”কিছুদিন আগে শিবা পায়ে বড়রকমের চোট পেয়েছে, এখন আর ওকে বক্সিং করতে দেওয়ায় আমার মত নেই। তা ছাড়া এই বক্সিং থেকেই তো ওর জীবনে বিপদ এসেছিল। গুণ্ডারা ওকে যা মার মেরেছিল। তা তো আমি ভুলতে পারব না।” থমথমে মুখে নিতু কথাগুলো বলে খদ্দেরে মনোযোগ দিল।
গোমস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, নিতুর হাত খালি হতে বলল, ”শিবার চোট এখন কমপ্লিটলি কিওরড। ডাক্তার ও.কে. করে দিয়েছে। আর গুণ্ডারা যে—জন্য মেরেছিল সেসব কারণ এখন আর নেই।…বক্সিং এমনই একটা খেলা, বেইটাররা এতে হেভি বেট করে। গোরাচাঁদের বক্সার ছিল শিবা। তখন আমার ট্রেনিংয়ে ছিল না। ও ইমম্যাচুওর ছিল তাই জানত না কত রকমের বদমাইশি করে হারিয়ে দেওয়া হয়। বহু টাকা হেরে রাগে গুণ্ডা দিয়ে গোরাচাঁদ ওকে পিটিয়েছিল। শিবার পেট্রন এখন শিবা নিজেই।” গোমস দুই মুঠিতে তুলে নিল নিতুর দুই হাত। ”আমার রিকোয়েস্ট নিতুদা…তুমি রাখো, জাস্ট ওয়ান্স, একবার। এবার আমিই ওকে গাইড করব। এটা শুধু তোমার ভাইয়েরই নয়, আমারও কামব্যাক হবে।”
আপনি থেকে তুমি, তার ওপর নিতুদা! কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল নিতুর মাথাটা। সে আমতা—আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই গোমস বললেন, ”ও যদি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ান হয়, মোস্ট প্রোবাবলি হবে, তা হলে সেটা একটা রিভেঞ্জ নেওয়া হবে। তা ছাড়া ওর সামনে অনেক ওপেনিং আসবে…চাকরি মিলবে, ইন্ডিয়া টিমে আসবে, নানান দেশ ঘুরবে…এশিয়ান গেমস, ওলিম্পিকস,…ফ্যামিলির মান বাড়বে।”
নিতুর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। পৃথিবীতে না হোক, এশিয়ার মধ্যেও যদি শিবা সেরা হতে পারে, তা হলে দেশের কোটি—কোটি মানুষ ওর নাম জানবে। কলকাতার উত্তরে লাখ—লাখ মানুষ গর্ব করে বলবে, ”চেনো না! এখানকারই ছেলে শিবাজি আইচ, পূর্বপল্লী কলোনিতে থাকে। জানো না, ওর বাবা দয়াল আইচ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। স্বাধীনতার পরও তিনি সংগ্রাম থামাননি। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন।…তাঁর ছেলে লড়াইয়ে নামবে না তো কে নামবে?…শিবার দাদা নিতু, চা, রুটি, আলুর দম বেচে, সেও তো লড়াই করে…দারুণ একটা ফ্যামিলি…।”
”শিবার বড় হওয়ার লড়াই আমার জন্য আটকাবে, তা কখনও হতে পারে!…বংশের মুখোজ্জ্বল করবে, সবাই বড় মুখ করে বলবে, ‘শিবা আমাদের ছেলে, নিতুর ভাই’… আমি দাদা হয়ে বাধা দেব! শুধু একটাই অনুরোধ, আপনি ওকে একটু দেখবেন।” নিতু হাত বাড়িয়ে ফ্র্যাঙ্ক গোমসের দুটো হাত ধরল।
সেদিন রাতে দুই ভাই পাশাপাশি শুয়ে। কারও ঘুম আসছে না। এক সময় নিতু বলল, ”সাহেবকে দিয়ে বলাবার কী দরকার ছিল, তুই নিজেই তো আমায় বলতে পারতিস। আমি আপত্তি করব, এই ধারণাটা তোর হল কী করে?”
”আমার অনেক অপরাধ জমা আছে।” বালিশে মুখ চেপে শিবা বলল।
”কী অপরাধ?”
”তোমাদের ফেলে আমি চলে গেছলুম সোনার বকলেস পরতে।”
নিতুর হাত শিবার গলায় ঠেকল। শান্ত গলায় নিতু বলল, ”বকলেসটা নেই, কোনও দাগও নেই।…তোকে ট্রেনিং ছাড়া আর কিছু ভাবতে হবে না। দরকার হলে আমি লোক রেখে দোকান চালাব।”
শিবার মনে হচ্ছে একটা ভারী পাথর তার বুক থেকে নেমে যাচ্ছে। হালকা হওয়ার আনন্দে তার চোখ থেকে জল গড়াল।
.
হলধর বর্ধন বক্সিং টুর্নামেন্ট শুরুর আগের রাতে শিবা ঘুমোতে পারল না। বিকট একটা স্বপ্নের মতো, চার বছর পেরিয়ে অতীত থেকে একটা চিৎকার আসছে। সেটা আবার ভারী পাথরটা তার বুকে তুলে দিচ্ছে। সেই রাতের প্রতিটি কথা, ঘটনা তার স্পষ্ট মনে আছে। এতদিন ভুলে থেকেছে কিন্তু এখন সেগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই।
ঠিক চার বছর আগে এই হলধর টুর্নামেন্টেই, হেভি ব্যাগ ফাটানোর ভীতিকর খ্যাতি নিয়ে রিং—এ নেমে সে জীবনের প্রথম লড়াই হেরে গেছল, ই সি পি সি—র সুনীল বেরার কাছে, পয়েন্টে।
ইস্ট ক্যালকাটা ফিজিক্যাল কালচারের ছেলেরা লড়াইয়ের ফল ঘোষণার পর শিবার উদ্দেশে চিৎকার করছিল, ‘বলো হরি হরি বোল…বলো হরি হরিবোল।’ আর শিবা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে মিশে যেতে—যেতে ভেবেছিল এখন এখান থেকে পালাতে হবে।
প্রায় পালিয়েই শিবা ফিরে এসেছিল দুর্লভ চক্রবর্তীর গ্যারাজে। তখন সে গ্যারাজেই বাস করত। একটা মোটরের চালে চিত হয়ে শুয়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বক্সিং আর চলবে না।
ননী তখনই গ্যারাজে ঢুকেছিল। শিবা তাকে বলেছিল বক্সিং ছেড়ে দেবে।
”সেই ভাল। ফাইট করা তর দ্বারা অইব না। ফাইটার অইন্য ধাতুতে গড়া হয়।”
”কী ধাতু?”
”কী ধাতু তা অবইশ্য জানি না, তয় ঘটিবাটি থালা গেলাসের ধাতু নয়। এডা হইত্যাছে মনের ধাতু। কোচিংঘরে স্বামিজির ছবিটা দ্যাখছস? চোক্ষু দিয়া যেন আগুন বাইরয়।”
শোনামাত্র শিবার কানে বেজেছিল, ”নুইব না, আমি নুইব না।”
এর পর মোটরের চাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে সে অন্ধকার গ্যারাজের কোণ থেকে বালিভর্তি চটের বস্তাটা, যেটাকে হেভিব্যাগ বানিয়ে সে প্র্যাকটিস করে, টেনে আনে। বস্তার মুখ বাঁধা দড়িটা, মোটরের এঞ্জিন তোলার কপিকলে লাগিয়ে টান দিয়ে সেটা জমি থেকে তুলল। কপিকলের লোহার চেনটা বাঁশের সঙ্গে জড়িয়ে দিল।
”আয় ননী, হেলপ কর। বস্তাটা দুলিয়ে ছুড়ে দে আমার দিকে।”
ননী বস্তাটাকে দু’ হাতে দোলাতে লাগল। সেটা শিবার বুকে, পেটে আঘাত করে ফিরে এলেই ননী আবার ধাক্কা দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। মিনিট কয়েক পর শিবা বসে পড়েছিল বুকে হাত দিয়ে। হাঁ করে শ্বাস টানছিল। বস্তার ধাক্কায় কলজে নিংড়ে বাতাস বেরিয়ে গেছে।
