”চোখ নিয়ে তোর খুব অসুবিধে হচ্ছিল।”
”কে বলল হচ্ছিল!”
হাসি খেলে গেল কান্তির চোখে। আমিও একটু—আধটু বক্সিং করেছি যে, চোখে কিছু পড়লে তখন কী হয় আমি জানি। ইনজুরিটা তাড়াতাড়ি সারা, আর তো মাত্র হপ্তাতিনেক সময় আছে।”
কান্তি সরে গেল গোমসকে আসতে দেখে।
”ঘর যাবে তো, চলো।” গোমস কথাটা বলে ভ্রূ তুলল। ”কান্তি তোমায় কী বলছিল?”
”চোখ নিয়ে…।”
”শিবা।” গম্ভীর হয়ে গেল গোমস। ”আজ যদি একটু ভাল ফাইটারের সামনে পড়তে যার মগজ আছে, যে অপোনেন্টকে কিনলি অবজার্ভ করে, চোখের ওপর থেকে চোখ সরায় না, হু ইজ অ্যান অপারচুনিস্ট, সামান্য দু’ সেকেন্ডের সুযোগকেই যে কাজে লাগায় এমন কেউ আজ থাকলে তোমায় নক আউট করে দিত। ইউ আর ভেরি—ভেরি লাকি।”
শুনতে—শুনতে ফ্যাকাসে হয়ে গেছল শিবার মুখ। ক্ষীণ স্বরে বলল, ”কখন করত?”
”ফোর—ফাইভ সেকেন্ডস তুমি নিজেকে আনগার্ডেড রেখেছিলে। ইনাফ টাইম টু নক ইউ আউট; ইনাফ, ইনাফ…রিমেম্বার হোয়েন আই শাউটেড? রিমেম্বার রোজারিও?”
শিবার মনে হল, তাকে অজ্ঞান করে অপারেশন টেবিলে তোলার জন্য ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। ফ্যালফ্যাল করে সে গোমসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অপলকে।
”চলো ট্যাক্সি ধরব, ইনজুরি নিয়ে বাসে ফেরা চলবে না।”
ট্যাক্সিতে শিবা নিজেকে সিটে এগিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। সাড়ে তিন বছর…কিন্তু এখনও তার স্পষ্ট সব কথা, সব ঘটনা মনে আছে। সাড়ে তিন বছর আগে বোম্বাইয়ে, ন্যাশনালসের ওয়েল্টার ওয়েট ফাইনাল…রিমেম্বার রোজারিও। হ্যাঁ, সে কখনও ভুলবে না সেই হারের কথা…কিন্তু কেন সে হেরেছিল! নক আউট করেছিল তিনজনকে, ফার্স্ট রাউন্ডেই, ফাইনালে সে ফেভারিট…ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে লোক ভেঙে পড়েছিল নক আউট দেখার জন্য।
শিবা কাতরে উঠল। চিবুক তুলে হাঁ করে ট্যাক্সির চালের দিকে তাকাল। পাশে বসা গোমস আলতোভাবে শিবার কপালে আঙুল ছুঁইয়ে কোমল গলায় বলল, ”পেইন হচ্ছে?”
”হ্যাঁ।”
”পেইন কিলার ক্যাপসুল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
শিবা মনে—মনে বলল, ঠিক হবে না। তাকে সাড়ে তিন বছর আগে ফিরে গিয়ে স্মৃতির মধ্যে ডুব দিতে হবে। প্রতিটি মানুষ, তাদের কথা, চাহনি, চলাফেরা, হাসি, চিৎকার…সব তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে মনের মধ্যে।…রিমেম্বার, রিমেম্বার রোজারিও।
চোখ বন্ধ করল শিবা। তিন বছর আগে বোম্বাইয়ে, মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটতে—হাঁটতে চৌপট্টিতে…সে আর সুনীল বেরা। মেলার মতো ভিড়। ভেলপুরি, আলু—মটর, আইসক্রিম, পাওভাজি, যা দেখছিল তাই কিনে খাচ্ছিল। বালি আর কাদা মাড়িয়ে সে সাগরের জলের স্বাদ কেমন জানার জন্য আরব সাগরের দিকে যাচ্ছিল। তখন দেখতে পায় সুনীল কথা বলছে রোজারিওর সঙ্গে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছয়—সাত বছরের একটি ছেলে আর স্কার্ট—ব্লাউজ পরা শ্যামবর্ণা এক মহিলা।
সুনীল তাকে হাতছানি দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকল।
তারপর…
।। ১২।।
সে এগিয়ে যেতেই রোজারিও হাত বাড়িয়ে দিল। কুণ্ঠিতভাবে সে হাত মেলাল।
”বেরা ওয়াজ জাস্ট টেলিং মি অ্যাবাউট ইউ। হাম তো রিটায়ার করনেওয়ালা বুঢঢা হ্যায়। বেরাসে শুনা তুমহারা পাঞ্চ বহত জবরদস্ত হ্যায়। তো দেখো বাবা, হামকো জারা আস্তে সে হিট করো! হাম মর যায়গা তো মেরা বিবি—বাচ্চচাকো কউন দেখেগা।” রোজারিও এই বলে হো—হো করে হেসে ওঠে।
লোকটাকে তার ভাল লেগে গেল। সে বলে ফেলল, ”হাম তো আপনার কাছ সে শিখে গা।”
”কেয়া শিখে গা?”
সে ভেবে পাচ্ছিল না এবার কী বলবে! রোজারিওর মুখের হাসিটা আস্তে—আস্তে মিলিয়ে গেল। ধীর শান্ত স্বরে বলল, ”তো শুনো, নেভার শেক হ্যান্ড উইথ অ্যান অপোনেন্ট আনটিল ইউ হ্যাভ হুইপড হিম। জিতনে কা আগে অপোনেন্ট কা সাথ কভি হ্যান্ডশেক না করো।”
”হ্যান্ডশেক আপ তো আভি কিয়া। শিবা তো আপকা অপোনেন্ট হ্যায়।” সুনীল বলল।
”দেখো, হাম অপোনেন্টকো হেট করতা। উই ফাইট, লেকিন ডিপ ইন আওয়ার মাইন্ড উই ডু নট রিয়্যালি হেট। হাম মনমে হেট বানাতা, মনমে অপোনেন্টকো খারাপি দুশমন বানাকে অ্যাটাক করতা।”
তার পাশেই দাঁড়িয়ে রোজারিওর ছেলেটি। একদৃষ্টে বেলুনওলার হাতে ধরা বিশাল—বিশাল বেলুনগুলোর দিকে জুলজুল চোখে তাকিয়ে।
সে ঝুঁকে বলল, ”খোকা, বেলুন নেবে?”
ছেলেটি লজ্জা পেয়ে মায়ের দিকে সরে গেল হাত ধরে ছেলেটিকে সে বেলুনের দিকে টেনে নিয়ে দশ টাকার দুটো বেলুন কিনে ওর হাতে দিতেই খুশিতে ঝকমক করে উঠল ওর মুখ। হাসিতে টোল পড়ল গালে।
”কী নাম তোমার, নাম কেয়া?”
”নীল, নীল রোজারিও।”
নীল! ধক করে উঠল বুকের মধ্যে। ছোট ভাই নিলু, অনেকটা এই বয়সেই মারা গেছে।
”আচ্ছা শিবা, থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য বেলুনস। হামকো আভি তো কোলাবা যানে পড়ে গা, এক ফ্রেন্ড কা হাউস মে।…ইয়ে মেরা লাস্ট অ্যান্ড ফিফটিনথ ন্যাশনাল। পাপ্পা ক্যায়সা ফাইটার, নীল আপনা আঁখো সে দেখে গা। ইস লিয়েই হাম উনকো বোম্বাই লে আয়া, ইটস নীলস লাস্ট চান্স টু উইটনেস হিজ ফাদার ইন দ্য রিং।”
যাওয়ার সময় নীল বলল, ”থ্যাঙ্ক য়ু আঙ্কল।” যেতে—যেতে মুখ ফেরাল, হাত নাড়ল। সেও হাত নাড়ল।
”ছেলেটা বেশ। আমার এইরকম একটা ভাই ছিল।” তার কথার কোনও জবাব সুনীল দিল না।
”কী বলল বলো তো হ্যান্ডশেক করা নিয়ে?” সে জিজ্ঞেস করেছিল সুনীলকে।
