অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে কান্তি প্রায়ই সন্ধ্যায় এসে আশ্চর্য ঘটক এবং অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে আর লক্ষ করে শিবার ট্রেনিং। ওয়েলেসলির পুরনো ফার্নিচারের দোকানের কাজ সেরে ফ্র্যাঙ্ক গোমস জিম—এ আসে সন্ধ্যার পর। সে আবার সঙ্গে—সঙ্গেই কান্তি জিম থেকে বেরিয়ে পড়ে।
একদিন হেভি ব্যাগে শিবার ঘুসিমারা দেখতে—দেখতে কান্তি বলল, ”জীবনের প্রথম ঘুসিটা তুই আমার কাছে খেয়েছিলি, এই জায়গাতেই, মনে আছে?”
খুব ভালভাবেই শিবার মনে আছে। কিন্তু সে কান্তির কথায় কান না দিয়ে পাঞ্চ করে যেতে লাগল।
”এখন ভাবলে হাসি পায়। সেদিন তুই যদি পালটা একটা ঝাড়তিস তা হলে ভাঙা চোয়াল নিয়ে আমাকে জীবন কাটাতে হত।”
শিবা ঘুসি চালানো বন্ধ করল। ”কান্তিদা, আপনার চোয়াল জোড়া লেগে যেত, সাধুর তো জোড়া লেগে গেছে!”
”সাধুকে তো আস্তে মেরেছিলি, আমাকে কি আর আস্তে মারতিস?”
”বোধ হয়, না।” কথাটা বলে শিবা হলঘরের দরজার দিকে এগোল, বাইরে খোলা বাতাসে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য।
এই দরজা দিয়ে হলঘরে প্রথমদিন ঢুকে সে কান্তির সামনেই পড়েছিল। ”কী রে, তোকে আগে কখনও তো দেখিনি?”
”আমাকে আসতে বলেছিল।”
”কে, গোমস নিশ্চয়?”
শিবা মাথা কাত করে।
”কখনও লড়েছিস?”
”না।”
”ঘুসি মেরেছিস কখনও?”
”না।”
”বক্সিং শিখতে এসেছিস, তাই তো?”
”হ্যাঁ।”
”শিখতে গেলে প্রথমেই কী করে ঘুসি হজম করতে হয় তার ট্রেনিং নিতে হয়।” কান্তি দু’ হাতে গ্লাভস পরে হাত দুটো শিবার মুখের কাছে ধরে বলেছিল, ”কী বল তো?”
”ঘুসি।”
”বাহ, তুই তো জানিস দেখছি। এটা এবার তোকে হজম করতে হবে।”
বলার সঙ্গে—সঙ্গেই শিবার ডান পাঁজরে সে ঘুসি মারল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের সামনে যাবতীয় বস্তু কালো হয়ে যায়। শ্বাস নিতে গিয়ে বুকে তীক্ষ্ন যন্ত্রণা বোধ করে। এর পর আবার ঘুসি বাম পাঁজরে। তারপরে দু’ হাতে কান্তি চারটে ঘুসি মারল বুকে আর পেটে। শিবা উবু হয়ে বসে পড়ে বুক চেপে ধরে।
”এবার তুই বাইরে গিয়ে বাঁ দিকে যাবি। ওখানে রিংয়ের পাশে একটা বুড়োকে দেখবি বেঞ্চিতে বসে আছে। নাম আশ্চয্যদা। এখানকার সেক্রেটারি। তাকে গিয়ে বলবি কান্তি সরকার আশীর্বাদ করে দিয়েছে, এবার আমি বক্সিং শিখব।” এই বলে কান্তি খিকখিক করে হেসে যেতে থাকে।
অকারণে মানুষকে আঘাত করে, যন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া মুখ দেখে কেউ যে আনন্দে হেসে উঠতে পারে এমন লোক সাধুর পর শিবা দ্বিতীয়বার দেখল কান্তি সরকারকে।
”আমার ওপর তুই রেগে আছিস জানি।”
শিবা বর্তমানে ফিরে এল কথাগুলো শুনে। কান্তি হলঘর থেকে বেরিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
”কিন্তু তুই বিশ্বাস কর, কমলালেবুতে যে ওষুধ দেওয়া আছে তা আমি জানতাম না। সাধু বলল, শিবাকে দিয়ে বলবি গুড উইশ জানিয়ে গোমস পাঠিয়ে দিয়েছে, লড়াইয়ের আগে যেন খায়। তা হলে এনার্জি দেবে, স্ট্যামিনা দেবে।….খোসা ছাড়িয়ে টিফিনকৌটোয় ভরে আমিই তোকে দিয়ে এসেছি।” কান্তির গলা ধরে এল। শিবার কাঁধে সে হাত রাখল।
”এসব কথা এখন, এত বছর পর কেন?” কান্তির হাতটা রূঢ়ভাবে শিবা কাঁধ থেকে ফেলে দিল।
”তুই আমাকে সারাজীবন ভুল বুঝে থাকবি।…তোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, সাধনা দেখে আমার বুকের মধ্যে কী যে হচ্ছে। শিবা তুই বড় হয়ে ওঠ, ভগবানের কাছে রোজ প্রার্থনা করি তুই বড় হ, আবার আগের মতো নক আউটের পর নক আউট করে রিং কাঁপিয়ে দে। দূর থেকে আমি দেখব আর চোখের জল মুছব।”
”নক আউট!”
”হ্যাঁ। তোর কাছে এটা খুব সামান্য চাওয়া। ট্রেনিংয়ে তোকে যেরকম দেখছি তাতে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি প্রত্যেকটা লড়াই তুই নক আউটে জিততে পারবি।”
”শিবা ওয়ার্ক আউট কি শেষ হয়ে গেছে?” আশ্চর্য ঘটকের গলা ভেসে এল।
”না, আশ্চয্যদা।” শিবা একটু বেশি ব্যস্ত হয়ে হল—এ ঢুকে গেল। রাজ্য চ্যাম্পিয়ানশিপটাই ছিল নির্বাচনী ট্রায়াল। হলধর টুর্নামেন্টে যাদের সঙ্গে লড়েছিল, ট্রায়ালে সে তাদেরই পেল; উপরন্তু নতুন একজন, হাওড়ার সমীর সাঁতরাকে। ওর সঙ্গে লড়াইয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে শিবার নতুন একটা অভিজ্ঞতা হয়। সাঁতরার একটা রাইট ক্রস থেকে মুখ সরালেও গ্লাভসটা তার বাম ভ্রূ ঘষে বেরিয়ে যায়। ভ্রূ—র ওপরের চামড়া ফেটে রক্ত চুঁইতে থাকে চোখের ওপর। সে দেখতে পাচ্ছিল না বাঁ চোখে।
একটা চোখে ঝাপসা, অন্যটায় পরিষ্কার দেখা জীবনে এই প্রথম। হয়তো বিস্মিত হয়েই সে পাঁচ—ছ’ সেকেন্ড বিহ্বল হয়ে থমকে গেছল।
”শিবা!”
রিংয়ের বাইরে থেকে ফ্র্যাঙ্ক গোমসের তীক্ষ্ন চিৎকারে তার সংবিৎ ফিরে আসে। অস্বস্তিকর একচোখো দৃষ্টি নিয়ে সে সাঁতরার ঘুসির এলাকার বাইরে চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করে। সাঁতরা যতই এগোয়, ততই সে সরে—সরে যায়। রাউন্ড—শেষের ঘণ্টা না বাজা পর্যন্ত সে বাঁ চোখের পাতা বন্ধ করে রাখে। ডাক্তার রক্ত পড়া বন্ধ করে স্টিকিং প্লাস্টার লাগিয়ে দেন। তৃতীয় রাউন্ডে শিবা পরিষ্কার চোখে সাঁতরাকে মারতে শুরুকরে। তবে মনের মধ্যে একটা খচখচানি শুরু হওয়ায় মুখটা বাঁ দিকে সামান্য ঘুরিয়ে রেখেছিল যাতে কাটা জায়গাটায় আঘাত না লাগে।
শিবা পয়েন্টেই জিতেছিল। ড্রেসিংরুমে যখন সে চুল আঁচড়াচ্ছে, কান্তি তখন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
