রঙ্গা এগিয়ে এসে শিবাকে দড়ির ধারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। চোখের পাতা টেনে তুলে রেখে শিবা শুধু একটা কালো আবছা আকাররূপে রঙ্গাকে দেখছে। জলে ভাসা চাহনির মধ্য দিয়ে সে দু’জনের মধ্যের দূরত্বটা হিসেব করে জলপোকার মতো সরে—সরে যাচ্ছে। রঙ্গার মন্থর স্টাইল কিছুতেই ওকে বাগে আনতে পারছে না, যদি—বা সে কাছে পৌঁছচ্ছে, শিবার বাঁ হাতের জ্যাব তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার সময় আদায় করে নিচ্ছে।
এবার হতাশ আর বিরক্ত হয়ে উঠল রঙ্গা। সে শুনেছে শিবাজি একজন বিপজ্জনক ফাইটার। তাকে বলা হয়েছিল এবং স্বচক্ষে এখানে দেখেছেও—পাঞ্চ করে অসম্ভব ফাস্ট…দুর্দান্ত ওয়ান—টু কম্বিনেশন, জ্যাবের সঙ্গে—সঙ্গে মারাত্মক স্ট্রেট লেফট…আর ওই ফুটওয়ার্ক, স্পিড…কিন্তু এইরকম এক ফাইটার পালিয়ে—পালিয়ে লড়বে, রঙ্গা তা ভাবেনি। ওর চোখ দেখে তার মনে হচ্ছে, কিছু একটা হয়েছে! চোখ পিটপিট করেই জোর করে পাতা খুলে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রঙ্গার মনে হল, শিবাজি যেন ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না।
তা হলে এখনই তো মার দেওয়ার সুযোগ। কিন্তু শিবা এমন ক্ষিপ্রতায় তার পাঞ্চগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে যে, তাকে সুযোগ দিতে দিচ্ছে না। রেগে উঠে রঙ্গা দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ডান হাত তুলে শিবাকে দেখাল। ভাবখানা—দেখছেন তো, এর সঙ্গে কী লড়ব!
গ্যালারিতে দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল উঠল। রঙ্গা একবার ভ্যাংচাবার জন্য শিবার ফুটওয়ার্ক নকল করে দেখাল এবং এগিয়ে গিয়ে একটা সুইং ডান হাতে, আর বাঁ হাতে সোজা একটা। দুটোই সে ফসকাল। আবার সে এগোল, তবে হতাশভাবে এবং দুটো হাত নামিয়ে। এই প্রথম সে কনসেনট্রেশন নষ্ট করল। হুঁশিয়ার থাকার চেষ্টা না করে, মুখের সামনে প্রহরীর মতো সজাগ দুই হাতের মুঠি তুলে না রেখে দেখাতে চাইল, সে শিবাকে ধর্তব্যের বাইরে গণ্য করছে। প্রতিপক্ষকে উপহাসের পাত্র বানাতে গিয়ে সে নিজেকে ঢিলে করে দিল।
চোখের পাতা টান করে তুলে শিবা শুধু দেখতে পেল রঙ্গা তার থেকে ফুটপাঁচেক দূরে এসে গেছে, মুখের গার্ড নামানো।
তখনই বুকের মধ্যে কে যেন বিশাল চিৎকার করে বলে উঠল, ”বহু পয়েন্টে হেরে তো গেছিসই…শিবা এই তোর শেষ সুযোগ—মার।”
রঙ্গা পিছিয়ে যাওয়ার বা হাত দুটো মুখের সামনে তোলারও সময় পেল না। রেফারি পরে বলেছিলেন, তিনি ঠিকমতো দেখে উঠতে পারেননি শিবার লেফট হুকটাকে। এত সুইফট, এক পা এগিয়ে এসে, এত ফাস্ট পাঞ্চ তিনি কখনও দেখেননি।
মুখের থেকে সামান্য তাচ্ছিল্যের রেশটুকু মুছে নেওয়ার সময়ও রঙ্গা পায়নি। ‘মার’, এই নির্দেশটা মাথা থেকে শিবার হাতে পৌঁছনো এবং নির্দেশ অনুযায়ী কাজটা এমন গতিতে ঘটল, যেটা রকেটের গতি মাপার যন্ত্রে ছাড়া ধরা সম্ভব নয়। কথাটায় বাড়াবাড়ি রয়েছে, কিন্তু শিবার এই ঘুসিটাও তো তাই—ই। সে তার সারা দেহ নিংড়ে ক্ষমতার শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত বার করে লেফট হুকটা চালিয়েছিল। আকাশে যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল এবং তিন—চার সেকেন্ড পর রঙ্গা ক্যানভাসে পড়ল বজ্রাহতের মতো।
রেফারির দশ গোনার পরও সে ওঠেনি।
.
”শিবাজি যখন ঘুসিটা মারলে তখন তুমি কী ভাবছিলে?”
”শিবাজি, এই মুহূর্তে তোমার কেমন লাগছে?”
”শিবাজি, কত বছর বয়স থেকে বক্সিং করছ? কেন তুমি বক্সিংয়ে এলে?”
”কার কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছ?”
”তোমার বাড়িতে কে—কে আছেন? তুমি কতদূর পড়াশোনা করেছ? এখনও কি লেখাপড়া করো?”
ড্রেসিংরুমে হতভম্ব চোখে শিবা প্রশ্নকর্তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে। ওরা সাংবাদিক। শিবার গলায় ঝুলছে তিনরঙা রিবনে বাঁধা একটা মেডেল।
”অ্যাত কথা আর অহন জিগাইবেন না, অর অহন একা থাকন দরকার।” উদ্বিগ্ন অভিভাবকের উৎকণ্ঠা ননীর গলায়। কীভাবে যেন ম্যানেজ করে সে ড্রেসিংরুমে ঢুকে পড়েছে। ”যা জিগাইবার আমারে জিগান, সব হিসটিরি আমি কইয়া দিমু…তয় আইজ নয়, সময় কইরা রিসকা স্ট্যান্ডে একদিন আসেন…শিবা উঠ—উঠ, তরে লইয়া যাইবার জইন্য হগ্গলে গেটে খাড়ায়ে আচে।”
.
তখন মাঝরাত্রি। ননীর রিকশাটা পূর্বপল্লীকে চতুর্থবার চক্কর দিয়ে দেবদাস পাঠক রোড, বি. টি. রোড দিয়ে মিলনপল্লীতে সাধুর বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসছে। এই রিকশা চালাচ্ছে শিবা, পেছনের সিটে বসে ননী।
”পাগলের মতো চোখ কইর্যা সাধু কইতাচিল, শিবা ঘুসিটা তো রঙ্গারে মারে নাই, আমারেই আর একবার মাইরলঅ। …অর বহু টাহা নাকি লোকসান অইচে।…জনে—জনে খোঁজ লইত্যাচিল কান্তিরে দ্যাখচ? কান্তিরে দ্যাখচ?”
মাথা নিচু করে ধীর গতিতে শিবা প্যাডেল করে যেতে লাগল। কোনও মন্তব্য করল না।
”হ্যা রে শিবা, কাগজের লোকগুলান আইব তো?”
”জানি না, আমি তো ফুটবল—ক্রিকেট খেলি না।”
একটু পরে সে বলল, ”যদি আসে, তা হলে তুই কী বলবি?”
”পরথমে কইমু, আমার এই পা দুইডা দ্যাহেন, ভাল কইর্যা দ্যাহেন। এই দিয়া চাইর বচ্চচর আগে একদিন শিবারে আমি লাথথি মাইরচিলাম। পা দুইডারে শিবা ভাইঙা দিতে পারত…দেয় নাই।” বলার সঙ্গে—সঙ্গে ননী তার দুই পা শিবার কাঁধের ওপর তুলে দিল।
”এবার যদি পা দুটো ভেঙে দি!”
”ভাঙ, ভাঙ…আমার সারা শরিলের হারগোর তুই ভাইঙা দে। আমার মইদ্যে অহন কী যে হইত্যাচে তরে আমি বোঝাইতে পারুম না।”
