শেয়ালের মতো ধূর্ত! চিন্তার হদিস পেয়ে গেছে নিশ্চয়। দূরে—দূরে ঘুরছে, ইনফাইটিংয়ে একেবারেই আসতে চাইছে না।
সে এগোল। রিংটাকে আড়াআড়ি কেটে এগোতে—এগোতে সে রোজারিওকে কর্নারে যখন নিয়ে যাচ্ছে, প্রায় আট হাজার দর্শক তখন নকআউটের গন্ধ পেয়ে বীভৎস চিৎকার করল, ”কিল, কিল, কিল।”
তার লেফট হুকটা তৈরি হয়ে ওঠার আগেই রোজারিও দ্রুত এগিয়ে এসে জড়াজড়ি করে ফেলল। তার গলা জড়িয়ে ধরেছে ওর ডান হাত, বাঁ হাত কোমর। এই অবস্থায় ঘুসি মারা যায় পেটে বা বগলে, তাও খুব জোরে নয়। কয়েকটা বোবা ঘুসি সে চালাল, রোজারিওকে ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ও ছাড়ছে না।
”ব্রেক।” রেফারি বিচ্ছিন্ন হয়ে দু’জনকে সরে যেতে হুকুম দিল।
পিছোতে গিয়ে তার ডান পা অতি সামান্য পিছলে গেল। পলকের জন্য সে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়েছে আর সঙ্গে—সঙ্গে ঠিক কানের ওপর রোজারিওর রাইট সুইংটা এসে পড়ল এবং সেটাকে অনুসরণ করে বাঁ হাতের সোজা একটা পাঞ্চ।
ক্যানভাসের ওপর তার পড়ার শব্দটা ব্রেবোর্নের নর্থ স্ট্যান্ডের চালে ধাক্কা খেয়ে নেমে এল দর্শকদের ওপর। তারা হতবাক। দ্রুতই সে উঠে পড়ে, কিন্তু মনের জোরে যেন কিছুটা তুলে নিয়ে গেল ওই দুটো পাঞ্চ। সেই জায়গায় ঢুকে এল ভয়। আর সেই ভয়ের তাড়সেই সে বুনো শুয়োরের মতো এগোল।
মুখে দুটো জ্যাব পড়ল, পাঁজরে সোজা একটা। রোজারিওর পাঞ্চে জোর নেই, সে কোনওরকম ব্যথা টের পেল না, তখন সে খুঁজছে বাঁ হাতের পাল্লার মধ্যে ওই বুড়োটাকে পেতে। পেয়েও গেল। লেফট হুকের সঙ্গে—সঙ্গে ডান হাতেও একটা।
পড়ে গেল রোজারিও। রক্ত বেরিয়ে আসছে নাক দিয়ে। কয়েক হাজার কণ্ঠের চিৎকার একসঙ্গে বেরিয়ে বোমার মতো ফাটল। ওরা যা চাইছিল তা পেয়েছে।
”পাপ্পা…পাপ্পা।”
একটা ভীত কচি কণ্ঠস্বর। ছোট্ট ফোঁপানি।
”পাপপা…ওহহ।”
ক্যানভসে উপুড় হয়ে থাকা রোজারিও ধীরে—ধীরে মুখ তুলল। দু’ হাতে ভর দিয়ে নিজেকে তুলে তাকাল যেদিক থেকে ডাকটা আসছে। তারপরই ওর দু’ চোখে ঠিকরে উঠল, দুর্দমনীয় জেদ আর ইচ্ছা।
সে তাকিয়ে দেখছিল রোজারিওকে। লোকটা মানুষ না অন্য কিছু। ওই দুটো ঘুসি খাওয়ার পরও উঠে দাঁড়াচ্ছে।
”ফাইভ…সিক্স…”
”পাপ্পা প্লিইজ গেট আপ।”
রোজারিও ছেলের দিকে মুখটা দেখাল। গালের পেশি দুমড়ে গেল। টপটপ রক্ত থুতনি বেয়ে সাদা গেঞ্জিতে ঝরছে। বিড়—বিড় করে কিছু বলল।
”এইট…নাইন…”
শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে রোজারিও উঠে দাঁড়াল। মুখ ফিরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসল। একবারও পা কাঁপল না। চোখ বন্ধ করল না, টলে উঠল না।
কর্নার থেকে সে এগোল আবার ওকে মারার জন্য। রোজারিও মুখের সামনে দু’ হাতের গার্ড রেখে পিছিয়ে গেল। আর তখনই প্রথম রাউন্ড—শেষের ঘণ্টা পড়ল।
বিভ্রান্ত চোখে সে রোজারিওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, এত জোর লোকটা পেল কোথা থেকে? তিনটে নক আউট এই পাঞ্চেই হয়েছে, অথচ উঠে দাঁড়াল! কিসের জোরে? গেঞ্জির বুকের কাছটা রক্তে লাল। চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। নিজের কর্নারে গিয়ে রোজারিও টুলে বসল।
”পাপ্পা ইউ আর আ ফাইটার…পাপ্পা ইউ আর আ ফাইটার…পাপ্পা…”
রোজারিওর একটা চোখের চারপাশ ফুলে উঠেছে। অন্য চোখে অদ্ভুত একটা হাসি। ভীষণ মজাদার এই লড়াইটা, তাই না রে, এমন একটা ভাব করে সে ছেলের দিকে তাকিয়ে। ডান হাতের গ্লাভসটা তুলে নাড়ল। ওর জীবনের সবচেয়ে দামি স্বপ্নটা সার্থক হয়েছে।
‘ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট হল না। কীরকম একটা বিষণ্ণতা তার মধ্যে ছেয়ে আসছে। হাত, পা, মুখ, তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতে—দিতে সুনীল ঝড়ের মতো নির্দেশ, উপদেশ দিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না।
অন্য কর্নারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সে ভবানী—সারকে দেখতে পেল। মাথাটা ঝোঁকানো, ঠোঁট দুটো সামান্য খোলা… আমি নুইব না, নুইব না! সে নিজেকে তখন জিজ্ঞেস করল, আমি তা হলে সাধু হয়ে গেছি? এখন শিবাকে চাই…কোথায় সে?
”পাপ্পা কাম অন…ফাইট।”
তার বুকটা কেঁপে উঠল। মনের গভীরে সে অসহায়ের মতো শিবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। রোজারিওর মুখটা ভবানী—সারের মতো কেন?…রোজারিও পয়েন্ট তুলে নিচ্ছে তাকে হিট করে করে।
”শিবাজি, নক হিম আউট, কাম অন শিবাজি।”
চিৎকারগুলো আর তার মধ্যে উত্তেজনা আনছে না। সে আর মারতে চায় না, মার খেতে চায়। দ্বিতীয় রাউন্ড—শেষে সে টুলে বসে দু’ হাতে মুখ ঢাকল।
”শিবাজি ইজ আ চিট…ফেক হ্যায়, নকলি হ্যায়।”
বলুক, ওরা বলুক। তোয়ালে নেড়ে সুনীল বাতাস করছে। আর কোনও উপদেশ—নির্দেশ দিচ্ছে না। বোধ হয় বুঝে গেছে লড়াই শেষ, তৃতীয় রাউন্ডও দ্বিতীয়টার মতো হবে।
গোমস—সার বহুবার বলেছিল, চ্যাম্পিয়ান তৈরি হয় তাদের ভেতরের, একেবারে ভেতরের জিনিস থেকে…সেটা হল ইচ্ছা, মনের জোর, যাকে বলে উইল। রোজারিওর ইচ্ছা ছেলের সামনে বীর হবে। বীরের ছবিটা চিরকাল নীলের মনে জ্বলজ্বলে হয়ে থাকুক। এই ইচ্ছা নিয়েই রিংয়ে উঠেছে।
সে কারও জন্য ছবি আঁকতে চায় না। তার কোনও ইচ্ছা নেই, তার কোন নিজের লোক নেই। ভবনী—সার হারেনি। রোজারিও হারবে না বুঝে গিয়েই সে তৃতীয় রাউন্ডের জন্য উঠে দাঁড়ায়।
