হকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ও কি ভাবছে, শিবা তা জানে। সেও প্রথমবার ভেবে রেখেছিল—মেরে শুইয়ে ফেলব। টাইমকিপারের ঘণ্টা বাজল। রেফারি দু’হাত নেড়ে রিংয়ের মাঝে দু’জনকে আসতে বলল।
”বক্স।”
হক গ্লাভসজোড়া মুখের সামনে রেখে তেড়ে এল। শিবা প্রথম জ্যাবটা থেকে মুখ পাশে সরিয়ে নিয়ে এক পা পিছিয়ে এসেই জ্যাব করল হকের কপালে।
শিবা ঘুরছে হককে ঘিরে। সারের কথাটা মনে রেখে, ”ডান্স, ডান্স, ডান্স…ঘুরে—ঘুরে নাচো। ও এগিয়ে আসবে তোমাকে রোপ—এ নিয়ে কর্নার করতে। তুমি জ্যাব করেই সরে সাও। লোকে বলবে প্যালাচ্ছে, তাতে কান দিয়ো না।…তুমি পয়েন্ট তুলে নাও…ওকে টায়ার্ড করে দাও ঘুষি মারতে দিয়ে। এক একটা পাঞ্চ—এ দম বেরিয়ে যাবে।…ভেতরে এসে কম্বিনেশন চালিয়েই আবার সরে যাও।”
শিবা তাই করল প্রথম রাউন্ডে। নিজের কর্নারে টুলে বসে হক হাঁফাচ্ছে, বুক ওঠানামা করছে হাপরের মতো। গ্যালারিতে সাধু আর দেবু একই সঙ্গে লেফট—রাইট ক্রস চালিয়ে জানাচ্ছে—নক আউট কর। গোমস—সার তার দিকে তাকাচ্ছে না, কথা বলছে আশ্চয্যদার সঙ্গে। ননীকে সে আসতে বারণ করেছে, তাই আসেনি। আত্মীয়—বন্ধু কারও মুখই সে এখানে দেখতে চায়নি। অন্তত প্রথম দিনে নয়।
টুল নিয়ে অনিমেষ দড়ির ফাঁক দিয়ে গলে রিংয়ে ঢুকেছে। শিবা টুলে বসতেই সে হাঁটু ভেঙে চেয়ারের মতো হয়ে ওর দুটো পা নিজের ঊরুর ওপর তুলে নিল। চার বছর আগে শিবা লজ্জায় পা নামিয়ে নিয়েছিল। অনিমেষ ধমকে উঠে বলেছিল, ”রাখ।” কিন্তু এখন সে পা দুটো রেখেই দিল। মুখে জল ছিটিয়ে তোয়ালে দিয়ে শিবার হাত—মুখ মুছিয়ে দিতে—দিতে অনিমেষ বলল, ”ভাল লড়ছিস। এবার একটু কাছে যা, ইন ফাইটিংয়ে আর…জ্যাব করার সময় ওর ব্যালান্স থাকছে না।”
”দেখেছি। নক আউট করে দিতে পারতুম।”
”করলি না কেন?”
শিবা হাসল শুধু। দরকার কী, এটা তো একটা মাইনর টুর্নামেন্ট! সাড়া জাগিয়ে ফিরে আসার থেকে নিঃশব্দে এগনোই ভাল।
ঘণ্টা বাজল। এক মিনিটের ইন্টারভ্যাল শেষ।
”নক আউট শিবা, নক আউট, নক আউট।” গ্যালারি থেকে দেবু বিকট স্বরে চিৎকার করে তাকে তাতিয়ে তুলতে চাইছে। শিবা ফিরেও তাকাল না। ‘নক আউট শিবা’ ইমেজটা সাধুর দরকার তাকে নিয়ে ব্যবসার বা বোটিং করার জন্য। চেঁচাক ওরা, চেঁচাক।
দ্বিতীয় রাউন্ডে হক একটামাত্র জবর পাঞ্চ শিবার পাঁজরে বসাতে পারল। বিনিময়ে তাকে বহু পয়েন্ট দিতে হল। তাকে পাক দিয়ে শিবার ঘুরে—ঘুরে দূরে যাওয়া ও কাছে আসা, আচমকা লেফট—রাইট কম্বিনেশন হককে শুধু দিশেহারাই নয়, ভয়ও পাইয়ে দিল। সে এই ধরনের স্ট্র্যাটেজির সামনে কখনও পড়েনি। এমন বিদ্যুৎ—গতির নড়াচড়াও সে কখনও দেখেনি।
তৃতীয় রাউন্ডে পুনরাবৃত্তি হল প্রথম দুটির। তবে তার একটা রাইট ক্রস হককে ক্যানভাসে ফেলে দেয়। রেফারি আট পর্যন্ত গুনতেই সে উঠে দাঁড়ায়। শিবা তখন হাঁফ ছেড়ে স্বস্তি বোধ করেছিল। বাকি সময়টুকু হক পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। ঘটনা বলতে শুধু এইটুকুই । দ্বিতীয় রাউন্ডেই শিবা বুঝে গিয়েছিল সে লড়াইটা জিতেই গেছে। হক এমন কেউ নয় যে, তার কাছে জিতে নাচানাচি করতে হবে।
রেফারি তার হাতটা তুলে বিজয়ী ঘোষণা করার এবং হককে জড়িয়ে ধরে তাকে সাবাশ জানাবার পর শিবা রিং থেকে নেমে এসে উদ্ভাসিত মুখে ফ্র্যাঙ্ক গোমসের সামনে দাঁড়ায়।
”সার, কিছু কি বলবেন?”
”নিশ্চয় বলব। কাল সাড়ে ছ’টায় তোমার নেক্সট বাউট সাম টি. মিত্রার সঙ্গে। এখন সোজা ঘর যাও, অ্যান্ড রিল্যাকস। কাল মর্নিং—এ রোড রানিং নয়, ওনালি ফ্রি হ্যান্ডস অ্যান্ড রেস্ট।…গুড নাইট।”
লালবাগান জিম থেকে বেরিয়ে বাসস্টপের দিকে যাওয়ার সময় শিবা দেখল স্কুটারে বসে রয়েছে দেবু এবং সাধু। হাতছানি দিয়ে সাধু ডাকল।
”তুই তো আমাকে ডোবাবি। এটা কি একটা লড়াই হল। তোর কাছ থেকে এমন মিনমিনে ব্যাপার আমি আশা করিনি।”
”কী আশা করেছিলেন?” শিবা ‘ছিলে’ বলতে গিয়ে ‘ছিলেন’ বলল। সাধু বয়সে বড় এবং নিজের এলাকায় মান্যগণ্যও বটে।
”নক আউট, নক আউট! আবার কি?” সাধু চেঁচিয়ে উঠল।
”জেতাটাই আমার লক্ষ্য, যেভাবেই হোক।” শান্ত গলা শিবার।
”শিবা ঠিকই বলেছে।” পিলিয়নে বসা দেবু বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। ”স্টেপ বাই স্টেপ ফর্মে ফিরতে হয়। এক লাফে মগডালে ওঠা যায় না।”
”তা হলে ন্যাশনালসের ফাইনালে তুই ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট করবি?…বল করবি?” সাধু ব্যাকুলতা আর অনুরোধের মাঝামাঝি একটা স্বরে বলল। হঠাৎ ঝুঁকে ফিসফিস করল। ”বাজি ধরব…জিতলে তোর টেন পারসেন্ট, অনেক টাকা!”
কয়েক সেকেন্ড সাধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শিবা হাঁটতে শুরু করল। বাসস্টপ ছাড়িয়েও সে হেঁটে চলল। পাশ দিয়ে স্কুটারটা চলে যাওয়ার সময় দেবু বলে গেল, ”মনে রাখিস, টেন পারসেন্ট।”
দেবদাস পাঠক রোডের মোডের স্ট্যান্ডে তিনটি রিকশা দাঁড়িয়ে। তৃতীয়ে ননী। শিবাকে দেখে সে বলল, ”আয়, বয়, পৌঁছায়ে দিমু।”
শিবা রিকশায় উঠল। ননী প্যাডেল শুরু করে বলল, ”টায়ার্ড?”
”হ্যাঁ।”
ননী পকেট থেকে একটা পেয়ারা বার করে হাতটা পেছনে বাড়িয়ে বলল, ”ধর।”
পেয়ারাটা নিয়ে শিবা বলল, ”কোথায় পেলি?”
”এক প্যাসেঞ্জার রিসকা থাইক্যা লামবার সময় থলিডা একবার ধইরতে দিচিল। পিয়ারায় খুব ভিটামিন….কাল তর লড়াই আছে না?”
