লড়াই শেষে রেফারি তার হাতটা তুলে ধরেনি।
”আর হউ অ্যাশ্লিপ…শিবা?”
গোমসের আলতো নাড়ায় শিবা খাড়া হয়ে বসল। ট্যাক্সি দেবদাস পাঠক রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে।
”পেইন হচ্ছে?”
”না। একদম সেরে গেছে।” ট্যাক্সি থেকে নামার পর শিবা বলল, ”কালই আমি জিমে যাব সার। আসবেন?”
”ইয়েস, অফকোর্স যাব।”
।। ১৩ ।।
নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপস শুরুর আগের দিন লালবাগান জিম থেকে একটু দূরে স্কুটারে বসে সাধু কথা বলছিল পাশে দাঁড়ানো কান্তির সঙ্গে।
”বলছ কী কান্তি, ছ’—ছ’টা লড়াই কোনওক্রমে যে জিতল তাকে বলছ কিনা দারুণ ফর্মে আছে? শিবা তো এখন পয়েন্টের বক্সার!”
”সবার তা—ই মনে হবে কিন্তু আমি তো ওর ট্রেনিং দেখছি, একটু—আধটু বস্কিং যা বুঝি, তাতে বলতে পারি ও এখন দারুণ শ্যেপ—এ আছে। কাদের সঙ্গে ওকে লড়তে হবে তা অবশ্য জানি না, ড্র—টাই বক্সিংয়ে খুব ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার, তবে ফাইনালে সার্ভিসেসের রঙ্গরাজন উঠছেই। সিওল কাপে ব্রোঞ্জ গতবছর, এবার ম্যানিলায় মেয়রস কাপে গোল্ড পেয়েছে।”
”জানি। শুনেছি দারুণ জোরে মারে, কিন্তু স্লো। ম্যানিলায় দুটো নক আউট করে ফাইনালে একটা মঙ্গোলিয়ানের কাছে জিতেছে, বাইশ—সাত পয়েন্টে, বোম্বাই থেকে খবর আমি আনিয়েছি। ওর এগেনস্টে শিবার কোনও চান্সই নেই। আমি ওর ওপর টাকা ফেলতে রাজি নই।”
”অত জোর দিয়ে বোলো না সাধু…শিবা ওর ফর্ম লুকিয়ে রেখেছে, ওই ব্যাটা গোমসের এটা চালাকি। যদি ওর ওপর বাজি নাই ধরো তবু, ‘সাবধানের মার নেই’ পলিসি নাও। যদি শিবা ফাইনালে ওঠে, তা হলে ওকে নক আউটের ব্যবস্থা করে রাখো।” ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে কান্তি বলল।
”কীভাবে?” সাধুও ঝুঁকে পড়ল।
”ব্যবস্থা হয়ে যাবে…কী দেবে সেইটে বলো।”
”পাঁচশো।”
” উঁহুঁ।”
”এক হাজার।”
”তুমি কামাবে পঁচিশ—পঞ্চাশ, আর আমি মাত্র এক!”
”আরে, ওকে তো এমনিতেই রঙ্গরাজন নক আউট করবে, ব্যবস্থা করার কোনও দরকার নেই।”
”নেই তো নেই। পরে কিন্তু আমার কাছে ছুটে এসে ‘বাঁচাও কান্তি, ডুবে গেলুম’ বলে হাত চেপে ধোরো না।”
কান্তি হাঁটতে শুরু করল। স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে সাধু কান্তির পাশাপাশি চালাতে—চালাতে বলল, ”তুমি ঠিক বলছ, শিবা ফর্ম লুকিয়ে রেখেছে?”
”একশো ভাগ শিওর আমি।”
”ও ফাইনালে যাবে?”
”যাবেই।”
”ঠিক আছে, কত চাও?”
”পাঁচ।”
”অ্যাঁ!” সাধু অবাক হয়েই গম্ভীর হয়ে গেল। শুধু বলল, ”ঠিক আছে।”
”আমি লোকাল অফিশিয়াল হয়েছি, বাইরের টিমগুলোকে লড়াইয়ের সময় দেখভাল করার দায়িত্ব আমার। স্টেডিয়ামে তুমি আমার ধারেকাছে আসবে না কিন্তু।”
.
শিবার প্রথম লড়াই হরিয়ানার সতীশ শর্মার সঙ্গে।
স্টেডিয়ামের ভি আই পি এনক্লোজারের সামনে এরেনা—র মাঝামাঝি, রিং তৈরি করা হয়েছে, গ্যালারিতে পাঁচশো দর্শকও হয়নি। বক্সিং বছর তিরিশ—পঁয়ত্রিশ আগেও কলকাতায় জনপ্রিয় ছিল, যেমন ছিল কুস্তি। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান ছেলেরাও বক্সিং লড়ত। ভারতের ওলিম্পিকস দলে কলকাতার বক্সার বা কুস্তিগিররাও নির্বাচন পেত। কিন্তু বক্সিং, রিং বা কুস্তির আখড়া পশ্চিমবাংলায় এখন আর দেখাই যায় না। কয়েকটি মাত্র টিমটিম করে জ্বলছে। ক্রিকেট আর ফুটবল নিয়েই এখন মাতামাতি। গায়ের জোরের খেলায় বা যে—খেলায় সংবাদ মাধ্যমগুলোর ঢাকে কাঠি পড়ে না, বাঙালি ছেলেরা সেই খেলায় আর মাতে না।
কলকাতায় জাতীয় বক্সিং প্রতিযোগিতার প্রথম দিনে দর্শক যৎসামান্য হওয়ায় কেউই আশ্চর্য বোধ করেনি। পঞ্চম লড়াইটি ছিল মিডল ওয়েটের। শিবার কর্নারম্যান ফ্র্যাঙ্ক গোমস আর আগেরবারের মতোই সুনীল বেরা এবং অনিমেষ। রিংয়ে ঢুকে দু’ হাতে দড়ি ধরে শিবা নিজেকে ঝাঁকাচ্ছিল, পেশিগুলো আলগা করার জন্য। গোমস বিপরীত কর্নারের দিকে তাকিয়ে শিবাকে বলল, ”টেক ইট ইজি…মাথায় রক্ত চড়িয়ে দেবে না…মনে রেখো ফাইটারস আর ডিসকভারারস, ওর ফল্টগুলো বার করো।”
শিবা পাঁচ—ছ’টি ত্রুটি শর্মার মধ্যে বার করেছিল প্রথম রাউন্ডেই।
”কী মনে হচ্ছে?” শিবার মুখ থেকে মাউথপিসটা বার করে গোমস জিজ্ঞেস করল।
”টার্নিং খুব স্লো…দু’ হাতে জ্যাব নেই…ইনফাইটিংয়ে আসতে চায় না।”
গোমস শুধু মুচকি হাসল। সুনীল বরফজলের স্পঞ্জ শিবার ঘাড়ে—গলায় ঘষতে—ঘষতে বলল, ”দে না শেষ করে।” গোমস ঠোঁটে আঙুল রেখে সুনীলকে চুপ থাকতে ইশারা করল।
দ্বিতীয় রাউন্ডে সে শর্মার খুব কাছে গিয়ে ওয়ান—টু—থ্রি কম্বিনেশন পাঞ্চ মুখে চালিয়েই পিছিয়ে এল। শর্মা পায়ে—পায়ে এগোচ্ছে, শিবা দড়ির দিকে সরে এল। এবার বাগে পেয়েছি ভেবে নিয়ে শর্মা বিশাল একটা ডান হাতের ক্রস শিবার মাথার দিকে চালাবার জন্য শরীরের সব ভার ডান পায়ের ওপর রেখে নিজেকে প্রায় ছুড়ে দিল। বিদ্যুৎগতিতে শিবা সরে গিয়ে শর্মাকে দড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে দিয়ে পয়েন্ট তুলে নিল দুটো জ্যাব করে। তৃতীয় পাঞ্চটি দিতে যাচ্ছিল একটা আপার কাট, যেটা হয়তো নক আউট পাঞ্চই হত।
”নো ও ও ও ।”
শিবা সংবিৎ ফিরে পাওয়া চোখে নিজের কর্নারের দিকে একবার তাকাল। গোমস হাত তুলে রয়েছে। তার কাছাকাছি দাঁড়ানো একটি ব্যাজপরা লোকের ঠোঁটে তখন হাসি খেলে গেল এবং তারপরই ঠোঁট কামড়ে ধরল। লোকটি কান্তি।
