রেফারি তুলে ধরল শিবারই হাত। তেইশ—দুই পয়েন্টে সে জিতেছে। স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকে এনক্লোজার থেকে তখন একটি গলা সারা এরেনায় প্রতিধ্বনিত হল, ”ওস্তাই—দ।”
শিবা তাকাল। হাত তুলে নাড়ল। ননীর পাশে সে উৎপল চট্টরাজকেও দেখতে পেল। আশ্চর্য ঘটক বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ”ভাল লড়েছিস।”
দ্বিতীয় লড়াই রেলওয়েজের মকরন্দ সুলেকরের সঙ্গে। ছিপছিপে লম্বা এই মরাঠির ঘুসি পৌঁছনোর দূরত্বটা শিবার থেকে বেশি এবং বুদ্ধিমান বক্সার। গতবারের রানার্স। ম্যানিলায়ও ভারতীয় দলে ছিল।
শিবা হুঁশিয়ার হয়েই প্রথম রাউন্ডটায় শুধু দূরে—দূরে চক্কর দিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে সুলেকর কৌশল বদলে আক্রমণে এগিয়ে এল। শিবার মনে হল, নিশ্চয় তার প্রথম দিনের লড়াইয়ের ধরন দেখেছে সুলেকরের কোচ। তাই কায়দাটা বদল করল। তাকেও এবার বদলাতে হবে, চমকে দিতে হবে। সেও পালটা তেড়ে গেল।
সুলেকরের মুখোমুখি হয়ে দু’ হাত বৃত্তের মধ্যে ঢুকে এসে পর—পর জ্যাব এবং রাইট ও লেফট হুক করে শিবা ওকে বিস্ময়ে ফেলে দিয়েই পিছিয়ে এল। কিন্তু সে যে তারপরও আবার তেড়ে আসবে, সুলেকর সেটা বোধ হয় ভাবতে পারেনি। ওকে ধাতস্থ হতে সময় না দিয়েই সে এক—দুই, এক—দুই—তিন কম্বিনেশন পাঞ্চ চালিয়ে গেল। সুলেকরের তখন আত্মরক্ষা ছাড়া আর কোনও চিন্তা ছিল না এই রাউন্ডে।
মানসিক ভারসাম্য এক মিনিটের বিরতিতেই সুলেকর গুছিয়ে নিয়ে তৃতীয় রাউন্ড শুরু করল। কেন সে নিজের বিভাগে ভারতের অন্যতম সেরা, এবার সে শিবাকে তা বুঝিয়ে দিতে শুরু করল। তবে মাথায়, পেটে বুকে ঘুসি খেয়েও কিন্তু শিবা তার আগ্রাসী লড়াই থেকে হটল না। পঁচাত্তর ভাগ ঘুসি সে এড়িয়ে এল শুধু তার দ্রুতগতিতে। নিজেকে ঘুসি থেকে সরিয়ে নেওয়ার এবং ঠিক জায়গায় ঘুসি পৌঁছে দেওয়ার পাল্লাদারিতে শিবা টেক্কা দিল।
শিবা জিতল আট—পাঁচ। তুমুল উল্লাসধ্বনি ছাপিয়ে শোনা গেল। একটা গলা, ”চালাইয়া যাও ওস্তাদ…কাইল আমমো ফ্রি রিসকা চালাইমু, পয়সা নিমু না।”
উৎপল চট্টরাজ আজও হাজির। শিবা দেখল তার পাশে মিতা। সে গ্লাভস পরা হাত দুটো জোরে—জোরে নাড়ল মিতার হাতনাড়া দেখে। এই মিতাই বোম্বাইয়ে চৌপট্টিতে বলেছিল, ”বক্সিং বিশ্রি, খালি ঘুসি মারা, মুখ ফাটিয়ে দেওয়া।” কিন্তু ব্যাপারটা যে শুধুই তা নয় সেটা হয়তো আজ সে বোঝাতে পেরেছে। স্কিল, গায়ের জোর, বুদ্ধি, মার নেওয়ার ক্ষমতা…সবই তো সে আজ দেখাল।
দেখল ফ্র্যাঙ্ক গোমসও, মিতাকে। রাত্রে জোনাকির কোয়ার্টারে সে উৎপলকে জিজ্ঞেস করল, ”আজ আপনার পাশে গ্রিন শালোয়ার—কামিজ—পরা একটা মেয়ে ছিল, চেনেন তাকে?”
”চিনব না কেন! ও তো আমার শ্যালী, মিতা, পারমিতা!”
”ফাইনালের দিন ও যেন শিবার বাউট দেখতে আসে, কাউন্ডলি আপনি কি সেটা দেখবেন?…আই উইল টেক নো চান্সেস। মিস্টার চট্টরাজ, অ্যাড্রিনালিন বলে একটা রস বডিতে তৈরি হয় যদি ইমোশনালি কেউ এক্সাইটেড হয়। এই রসটা একস্ট্রা পাওয়ার দেয়, রোখ বাড়ায়, পুশ করে অলআউট যাওয়ার জন্য। ফাইনালে ওটা আমার দরকার।…সেদিন নিতুকে আসতে হবে, একজন টিচারকে শিবা রেসপেক্ট করে, ননীকে বলে তাকেও আনাব। রিংয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত ওর মেন্টাল বিল্ট আপে কোনও গলদ আমি রাখতে চাই না। চার্জড হয়ে রিংয়ে উঠবে ইমোশনটা সঙ্গে নিয়ে। আর সেটাই…।”
”সেটাইটা কী?”
”শিবার ফিরে আসা…আমারও কামব্যাক, উইথা ব্যাঙ্গ…আ নক আউট আই ওয়ান্ট ফর দ্য রেজারেকশন।”
সব ওয়েট বিভাগের মধ্যে শুধু মিডল ওয়েটের ফাইনালেই বাংলার একজন। হঠাৎ যেন হুঁশ ফিরল কলকাতার। দর্শক পাঁচ হাজার ছাপিয়ে গেছে।
ড্রেসিংরুম থেকে শিবা বেরোতেই যে পারছে তার পিঠ চাপড়াচ্ছে। প্রত্যেকের মুখে একটাই কথা। জিততে হবে। বাংলার মান রাখতে হবে।
আশ্চর্য ঘটক শুধু বলল, ”তুই জিতলে বক্সিংয়ের দিকে বাঙালিরা তবু একটু তাকাবে।”
ফ্র্যাঙ্ক গোমসই শুধু অনুত্তেজিত। মুখে সামান্য হাসিও লেগে আছে।
কান্তি সরকার খুবই ব্যস্ত। সার্ভিসেসের ড্রেসিংরুমে বারবার যাতায়াত করছে তত্ত্বাবধানের কাজে। শিবাকে রিংয়ের দিকে যেতে দেখে সে ছুটে এল। ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ”সাবধান, তোকে ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট পাঞ্চ মারার প্ল্যান করেছে, রঙ্গার কোচকে আমি বলতে শুনলাম!”
গোমস শিবার সামনে হাঁটছিল। ঝটতি সে ঘুরে রাগী চোখে কান্তির দিকে তাকাল। কান্তি দাঁড়িয়ে গেল এবং দু’ পা পিছোল।
”ওর কথাগুলো মাথা থেকে বার করে দাও…খুব হার্মফুল এখন এসব কথা… কনসেনট্রেট!” গোমস কথাগুলো বলল যখন শিবা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে রিংয়ে উঠছিল।
প্রথমেই একটা বিশাল চিৎকারে তাকে অভ্যর্থনা জানাল দর্শকরা। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে বোম্বাইয়ে ব্রেবোর্নের মতোই লাগল শিবার কানে। হঠাৎ একটা নাড়া পড়ল তার মাথার মধ্যে। সেদিনও ছিল ফাইনাল!…রোজারিওর কাছে সে হেরেছিল…ছেলের সামনে ‘বীর’ হওয়ার জন্য বুড়ো বক্সার লড়েছিল।
”ওস্তাইদ, এধারে তাকাও…আমরা আইসাচি।”
শিবার গ্লাভসের ফিতেটা আর—একবার শক্ত করে বেঁধে দিচ্ছিল সুনীল। মুখ ঘুরিয়ে শিবা তাকাল। দেখতে পেল ননীকে। তার পাশে শক্তি দাস আর তার বউ সাগরমামি,…টাক, চশমা, ভবানী—সার। …উৎপল…টকটকে শাড়িপরা মিতা! তার দিদি, কোলে টুটুও!…শচীনকাকু!…দুর্লভ চক্রবর্তী, গ্যারাজ তা হলে বন্ধ রেখেছে।…দাদা কই?…ওই তো, সবাই হাত নাড়ছে, দাদা নাড়ছে না।
