ছেলেটি শুধু এইটুকু জেনেই ফিরে এসেছে। সর্বনাশ! তাহলে এখন কী হবে?
”ঘনা, তুই এখনি প্রতাপবাবুকে গিয়ে বল দু’মিনিট একস্ট্রা সময় দিন। আমাদের গোলকিপারের বাবা হাসপাতালে, নির্মল সেখানে গেছে। জাস্ট দু’মিনিট টাইম চাই।” টিমের ক্যাপ্টেন শঙ্কর ঝড়ের বেগে কথাগুলো বলে উত্তেজিত চোখে এধার—ওধার তাকাল গোলকিপার খুজতে।
”এই তো অনিরুদ্ধ। বেশ লম্বা, নেমে পড়, নেমে পড়।”
হতচকিত অনিরুদ্ধ দু’পা পিছিয়ে গেল ভয়ে। পেছনে তাকিয়ে দেখে নিল গেটটা কত দূরে। ঘুরে দৌড়তে যাবে, ততক্ষণে তিনজন ছুটে এসে তার হাত চেপে ধরেছে।
অনিরুদ্ধর গলা দিয়ে দুটো শব্দ বেরোল, ”আমি!”
ধমক দিয়ে শঙ্কর বলল, ”হ্যাঁ তুই। জামাটা খোল, সনৎ তোর জামাটা ওকে পরিয়ে দে। শোন, তুই জীবনে গোলে খেলিসনি আমরা জানি। গোল খেলে আমরা কিছু মনে করব না। যেভাবে পারিস বল আটকাবি আর ওদের যারই পায়ে বল দেখবি তারই পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়বি।”
কথা বলতে বলতে শঙ্কর জামাটা টেনে অনিরুদ্ধর মাথা গলিয়ে বার করে নিল। সনৎ তার সাদা টি—শার্টটা অনিরুদ্ধর মাথা গলিয়ে পরাতে পরাতে বলল, ”পা চালাবি, কনুই দিয়ে গুঁতোবি, দেখবি ভয়ে তোর কাছে কেউ আসবে না।”
অনিরুদ্ধ বিব্রত মুখে বলল, ”তখন তো দূর থেকে শট মারবে।”
”নিশ্চয়। দূর থেকেই তো মারবে। ভগবান তা হলে তোকে দুটো লম্বা লম্বা হাত দিয়েছেন কীজন্য? হাতদুটো এবার কাজে লাগা। যা, মাঠে নাম।”
সনৎ পিঠে একটা চড় মেরে ধাক্কা দিল। পুরো সাইজের মাঠ নয়, প্রতি দলে সাতজন। ছয়জনের পিছু নিয়ে অনিরুদ্ধ দক্ষিণ দিকের গোলের দিকে এগিয়ে গেল। মাথায় গুনগুন করছে শঙ্করের উপদেশ: ‘যার পায়ে বল তার পায়ে ঝাঁপ।’
পনেরো—পনেরো তিরিশ মিনিটের ম্যাচ। প্রথম মিনিটেই অনিরুদ্ধ কাজে লাগাল শঙ্করের উপদেশ। বলটা উঁচু হয়ে ডানদিক থেকে এসে পড়ছে পেনাল্টি সীমানার দাগের ওপর। অনিরুদ্ধ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল। ছেলেটি পা দিয়ে বলটা সবেমাত্র চেপে ধরেছে। তখনই অনিরুদ্ধ দু’হাত বাড়িয়ে ঝাঁপ দিল পায়ের ওপর।
”উহহহ” বলে ছেলেটি পায়ের গোছ দু’হাতে চেপে জমিতে গড়িয়ে পড়ল। বলটা বুকে জড়িয়ে অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়াতেই শঙ্কর ছুটে এসে তার পিঠ চাপড়ে বলল, ”দারুণ। এইভাবে খেলে যা।”
সেইভাবেই সে খেলে গেল। ক্লাস এইটের দু’জনকে সে শুধু পায়ের ওপর ঝাঁপিয়েই মাঠের বাইরে পাঠাল পায়ে বরফ ঘষার জন্য। মাঠে ফিরে তারা প্রায় দর্শক হয়েই থেকে যায়। প্রতাপবাবু তিনবার ওয়ার্নিং দিলেন অনিরুদ্ধকে। চতুর্থবার দিলেন পেনাল্টি। খেলা শেষ হতে তখন দু’মিনিট বাকি, ফল ০—০।
শঙ্কর এসে কানে কানে বলে গেল, ”আগে দেখে নিবি কোন পায়ে শট নিচ্ছে আর কোন দিকে তাকাচ্ছে, তারপর জয় মা কালী বলে একদিকের পোস্ট লক্ষ্য করে ঝাঁপাবি, এসপার—ওসপার যা হয় হবে।”
অনিরুদ্ধ তাই করল। শটটা যে নিচ্ছে সে কোনদিকে তাকাল আর কোন পায়ে শট নিতে যাচ্ছে, এই দুটো ব্যাপার লক্ষ করে সে ডান দিকে ঝাঁপাল। কী আশ্চর্য, বলটা তার ডানদিকেই জমি ঘেঁষে এল। ডানহাত বাড়িয়ে বলটাকে সে ঠেলে বারপোস্টের পাশ দিয়ে গোল লাইনের বাইরে পাঠাল। কর্নার। নিজের কাজে সে নিজেই অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। পেনাল্টি সেভ করার গৌরবটা সে উপভোগ করেছিল পরের দিন ক্লাসে গিয়ে।
”সত্যি বলছি বিশ্বাস কর, এটাই আমার জীবনে প্রথম গোলকিপিং!” কথাটা অন্তত সাত—আটবার তাকে স্কুলে বলতে হয়েছিল। সে নিজেও অবাক হয়েছিল নিজেকে নিয়ে, এভাবে খেলা সম্ভব হল কী করে! মা—কালীর নাম, শঙ্করের কথামতো তখন নিতে ভুলে গেছল। বুকের মধ্যে শুধু ধড়াস ধড়াস শব্দ। ‘এসপার—ওসপার যা হয় হবে’ শুধু এই কথাগুলোই মাথায় ভোঁ ভোঁ করছিল।
প্রতাপবাবু পরদিন টিচার্স রুমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন টিফিনের সময়।
”দারুণ খেলেছ কিন্তু গোলকিপিংয়ের অ আ ক খ—ও তুমি জানো না। স্রেফ সাহস আর অনুমান ক্ষমতার জোরে কাল গোল খাওনি।”
অনিরুদ্ধ জানিয়ে দেয় আগে কখনও ক্রসবারের নীচে সে দাঁড়ায়নি।
”বয়স কত?”
”সাড়ে বারো।”
”হাইট?”
”পাচ ফুট দু’ ইঞ্চি”
”একটা ম্যাচেই তুমি বিখ্যাত হয়ে গেছ। আরও খ্যাতি কি তুমি পেতে চাও?”
অনিরুদ্ধ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতাপবাবু তীক্ষ্ন চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
”গোলকিপার হওয়ার জন্য যেসব গুণ থাকা দরকার তার প্রথম দুটো তুমি জন্মগত ভাবে পেয়ে গেছ, আর পেয়েছ হাইটটা। বাকিগুলো পেতে হলে পরিশ্রম করে অর্জন করতে হবে। যদি খাটতে চাও তাহলে আমাকে বোলো, তোমাকে কালীতলা স্পোর্টিং ক্লাবের হারাধন দত্তের কাছে নিয়ে যাব। হারাধনের নাম শুনেছ?”
অনিরুদ্ধ অস্ফুটে বলে, ”হ্যাঁ।”
হারাধন দত্তের নাম এ—তল্লাটে কে না শুনেছে? মোহনবাগান, বেঙ্গল, ইন্ডিয়া টিমে খেলেছেন। ভারতজোড়া নাম। বছরকুড়ি আগে খেলা ছেড়েছেন। এখন বাজারে মুদির দোকান, চাষবাস আর পাড়ার ক্লাব নিয়ে থাকেন।
সেইদিনই রাত্রে বাড়িতে খেতে বসে অনিরুদ্ধ বাবাকে বলে, ”আমি গোলকিপার হব। প্রতাপবাবু বলেছেন আমি যদি খাটি তা হলে বড় গোলকিপার হতে পারব।”
অঘোর চক্রবর্তী আঙুলে লেগে—থাকা কুমড়োর ছোঁকা চেটে সাফ করছিলেন। চাটা বন্ধ করে ছেলের দিকে, তারপর ছেলের মা অসীমার দিকে ভ্রূ কোঁচকালেন।
