”বলল, অপোনেন্টকে মারার জন্য আমরা মনের মধ্যে একটা ঘৃণা তৈরি করি, আসলে কিন্তু অন্তরে আমরা কাউকে ঘেন্না করি না।”
”মনের মধ্যে ঘেন্না বানিয়ে লড়তে হবে, জিততে হবে। কেন, ওটা ছাড়া এমনই কি জেতা যায় না?”
সুনীল বলেছিল, সে জানে না।
প্রথম লড়াইয়ের আগে ড্রেসিংরুমে কাঁচাপাকা চুল ভরা, মাথা, ঘাড়েগর্দানে, বেঁটে একটা লোক এসে বলল, ”আই আমি বেহরাম মিস্ত্রি।”
প্রিয় হালদারের কাছে নামটা সে শুনেছে। গোরাবাবুর সঙ্গে এই লোকটা আর এক পাঞ্জাবি মিলে নাকি অল ইন্ডিয়া টুর্নামেন্ট করবে। বেহরাম বলল, ”গোরাচাঁদ টেলেক্সমে ভেজা, তুম বহত ফাস্ট অউর হার্ড হিটার বক্সার! তুমহারা পর উইনকা দর আহমেদাবাদ অউর বোম্বাইমে তিন—এক, কানপুরমে পাঁচ—এক। ফার্স রাউন্ড নক আউট করো, এক হাজার রুপৈয়া ইনাম মিলেগা।”
রিং গেমে দু’ মিনিটের মধ্যে দিল্লির অরুণকুমারকে নক আউট করেছিল। স্টেডিয়ামের দর্শকদের উন্মত্ত চিৎকার তার ভাল লাগছিল। ওরা চায়, ঘুসি মেরে একটা লোকের লুটিয়ে পড়া দেখতে। যে দেখাতে পারে তাকে ওরা ভালবাসবে। সে ভালবাসা চায়। গোরাবাবুর আশ্রয়ে নিঃসঙ্গ জীবনটা ভরাবার জন্য এই চিৎকার তার দরকার। বেহরাম হাজার টাকা দিয়েছিল।
পরের লড়াই রেলওয়েজের মার্টিনের সঙ্গে। আবার বেহরাম বলল, ”ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট করো…হাজারই মিলেগা।”
ফার্স্ট রাউন্ডেই সে মার্টিনকে ফেলে দিয়ে কানের পরদা ফাটানো চিৎকার শুনেছিল। রিং থেকে নামতেই অনেকে ছুটে আসে পাগলের মতো, তাকে স্পর্শ করার জন্য। বেহরাম হাজার টাকা দিয়েছিল।
সেমিফাইনাল ছিল সার্ভিসেসের শ্যামবাহাদুরের সঙ্গে। ইতস্তত করে, বেহরাম বলেছিল, ”ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট হোগা?” দু’বার হয়েছে, তৃতীয়বারও কি তা সম্ভব?
”চেষ্টা করেগা।”
”দো হাজার।”
দু’ হাজার টাকাও সে জিতে নিল। রিং থেকে কারা যেন তাকে কাঁধে তুলে ড্রেসিংরুমে নিয়ে গেছল। তখন যা কিছু দেখছিল, যা কিছু শুনছিল, সবই অবাস্তব, অলীক বলে তার কাছে মনে হচ্ছিল। চায়ের দোকানের শিবা ব্রেবোর্নকে কাঁপিয়ে ”শিবাজি…শিবাজি” চিৎকারে যেন ছত্রপতি শিবাজিরই মর্যাদা পাচ্ছে। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তার ফাইনালে ওঠার খবর পেয়ে কলকাতা থেকে প্লেনে উড়ে এল গোরাবাবু। তাকে হোটেলে ডেকে এনে বলল, ”এই ফাইনালে তোমাকে নিয়ে বেটিং হচ্ছে, হাজার—হাজার টাকার বাজি! আমারও অনেক টাকা এতে রয়েছে। ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট, ফোর্থ টাইম…কী মনে হচ্ছে? লড়তে হবে রেলের রোজারিওর সঙ্গে, ওর লড়াই দেখে নিয়েছ?”
”রোজারিও বুড়ো হয়ে গেছে, আমার থেকে অনেক স্লো, পাঞ্চেও জোর নেই, দমও নেই।”
”লোকটা কিন্তু পাঁকাল মাছের মতো পিছল, শেয়ালের মতো ধূর্ত।” গোরাবাবু হুঁশিয়ার গলায় বলল।
”দেখা আছে সব।” সে একটু তেতে উঠল তার সামর্থ্যের ওপর গোরাবাবুর দ্বিধা দেখে। সব জারিজুরি ভেঙে দেবে চোয়ালে একটা লেফট হুক বসিয়ে।”
”বেহরাম আমার পার্টনার হলেও ওকে আমি বিশ্বাস করি না। গোপনে হয়তো ও বাজি ধরবে রোজারিওর ওপর, তাই চাইবে ফেভারিটকে হারিয়ে আপসেট ঘটাতে। তোমাকে কিছু খেতে—টেতে দিলে খাবে না, জলও নয়। নিজে সঙ্গে করে ফ্লাস্কে জল নিয়ে যাবে। মনে রেখো, অনেক টাকা ধরেছি তোমার ওপর …ফার্স্ট রাউন্ড।”
কিন্তু সে জানত না রোজারিওর বউ ও ছেলে রিংয়ের ধারে বসবে। ছেলে একবার অন্তত বাবাকে লড়তে দেখুক, এটাই রোজারিওর ইচ্ছে। রিংয়ে উঠেই তার চোখে পড়ল নীল, তার দিকে তাকিয়ে। বড়—বড় দুটি চোখে বিস্ময়, সারল্য, কৌতূহল। চোখাচোখি হতেই নীল হাত নাড়ল। সে পারল না। হাত তুলতে গিয়ে মনে হল বগলটা জং—ধরা কবজার মতো।
তখন সে ভেবেছিল, হেট দরকার, হেট। রোজারিওকে ঘেন্না। নয়তো সে লড়তে পারবে না। মনের ভেতর একটা গনগনে আক্রোশ এখন চাই। এই জং—ধরা কবজাটায় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করছে, এটাকে হেট দিয়ে ঘষে—ঘষে সচল করে তুলতে হবে।
কিন্তু রোজারিওকে খারাপ মানুষ ভাবার মতো ওর সম্পর্কে তো কিছুই সে জানে না। যতটুকু ওকে দেখেছে, বেশ ভালই লেগেছে। হাসিখুশি, ভদ্র, আমুদে। রিংয়ে শ্যাডো করতে—করতে নজর আবার নীলের ওপর গিয়ে পড়ল। তখন সে নিজের ওপর রেগে উঠে ভাবল, কেন ওকে নীলু মনে হল! কেন ওকে বেলুন কিনে দিতে গেলুম!
রোজারিও রিংয়ে উঠতেই নীল দাঁড়িয়ে উঠল। এগিয়ে এল রিংয়ের ধারে। উবু হয়ে বসে রোজারিও রোপ—এর ফাঁক দিয়ে মাথা গলিয়ে নীলের কপালে চুমু দিল। গলা জড়িয়ে নীল বাবার দুই গালে চুমু দিল। দেখতে—দেখতে তার বুকের মধ্যে একটা ধস নামল। একদম নির্জন ফাঁকা হয়ে গেল বুকের মধ্যে। তার কোনও আপনজন এখানে নেই। কলকাতা হলে ননী নিশ্চয়ই থাকত। ননী আর থাকবে না। কেউ তার চারপাশে আর নেই—মা, দাদা, ভবানী—সার, সাগরমামি, শচীনকাকু, আশ্চয্যদা, গোমস—সারও।
প্রথম রাউন্ড শুরুর ঘণ্টা বাজতেই রোজারিওর দিকে সে তেড়ে গেল। কয়েকটা জ্যাব আর স্ট্রেট লেফট দিয়েই তার মনে হল লোকটার ফুটওয়ার্ক অসম্ভব ভাল। শরীর থেকে ঘুসি ঝেড়ে ফেলার কায়দাটা জানে। জানুক। তার বাঁ হাতের চৌহদ্দি থেকে রোজারিওকে বেরোতে দেবে না। ফার্স্ট রাউন্ডে ফেলে দিতে হলে ওকে টেনে আনতে হবে কিংবা এগোতে হবে।
