”হুঁ।”
ভবানী—সারের কোচিংঘরের দরজা বন্ধ। রিকশা থামিয়ে শিবা নামল। জানলায় উঁকি দিয়ে দেখল ভবানী—সার হুমড়ি দিয়ে বসে একটা খাতায় অঙ্ক কষছেন। শিবা কথা বলে ব্যাঘাত করল না। তবে দেওয়ালে একটা নতুন লেখা চোখে পড়ল। কিছুই বুঝতে পারল না, যেহেতু সেটা ইংরেজিতে।
”সারের কোচিংয়ে আবার নাকি ভিড় হচ্ছে?” শিবা জানতে চাইল।
”হ। দশ—পনেরোজনরে ফিরাইয়া দ্যাছেন। মুখুজ্যেবাড়ির রঞ্জু আমারে ধরচিল তার ভাইপোডারে সারের কোচিংয়ে ভর্তি করাইবার জইন্য। গিয়া কইলাম সাররে। এক কথায় লইয়া লইলেন।”
”তুই বলতেই সার নিয়ে নিলেন!”
”ক্যান, রিসকা চালাই বইল্যা কি আমার মানসম্মান কম নাহি? সার রোজ আমারে ডাইক্যা তর কথা জিগায়, খবর লয়। তা আমি যদি এহন একডা রিকোয়েস্ট ওনারে করি, রাইখবেন না? রঞ্জুর দাদা কাঠের ফারনিচার কাইরখানা কইরতাচে ওনাদের বাগানের জমিতে, সেজ ভাইডারে ওহানে ফিট কইরা দিবার কতা ভাইবত্যাচি।”
ননী কিন্তু সারাক্ষণে একবারও জিজ্ঞেস করল না, আজকের লড়াইয়ের ফল কী হল!
পরদিন শিবা কাঁকুড়গাছি ব্যায়াম সমিতির তুষার মিত্রকে নিয়ে তিন রাউন্ড ছেলেখেলা করল। ছেলেটি মাসতিনেক হল বক্সিং শুরু করেছে। বহু পয়েন্টের ব্যবধানে শিবা জিতল। তার পরের দিন ফাইনালে শিবা যাকে পেল, রাস্তায় মারামারি করায় তার নাম হয়েছে, একটা ‘হবু সাধু’, ই সি পি সি এ—র গৌতম নাগ। প্রথম রাউন্ডে নকআউটে জিতেছে। ওর লড়াইয়ের কায়দাটা হল, বুনো শুয়োরের মতো ঘোঁত—ঘোঁত করে তেড়ে যাওয়া, রাইট সুইং আর লেফট সুইং, বাটারফ্লাই সাঁতার কাটার মতো দু’হাতে দু’ পাশ দিয়ে ঘুসি চালায়, তবে পাঞ্চে জোর আছে। নড়াচড়ায় অত্যন্ত মন্থর।
বিদ্যুৎ—গতিতে সরে—সরে শিবা জ্যাব করে গেল বাঁ হাতে। এত দ্রুত সে ঘুরছিল যে, গৌতম বুঝে উঠতে পারছিল না কোনদিক থেকে লেফট হুক আর জ্যাবগুলো তার দিকে আসবে, মাথায় লাগবে রাইট ক্রস। অন্তত ছ’বার শিবা নিখুঁতভাবে নকআউট পাঞ্চ বসাতে গৌতমের চোয়াল পেয়েছিল। বসায়নি। শিবা বক্সিং লড়াই সম্পর্কে চমৎকার একটা শিক্ষা দিয়ে গৌতমকে বুঝিয়ে দিল রাস্তার মাস্তানি আর রিংয়ের মাস্তানি এক জিনিস নয়। ঘাম, রক্ত, পরিশ্রম, বুদ্ধি আর শৃঙ্খলাপরায়ণতা—এতগুলো জিনিস এবং সবার ওপরে ট্যালেন্ট, চ্যাম্পিয়ান হয়ে ওঠার জন্য দরকার হয়।
রিং থেকে নেমে আসতেই গোমস তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ”কেমন লাগছে? খুশি?”
শিবা মাথাটা দু’পাশে নাড়িয়ে বলেছিল, ”বেঙ্গল বক্সিংয়ের খুবই শোচনীয় দশা সার। বেড়াল আর নেংটি ইঁদুরের সঙ্গে খেলে কি খুশি হওয়া যায়!”
”টাইগার আর লায়ন এ—দেশে কোথায় পাবে, ইন্ডিয়ান বক্সিংয়েই নেই! তবে ন্যাশনালসে ডোবারমান কি আলসেশিয়ান তুমি পাবে।…রেডি থেকো।”
।। ১১।।
জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে হবে ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপস।
বাংলা দলে শিবা মিডলওয়েটে নির্বাচিত। আশ্চর্য ঘটক বলেছিল, ট্রেনিং করতে—করতে শরীর ঝরবে। বাহাত্তর কেজি—র শরীরটা একাত্তর কিলোগ্রামের নীচে নেমে এসে তাকে ওয়েল্টার করে দেবে। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক গোমস সেটা হতে দেয়নি। বরং গত এক মাসে বাহাত্তরকে নিয়ে গেলেন সাড়ে চুয়াত্তরে, অর্থাৎ মিডল বিভাগে।
পুষ্টিকর খাদ্য, ট্রেনিং আর বিশ্রাম ওজন বাড়াতে সাহায্য করেছে শিবাকে। দু—তিনজন অবশ্য আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, কম ওজন বিভাগে শিবাকে নামালে ফল ভাল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গোমস বলেছিল, ন্যাচারাল গ্রোথ যা হওয়ার হোক। তাকে জোর করে বন্ধ করলে শরীর উইক হয়ে পড়বে।
শিবা আবার লড়তে নামবে, এ—কথা পূর্বপল্লীর সবাই জেনে গেছে। কাজটা শারীরিক এবং পরিশ্রমের, সুতরাং তার শরীরের যত্ন নেওয়া দরকার, এই ধারণাটাই তাদের ব্যস্ত করে তুলল। যে যেমন পারে খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়ে দেয়; যার অধিকাংশই কোনও খেলোয়াড়ের খাওয়া উচিত নয়। শিবা সে—সবই ফিরিয়ে দিয়ে জানিয়েছিল, যদি চাম্পিয়ান হতে পারি তা হলে সবার ঘরে একদিন করে গিয়ে খেয়ে আসব।
বিশেষ উৎসাহ শক্তি দাসের, রোজই একবার খোঁজ নিয়ে যায় শিবার। সুযোগ পেলেই চেনা পরিচিতদের সে জানিয়ে দেয়, ”শিবা তো আর বক্সিং করবে না বলেই প্রতিজ্ঞা করেছিল। রোজ ওর পেছনে লেগে—লেগে তবেই না চাগিয়ে তুললাম ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হওয়ার সাধটা।”
শচীনকাকু আবার দিয়ে যাচ্ছে সেদ্ধ ডিম। বটকেষ্টর দোকানের যাবতীয় রান্না সে করে চলেছে গত কুড়ি বছর ধরে। শিবা যখন চার বছর আগে লালবাগানে যাতায়াত শুরু করে বক্সার হওয়ার জন্য, তখন শচীন তাকে রোজ দু’বেলা দুটো সেদ্ধ ডিম দিত, অবশ্যই বটকেষ্টর অগোচরে। ডিম দেওয়া সে বন্ধ করেছিল শিবা যখন গোরাবাবুর বাড়িতে গিয়ে ওঠে। সাধুদের হাতে প্রবল মার খেয়ে শিবা হাসপাতালে যখন অর্ধমৃত অবস্থায়, অন্যদের সঙ্গে তাকে দেখতে গিয়ে শচীন একটা সেদ্ধ ডিম সঙ্গে নিয়ে গেছল। সাগরমামি তাকে ধমকে বলেছিল, ”খাবে কী, চিবিয়ে কিছু খাবার ক্ষমতা কী ওর আছে?” শচীন এখন আবার শিবাকে সেদ্ধ ডিম দিতে শুরু করেছে, গায়ে জোর বাড়াবার জন্য।
লালবাগান জিম—এ শিবা চার থেকে ছ’ ঘণ্টা ট্রেনিং করে। গোমস—সার সারাক্ষণই তার সঙ্গে। একটা মিনিটও তারা নষ্ট করে না। একদিন মিতা আর তার দিদি এসেছিল। তারা হলঘরের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছিল, আশ্চর্য ঘটক তাদের আটকায়। ”এখানে মেয়েদের ঢোকা বারণ।…. আপনারা কাকে চান?” শিবার সঙ্গে দেখা করতে চায় শুনে আশ্চর্য ঘটক মাথা নেড়ে বলেছিল, ”দেখা হবে না। ওর ট্রেনারের কড়া হুকুম, ট্রেনিং চলার সময় কোনওরকম ডিস্ট্র্যাকশন যেন না হয়। আপনারা রাত আটটার পর আসবেন।” দুটি মেয়ে দেখা করতে এসেছিল—এই খবর, বলা বাহুল্য, শিবার কানে আর পৌঁছয়নি।
