামকরণ হয় ১৯৪৬—এ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্য ১২ বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৫০—এ এই প্রতিযোগিতা আবার শুরু হলে প্রথমবারের মতই জুল রিমে কাপ জেতে উরুগুয়েই।
১৯৩০ উরুগুয়ে
১৯৩০ ছিল উরুগুয়ের শতবার্ষিকীর বছর। মাত্র আট মাসে তারা বন্দর রাজধানী মন্তিভিদিওতে তৈরি করে ফেলে এক লক্ষ দর্শকের জন্য সেণ্টিনারি স্টেডিয়াম। দু বছর আগে উরুগুয়ে তার ওলিম্পিক ফুটবল খেতাব ধরে রেখেছে আর্জেন্তিনাকে ফাইনালে হারিয়ে তাই উরুগুয়েই ছিল প্রথম বিশ্বকাপের ফেভারিট। কঠোরভাবে ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করার জন্য তারা দলটিকে রাজধানীর একটি হোটেলে দু মাস রাখে। এই সময় খেলোয়াড়দের বাড়িতে পর্যন্ত যেতে দেওয়া হত না। একদিন রাতে দেখা গেল তাদের বিশ্বখ্যাত ওলিম্পিক গোলকিপার মাজ্জালি পা টিপে টিপে পিছনের দরজা দিয়ে হোটেলে ঢুকছে। ধরা পড়ামাত্র তাকে দল থেকে বার করে দিয়ে অন্য গোলকিপার দলে নেওয়া হয়।
