”এ কী! এর মদ্যেই টেরনিং হইয়্যা গ্যাল? এতেই তুই ফাইটার হবি? ওঠ ওঠ…” কথাটা বলেই ননী ডান পা দিয়ে শিবার পিঠে লাথি মেরেছিল। ”লজ্জা করে না তর? হাজার লোকের চোক্ষের সাইমনে মাইর খাইয়া আলি, লজ্জা করে না?” আবার সে লাথি কষাল।
প্রথমটিতে শিবা চমকে উঠে শুধু তাকিয়ে থেকেছিল অবাক হয়ে। অন্ধকারে ননীর মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। ননী যে এমন দুঃসাহসিক কাণ্ড করতে পারে, এটা সে বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না। দ্বিতীয় লাথিতে সে রাগে লাফিয়ে উঠে ননীর চুল ধরে ঝাঁকাতে থাকে।
”তোর সাহস তো বড় কম নয়? পা—টা যদি এবার ভেঙে দি!”
”গায়ে জোর আছে, তা ভাঙতে পারস, কিন্তু আইজকার লজ্জাটা কি তাতে ভাঙব?”
তখন শিবার মনে হয়েছিল, সে যেন সাধু, আর ননী যেন ভবানী—সার। সাধুর মতোই তার মুখ দিয়ে কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে—পা—টা যদি এবার ভেঙে দি!
”কাল অনেকেই জিগাইব, শিবা জিতছে তো?”
”মানুষমাত্রেই হারে। আমিও হেরেছি।”
এখন এই মধ্যরাত্রে চিত হয়ে জেগে থাকা শিবা দুঃস্বপ্ন থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনতে গোমস—সারের সেদিনের কথাগুলোর প্রতিটি শব্দ স্মরণ করতে লাগল— ”জীবনের প্রথম ফাইট তুমি হেরেছ। ঠিক আছে। হার কাকে বলে না জানলে জিত কাকে বলে জানা যায় না। এটাই শিক্ষা, এটাই এডুকেশন। শিক্ষা নিতে পারলে বড় হবে।”
”শিবা এই কথাটা জেনে রাখ, চ্যাম্পিয়ান জিম—এ তৈরি হয় না, তৈরি হয় তাদের ভেতরের, একেবারে ভেতরের জিনিস থেকে। সেটা হল ইচ্ছা, একটা খোয়াব। মনের মধ্যে এটা না থাকলে কেউ বড় হয়ে উঠতে পারবে না।…আর চাই মনের জোর, ‘উইল’। স্কিলের থেকেও স্ট্রং হতে হবে ইচ্ছা, যাকে বলে উইল। তুমি দেখবে, অনেকে হারে তার থেকেও কমতি—স্কিলের অপোনেন্টের কাছে। কেন? মনের জোরের, উইলের কমতি থাকে বলে?”
”তুমি প্রথমেই একটা ঘুসি খেয়ে মাথা গরম করে ফেলেছিলে। তাতে তোমার বুদ্ধি গুলিয়ে গেছল। মাথার মধ্যে গোলমাল হতেই তোমার বুদ্ধি খারাপ পথে চলে গেল। তখন তুমি শর্টকাটে, নক আউট করে লড়াই জেতার কথা ভেবেছিলে। কিন্তু তুমি অপোনেন্টকে মেপে নাওনি, জানতে চেষ্টা করোনি তার ক্ষমতা কত, তার গলদ কোথায়। ফাইটারস আর ডিসকভারারস, তারা খুঁজে বার করে। তারা নিজেদেরও তখন ডিসকভার করে, নিজেদের ভালমন্দও তখন জানতে পারে।…একটা কথা মনে রেখো, রিং—এর মধ্যে কীভাবে ফাইট করবে এটা বাইরে থেকে তোমার ট্রেনার বলে দিতে পারে না। তোমাকে নিজে সেটা ঠিক করে নিতে হবে। এজন্য তোমার বুদ্ধি, মন তৈরি করতে হবে।…সবার আগে চাই জেতার ইচ্ছা, ডিজায়ার।”
এক মাস পর স্টেট চ্যাম্পিয়ানশিপে প্রথম রাউন্ডেই শিবা নক আউট করেছিল সুনীল বেরাকে। রিং থেকে নেমে এসে বলেছিল, ”সার, আমার ভেতরে ইচ্ছেটা হয়েছে কি?”
.
”হ্যাঁ সার, আবার আমার জেতার ইচ্ছে হয়েছে বলেই আমি ফিরে আসতে চাইছি।” —শিবা নিজেকে কথাটা বলে অনেক হালকা হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সে ফিরে—আসার প্রথম লড়াইটা পয়েন্টে জিতল। সাধারণ, মামুলি লড়াই। সারের চার বছর আগের কথাগুলো মাথায় রেখে সে লড়েছিল। বোম্বাইয়ে ন্যাশানালসের সাড়ে তিন বছর পর এই প্রথম রিংয়ে ওঠা। ভয় করেনি, কিন্তু অনিশ্চিত একটা বোধ তাকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। লড়তে হবে গোল্ডেন গ্লাভসের শওকত হক নামে একজনের সঙ্গে। অনেক বক্সারই প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আগাম খোঁজখবর নিয়ে থাকে, গোমস—সার বলে দিয়েছিলেন, ”এসবের দরকার নেই। এটা একটা মাইনর টুর্নামেন্ট, ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ানশিপ নয়।”
”ড্রেসিংরুমেই সে হককে প্রথম দেখে। প্রথম তাকিয়েই শিবার মনে হয়েছিল, হক ভয় পেয়েছে। হয়তো শুনেছে শিবাজি আইচ নক আউটের মাস্টার, পাঞ্চের জোর দারুণ। হক দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে। শিবা স্বস্তি বোধ করল। সুনীল বেরার সঙ্গে লড়ার আগে সে—ও এইভাবে বসে ছিল। হক নিশ্চয় তাকে নক আউটের চেষ্টা করবে।
রিংয়ে ওঠার আগে গোমস—সার তার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। কোনও উপদেশও দেয়নি। ক্লাবেরই প্রাক্তন বক্সার অনিমেষ তার সেকেন্ডস। সাহায্য করেছে কোমরে লাল রিবন আর গ্লাভস পরিয়ে লেস বেঁধে দিয়ে, মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে মাউথপিস। শিবার কর্নারে তোয়ালে, জলের বোতল আর বসার টুল নিয়ে অনিমেষ, তার পাশে গোমস। রিংয়ে উঠে মাসল আলগা করার জন্য হালকাভাবে লাফাতে—লাফাতে শিবা বাঁশের গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় সাধুকে, তার পাশে দেবু।
চোখাচোখি হতেই সাধু শূন্যে ডান হাতে—বাঁ হাতে দুটো ক্রস চালিয়ে, মাথাটা কাত করে চোখ বুজিয়ে জিভ বার করল। শিবা বুঝল, সাধু কী বলতে চায়—নক আউট কর। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
রিংয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে রেফারি হাত নেড়ে দু’জনকে ডাকতেই হক এগিয়ে এসেছিল দম—দেওয়া পুতুলের মতো যান্ত্রিকভাবে। কোমরে সবুজ রিবন। শিবা ওর চোখ দেখে আন্দাজ করল, কীভাবে লড়বে হক সেটা ঠিক করেই রেখেছে, নড়চড় হবে না তার কৌশলের।
”তোমরা দু’জনেই নিশ্চয় রুলস জানো।” রেফারি তাদের প্রথামাফিক বক্তৃতাটা দিয়েছিল। ”যখন বলব ব্রেক, দু’জনেই তখন এক পা পিছিয়ে যাবে, তার মধ্যে ঘুসি চালাবে না। পিছিয়ে গিয়ে তারপর আবার বক্স করবে।… নো হিটিং বিলো দ্য বেল্ট। কিডনি পাঞ্চ…কোমরের পেছন দিকে কিংবা র্যাবিট পাঞ্চ…ঘাড়ের পেছনে, একদম করবে না। যখন স্টপ বলব থেমে যাবে, যখন বক্স বলব লড়াই শুরু করবে। পরিচ্ছন্নভাবে লড়বে…গুড, ক্লিন স্পোর্টসম্যান ফাইট।”
