শিবা হাসল। দাদার স্বভাবটা সে জানে। ধীর, ঠাণ্ডা, সহজে বিচলিত হয় না। এই মুহূর্তেও হচ্ছে না।
রঙ্গরাজন রিংয়ে উঠল। হাততালি পড়ল। দু’হাত তুলে মাথা ঝুঁকিয়ে সে অভিবাদন জানাল। তার কর্নারে কয়েকজনের সঙ্গে কান্তিও রয়েছে।
রিংয়ের মাঝে দু’জনকে ডেকে রেফারি যখন বাঁধা গত আউড়ে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিল, রঙ্গা তখন ঠাণ্ডা চোখে শিবার মুখের দিকে তাকিয়ে। খুনির মতো চাহনি। শিবার বুকের মধ্যে সিরসির করে উঠল। এইটেই হচ্ছে পরস্পরের বুকের পাটা মেপে নেওয়ার, অন্যের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত। সার বলে দিয়েছে, খবর্দার চোখ সরাবে না, পালটা তুমিও চোখ রাঙাবে।…শিবার চোখ জ্বলে উঠল।
ঘণ্টা পড়ল।
দু’জনে পরস্পরের দিকে দ্রুত এগিয়ে এসেই পাঁচ হাত ব্যবধান রেখে থমকে গেল। দু’জনেই কয়েক পা পিছলো। তারপর শিবা আবার এগোল। রঙ্গাও এগিয়ে গেল। এবার দু’জনে চক্কর দিয়ে ঘুরতে লাগল। মুখের কাছে গ্লাভস, এগোব—এগোব ভাব দেখিয়ে, শিবা কুঁজো হয়ে দুলছে। রঙ্গার একটা সোজা ঘুসি শিবার মুখে পৌঁছবার আগেই সে মাথা সরিয়ে পালটা একটা সোজা বিদ্যুৎগতিতে বসিয়ে দিল রঙ্গার কপালের মাঝখানে। চিৎকার উঠল দর্শকদের, শিবা প্রথম ঘুসিটা মেরেছে।
রঙ্গা নাড়া খেয়ে তেতে উঠল। শিবার কাছে পৌঁছে কম্বিনেশন মারতে গিয়ে হাত আটকে গেল শিবার হাতে। রঙ্গা বাঁ হাতে শিবার গলা জড়িয়ে চাপ দিয়ে মাথাটা হেঁট করিয়ে ডান হাতে ছোট দু—তিনটে আপার কাট মুখে—কপালে মারল। রেফারি এসে ওদের ছাড়িয়ে দিল। তারপর আবার দূরত্ব রেখে চক্কর দিতে—দিতে হঠাৎ এগিয়ে আসার ভান দু’জনেই করতে লাগল। যেন দু’জনের হাতেই বন্দুক, কে প্রথম গুলিটা ছুড়বে! ছুড়ে যদি ফসকায় তা হলে অন্যজন শেষ করে দেবে। যদি ঘুসি ছুড়ে না লাগাতে পারো আর অন্যজন যদি তৈরি থাকে, তা হলে ঘুসি খেতে হবেই।
এই সময়ই শিবার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল। বাঁ হাতের গ্লাভস দিয়ে সে চোখ রগড়াল।..কয়েক সেকেন্ড পর জ্বলুনিটা বাড়ল। আবার সে গ্লাভস দিয়ে চোখ রগড়াল। তার মনে হল চোখের পাতা ফুলে উঠে ঢেকে দিচ্ছে তার দৃষ্টি।
রঙ্গা এগিয়ে আসছে। পর—পর দুটো জ্যাব শিবার মুখে পড়ল। বাহুর ওপর আর বুকে আরও দুটো। টলে গিয়ে শিবা পেছনে হটে গেল…তার চোখ জ্বলছে, পাতা দুটো ভারী লাগছে,..তার হাত চলছে কিন্তু রঙ্গার শরীরে লাগছে না।
কী হল চোখে। শিবা ভারী হয়ে যাওয়া চোখ টানটান করে দেখতে পেল রঙ্গা যেন অবাক হয়ে লক্ষ করল তার অবস্থাটা। তার চোখেও বিভ্রান্তি। সেটা কাটিয়ে উঠেই সে শিবার দিকে এগোল এবং এক—দুই কম্বিনেশনের সঙ্গে—সঙ্গেই প্রচণ্ড একটা লেফট হুকে শিবার মুখ ঘুরিয়ে দিল।
শিবা প্রথমে আছড়ে পড়ল দড়ির ওপর। দু’ হাতে দড়ি ধরা অবস্থাতেই ধীরে—ধীরে ক্যানভাসের দিকে নামতে লাগল তার দেহ। সারা স্টেডিয়াম স্তব্ধ, বিমূঢ়। এখন তার কানে এল।
”ওস্তাইদ…এ কী অইল!”
ক্যানভাসের ওপর উপুড় হয়ে পড়ার সঙ্গে—সঙ্গে রেফারির গোনা শুরু হল, ”ওয়ান…টু…”
”শিবা রে…” মেয়েগলায় একটা ফোঁপানি উঠল।
রোজারিও…তুমি উঠেছিলে, তা হলে আমিও পারব না কেন?
”সিক্স…সেভেন…”
বহু দূর থেকে ক্ষীণ কচি গলায় কে যেন বলছে ”পাপপা, গেট…আপ।” শিবা মুখ তুলে দেখল রঙ্গা তার কর্নারে দাঁড়িয়ে, তার পায়ের কাছে রিংয়ের বাইরে কয়েকটি মুখ, তার মধ্যে রয়েছে কান্তিও।
”শিবা উঠে পড়।”
দাদার গলা। রাগী, বিরক্ত স্বর। ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সে ধাক্কা দিয়ে বলে…
শিবা উঠে দাঁড়াল। ঘণ্টা পড়ল রাউন্ড—শেষের।
দড়ি গলে রিংয়ে উঠে এল গোমস, সুনীল, অনিমেষ।
”কী হয়েছে চোখে?” শিবাকে টুলে বসিয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন গোমস জানতে চাইল।
”জানি না সার। কীরকম জ্বালা করছে, চোখ মেলে তাকাতে পারছি না।” অসহায় কাতর স্বরে শিবা বলল।
ওর দুটো চোখের পাতা তুলে গোমস তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে পরীক্ষা করল। জলে ভরে গিয়ে লাল হয়ে উঠেছে চোখ দুটো। আঙুলটা বাঁ চোখের চারপাশে বুলিয়ে গোমস নিজের চোখে লাগাল। চোখ কোঁচকাল।
”ইটস বার্নিং।…কোনও শয়তানি ব্যাপার আছে।” বলেই আঙুলটার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। জ্বালা করছে। ”সুনীল, তুমি ওর চোখের ওপর আঙুল বোলাও তো।”
সুনীল স্পঞ্জটা অনিমেষকে দিয়ে ডান তর্জনীটা শিবার দুই ভ্রু আর চোখের পাতায় বোলাল। জ্বালা করে উঠতেই বলল, ”সার, এ তো বিছুটির রস!’
বারবার জলের ঝাপটা দিল সুনীল। কয়েকবার তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিলে চোখ আর কপাল।
”এখনও কি জ্বালা করছে?” গোমস উৎকণ্ঠিত।
”করছে।”
”গো নাউ শিবা, ডান্স…রঙ্গার রিচ—এর বাইরে থেকে মুভ করো….স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হিম।” গোমস মাউথপিসটা শিবার মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে ওকে তুলে দিল।
দ্বিতীয় রাউন্ড এবং অবিশ্বাস্য হল শিবা। চোখে ভাল করে দেখতে পাচ্ছে না। রঙ্গার ঘুসির পাল্লার বাইরে থাকার জন্য সে চক্কর দিচ্ছে, দুই পা তাকে ঘূর্ণির মতো ঘোরাচ্ছে রঙ্গাকে ঘিরে। কাছাকাছি হয়ে এলে বাঁ হাতে রঙ্গাকে ঘুসি পাঠিয়েই পিছিয়ে যাচ্ছে। সারা স্টেডিয়াম তাজ্জব। শ্বাসরোধ করে তারা অপূর্ব একটা মানুষের আত্মরক্ষার লড়াই দেখে যাচ্ছে।
সে এটুকু বুঝেছে, রঙ্গাকে কাছে আসতে দেওয়া মানেই লড়াই খতম। ওর একটা জ্যাব, একটা হুক যদি আবার মুখে কি মাথায় পড়ে তা হলে সে আর দাঁড়াতে পারবে না।…ডান্স, ডান্স…স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হিম…রঙ্গার রিচ—এর বাইরে থাকতে হবে…সবাই হাসছে, হাসুক। লড়াইয়ের ওরা কী বোঝে! ওরা জানে কি তার চোখের অবস্থা?
