কিছুটা এগোতেই তার চোখে পড়ল উৎপল চট্টরাজকে, দুটো বাসের মাঝে এক হাত ফাঁক দিয়ে গলে রাস্তার ওপারে যাওয়ার জন্য দোনামনা করছে।
”উৎপলবাবু, উৎপলবাবু।” শিবা হাত তুলে চিৎকার করল। উৎপল মুখ ফিরিয়ে তাকাল।
শিবা ছুটে এসে বলল, ”এভাবে কখনও পার হবেন না।”
”বড্ড তাড়া রয়েছে…তোমার খবর কী? তারপর তো আর দেখা হল না।” উৎপলকে কিছুটা অপ্রতিভ দেখাল।
”খবর তো আপনিই দেবেন। জোনাকির গোলমাল কি মিটেছে? দিদি, টুটু এরা কোথায়?”
”ধর্মঘটের ব্যাপারটা তার পরের দিনই, আমাকে আর জব্দ করতে চান পেরে ওরা তুলে নেয়। ভাল কথা, সেদিন ওদের চারজনকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়, দু’জন অ্যাডমিটেড হয়েছিল। ওরা রটায় আমি নাকি সাত—আটজন গুণ্ডা এনে ওদের পিটিয়েছি।” উৎপল হো—হো করে হেসে উঠল। শিবা হাসল না।
”তা হলে আর গোলমাল নেই?”
”গোলমালের থেকেও বেশি, এখন সমস্যার পাহাড় জমে গেছে। রাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে অত কথা তো বলা যায় না, সংক্ষেপে বললে, আসল যে ইউনিয়ন, তারা এখন ঠিক করেছে সমবায় ভিত্তিতে কারখানা তারাই চালাবে, এই নিয়ে এখন কথাবার্তা চলছে। মালিক গোরাচাঁদ সেন লেবারদের প্রডিভেন্ট ফান্ডের টাকা, ই এস—আই এর টাকা গায়েব করেছে, নানান দেনা চারধারে, টেলিফোনের টাকা দেয়নি, বিদ্যুতের সত্তর হাজার টাকা বাকি, ট্যাক্স বাকি; ম্যানেজমেন্টের মোট প্রায় ষাট লক্ষ টাকা দেনা। বলছে এসব শোধ দিয়ে তবেই সমবায় হবে। এদিকে লকআউট করার অজুহাত বানাতে নিজেদের লোক দিয়ে সাজানো ধর্মঘট বাধাতে চেয়েছিল আমাকে তাড়াবার ইস্যু তুলে। সেটা ভেস্তে গেছে, ঠিকমতো বললে, তোমারই জন্য।”
শিবার মুখে রক্ত ছুটে এল। প্রশংসা অবশ্যই তার ভাল লাগে, অস্বস্তিও হয়।
”আপনিই তা হলে ওদের পথের কাঁটা?”
”অন্যতম, একমাত্র কাঁটা নই। ব্যাপারটা কী জানো, এতগুলো পরিবারকে পথে বসিয়ে রাজনীতি করা লোকেদের আর প্রোমোটারের সাপোর্টে কারখানা তুলে দিয়ে বাড়ি তৈরি করে বিক্রি করাটা—”
”আমি এসব রাজনীতি—টিতি একদম বুঝি না, বোঝার দরকারও নেই। নিরীহ, সৎ মানুষ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করা উচিত, শুধু এইটুকুই বুঝি। এখন যাচ্ছেন কোথায়?”
”কোয়ার্টারে। এখন আমি একাই ওখানে থাকি। আবার কবে কী ঝামেলা বাধে তার ঠিক নেই, তাই ওদের আর নিয়ে যাইনি।”
”আমার একটা উপকার করবেন?” শিবার মুখে এবং স্বরে মিনতি ফুটে উঠল।
”অবশ্যই করব, যদি সাধ্যের মধ্যে হয়। তুমি যা করেছ আমাদের জন্য তো—।” শিবা তাকে থামিয়ে দিল।
”ওসব কথা থাক। আপনার কোয়ার্টারে একজনকে থাকতে দেবেন? আমার ট্রেনার, বয়স্ক লোক, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, তিন কুলে কেউ নেই, একা মানুষ। ওঁকে যদি থাকতে দেন, তা হলে আমার খুব উপকার হয়। আমি আবার ন্যাশনালে নামব, গোমস—সারের কাছেই ট্রেনিং করছি। ওঁর খাওয়াদাওয়ার জন্য আপনাকে কিছু করতে হবে না, শুধু থাকতে দেওয়া।” শিবা প্রায় এক নিশ্বাসে বলে গেল কম্বিনেশন পাঞ্চ করার মতো দ্রুতগতিতে।
”আরে, এ আর এমন কী, সঙ্গে একজন থাকলে, তার ওপর আবার বক্সিং ট্রেনার, তো আমার বরং সুবিধাই হয়। আর খাওয়াদাওয়া তো আমার সঙ্গেই—।”
তিন—চার মিনিট পর শিবাকে দেখা গেল যে প্রায় ছুটে চলেছে লালবাগান জিম—এর দিকে।
.
তিনদিন পর ফ্র্যাঙ্ক গোমস ননীর রিকশা থেকে নিতুর দোকানের সামনে নামল।
”সাহেব আপনার লগে দেখা কইরতে চায়, তাই লইয়া আইলাম।”
সাহেব শুনেই নিতু অস্বস্তিতে পড়ল। তবে রংটা ঘোর কালো, এটাই যা ভরসা। বাংলাটাংলা বলতে যদি নাও পারে নিশ্চয় বুঝতে ঠিকই পারবে। সে ফিসফিস করে ননীকে বলল, ”কে? আমার কাছে কেন?”
”গোমস—সার! শিবারে উনি তো বক্সিংয়ের অন্দিহন্দি সব চিনাইছেন, শিখাইছেন। এনারে টেরনার করো, বক্সিংয়ের মাস্টারমশয়! টেরনার ছাড়া কেউ চ্যাম্পিয়ান হইতে পারে না।”
”তা আমার কাছে কেন?”
”গুড আফটারনুন।” গোমস এগিয়ে এসে হাত বাড়াল। ওদের কথোপকথন সে শুনেছে। নিতু বিমূঢ়ভাবে গোমসের বাড়ানো হাতটা ধরতেই ঝাঁকুনি খেল। ”ফ্র্যাঙ্ক গোমস।..আপনিই শিবাজির দাদা নেতাজি?”
”হ, নিতুদা।” ননী আগ বাড়িয়ে বলল।
”আপনার নাম শুনেছি, তবে এই প্রথম চোখে দেখছি।” নিতু সতর্ক ভঙ্গিতে বলল।
”শিবাকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছুটি দেওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট নিয়ে আমি এসেছি।”
নিতু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সাহেব বাংলাটা এত ভাল বলে যে, বাঙালি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
”কী জন্য ছুটি?” নিতু এবার বিভ্রান্ত।
”শিবা কামব্যাক করবে বক্সিংয়ে। আবার রিং—এ নামবে, আবার লড়বে। এজন্য ট্রেনিং করতে হবে, হার্ড ট্রেনিং।”
শুনতে শুনতে নিতুর মুখ গম্ভীর হতে লাগল। ”ট্রেনিং করবে তাই দোকান দেখতে পারবে না, তাই তো?”
গোমস কিঞ্চিৎ স্মার্টনেস হারাল নিতু সরাসরি এই প্রসঙ্গে আসায়। এ যেন রাউন্ড শুরুর বেল বাজার সঙ্গে—সঙ্গে মুখে প্রতিপক্ষর একটা জ্যাব!
”দোকান আর ট্রেনিং দুটো একসঙ্গে চালালে খুবই টায়ার্ড হয়ে যাবে। তাই বলছি, ডিসেম্বরে ন্যাশনালস পর্যন্ত ওকে যদি আপনি ছেড়ে দেন।”
”হগ্গালে ডেচকি লইয়া আসার কামডা অবইশ্য শিবা চালাইয়া যাইব, ওডা তো ওর টেরনিংয়ের মদ্যেই পড়ত্যাসে।”
”তুই থাম।” নিতু ধমক দিল। ননী গুটিয়ে গিয়ে পিছু হটে রিকশায় উঠল। ”আমি অহন যাই” বলেই প্যাডেল করতে শুরু করল।
