কোনি কথাগুলোকে অগ্রাহ্য করে রেগে উঠল। ”কোথায় লুকিয়ে ছিলে তুমি? খালি বল তো আর বল তো!”
”কোথায় ছিলুম জানিস, ওইখানে। কুঁজো হয়ে ক্ষিতীশ ডানহাতের তর্জনীটা তুলে পুলের জলের দিকে দেখাল। ”ওই জলের নীচে লুকিয়ে ছিলুম আর বলছিলুম—সব পারে, মানুষ সব পারে…ফাইট কোনি, ফাইট।”
”মিথ্যুক, মিথ্যুক।” কোনি ছুটে এসে ক্ষিতীশের বুকে দুমদুম ঘুসি মারতে শুরু করল। ‘কিচ্ছু দেখিনি, কিচ্ছু শুনিনি। যন্ত্রণায় তখন আমি মরে যাচ্ছিলুম।”
”ওইটেই তো আমি রে, যন্ত্রণাটাই তো আমি।”
বলতে বলতে ক্ষিতীশ হা হা শব্দে দরাজ গলায় হেসে উঠল। তখন অনেকেই তাদের দিকে তাকাল এবং দেখল পাগলটে একটা লোকের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে ফোঁপাচ্ছে—যে মেয়েটি আশ্চর্য সাঁতার দিল, আর তার মাথায় টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে।
কুড়োন
কুড়োন – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
এই নিয়ে পরপর চারদিন অনিরুদ্ধ শব্দটা শুনল। সে ভারত দলে, বাংলা রাজ্য দলে খেলেছে, ইস্টবেঙ্গল—মোহনবাগান ক্লাবে আট বছর আগেও ফুটবল খেলেছে। শব্দটা তার কাছে খুবই পরিচিত। কিন্তু রাত বারোটায় কেন? দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে অবাক হয়ে ভাবল, এত রাতে যে ফুটবলে লাথি মারছে সে পাগল ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।
শিমুলহাটিতে পাগল! ফুটবলে শট নেওয়ার মতো পাগল বালিগঞ্জ থেকে ট্রেনে দশ কিলোমিটার দূরে এই আধা—শহুরে শিমুলহাটিতে কে থাকতে পারে? অনিরুদ্ধ মনে মনে চৌধুরিপাড়া, কালীতলা, মণ্ডলদিঘি এলাকার চেনা বাড়িগুলোয় খোঁজাখুঁজি করে কাউকে পেল না। জনাদশেক অল্পবয়সী ছেলে, কালীতলা স্পোর্টিয়ে ফুটবলের ট্রেনিং নেয় বটে, কিন্তু ফুটফুটে জোছনায় মাঝরাতে স্বামী স্বরূপানন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঁচিলঘেরা মাঠে ফুটবল খেলবে, এতটা পাগল তারা নয়।
আগামীকাল পূর্ণিমা, চাঁদের আলোয় মাঠ ভেসে যাচেছ, তা ছাড়া চৌধুরিবাড়ির সদর দেয়ালের ইলেকট্রিক আলো সারারাত জ্বলে। তাতে মাঠের পুবদিকের কিছুটা আলোকিত থাকে। এই আলো আর জ্যোৎস্না মিলিয়ে মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অনিরুদ্ধ কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। পাঁচিল ঘেঁষে বটগাছটার মগডাল তিনতলা ছাড়িয়ে উঠে রয়েছে দৃষ্টি আড়াল করে। সে বারান্দার এধার থেকে ওধার গেল। মাঠের একটা ফালি দেখতে পেল বটে কিন্তু কোনও জনমানব নেই।
দশ—বারো সেকেন্ড অন্তর শব্দটা হয়েই চলেছে। স্কুলমাঠের দু’দিকে বাড়ি, চৌধুরিদের আর ঘোষেদের। ওরা কি কেউ শুনতে পাচ্ছে না? তা ছাড়া স্কুলের বুড়ো বেয়ারা রাখালদা তো ওই স্কুলবাড়ির পেছনে একটা ছোট্ট ঘরে থাকে, সেও কি কালা হয়ে গেছে? অনিরুদ্ধ শব্দের ধরনটা কান পেতে শুনল। কেউ একজন ফুটবলে শট নিচ্ছে দেয়াল লক্ষ্য করে। ধপাস ধপাস শব্দটা দেয়ালে বল লাগারই, মনে হচ্ছে যেন টার্গেট প্র্যাকটিস করছে। এত রাতে প্র্যাকটিস! একবার স্কুলমাঠে গিয়ে দেখে এলে কেমন হয়।
অনিরুদ্ধ একতলায় নেমে সদর দরজার খিল খুলতেই দোতলা থেকে তার বিধবা দিদি অমলার গলা শোনা গেল।
”কে রে অনি নাকি? এত রাতে কোথায় বেরোচ্ছিস?”
”অনেকক্ষণ ধরে নাগাড়ে শব্দ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ফুটবলে কেউ শট নিচ্ছে। একবার দেখে আসি পাগলটা কে?”
দরজা খুলে অনিরুদ্ধ রাস্তায় বেরোল। বাড়ি থেকে স্কুলের মাঠটা পঞ্চাশ মিটার দূরে। কিন্তু পাঁচিল ঘুরে স্কুলের ফটক দিয়ে মাঠে ঢোকার জন্য হাঁটতে হয় প্রায় তিনশো মিটার।
অনিরুদ্ধ পঁচিশ বছর আগে এই স্কুলমাঠেই প্রথম ফুটবল খেলেছে, তখন সে পড়ত এই স্বামী স্বরূপানন্দ স্কুলে। ইন্টার—ক্লাস খেলা ছিল। ক্লাস সিক্সের সঙ্গে এইটের খেলা। তখন সে সিক্সে পড়ে। ক্লাসের টিমে তার নাম ছিল না। বাড়ির পাশেই মাঠ আর তার নিজের ক্লাসের খেলা, তাই সে মাঠে হাজির হয়েছিল কৌতূহল নিয়ে।
মাঠের ধারে তাদের ক্লাসের ছেলেদের জটলা দেখে সে এগিয়ে যায়। ছেলেরা উৎকণ্ঠা নিয়ে বারবার তাকাচ্ছে ফটকের দিকে, যেন কারও আসার কথা কিন্তু সে এখনও এসে পৌঁছয়নি।
”নির্মল কি জানে আজ ওর খেলা আছে?”
”নিশ্চয় জানে, আমি নিজে ওকে টিফিনের সময় মনে করিয়ে দিয়েছি।”
”তা হলে! ও তো কথার খেলাপ করার মতো ছেলে নয়, খুব সিরিয়াস। সনৎ, আর ক’মিনিট আছে রে?”
”পাঁচটা বাজতে সাত। ঠিক পাঁচটায় মাঠে না নামলে সার ওয়াকওভার দিয়ে দেবেন। ক্লাস টেনকে, মনে আছে কী করেছিলেন সেদিন? জাস্ট তিন মিনিট টাইম দিয়েছিলেন। ওরা কেতা দেখিয়ে ইচ্ছে করে দেরিতে নামতে গেছল। একেবারে স্ক্র্যাচ।”
নির্মলের বাড়িতে কেউ একজন এখুনি দৌড়ে যা। টিমের গোলকিপার, ও না এলে তো ক্লাস সিক্স ডুবে যাবে। টিমের সবথেকে ইম্পর্ট্যান্ট পজিশান।”
একজন ছুট লাগাল নির্মলের বাড়ির দিকে। ক্লাস এইট মাঠে নেমে গোলে শট নিচ্ছে। গোলকিপার চঞ্চল ফুলহাতা কালো গেঞ্জি পরে দুদিকে দারুণ স্টাইলে ঝাঁপিয়ে খপাখপ বল ধরছে। গেমস টিচার প্রতাপবাবু হাফপ্যান্ট পরে মাঠের সেন্টার সার্কেলে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে অপেক্ষা করছেন।
নির্মলের বাড়ি খুব কাছেই, ছুটে গেলে আধমিনিট। ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল।
”ওর বাবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেছেন, তবে চাপা যাননি। নির্মল হাসপাতালে গেছে।”
