এর পরে সে দরজার পাল্লায় একটা ঘুসি বসায়। তাতে পাল্লাটা ফেটে গেছল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে হনহনিয়ে যখন সে বটকেষ্টর দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শচীনকাকু ডেকে একটা মোড়ক তার হাতে দিয়ে বলে ”ননী তোর জন্য রেখে গেছে।”
শিবা সেটাকে খুলতেই বেরোয় বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান হওয়ার মেডেল, সার্টিফিকেট আর বেস্ট বক্সার হওয়ার ট্রোফি। এক টুকরো কাগজও ছিল। তাতে বড়—বড় অক্ষরে লেখা, ”শাবাশ ফাইটার। এবার পাবি সোনার বকলেস।”
কাগজটা মুঠোয় চটকে শিবা নিজেকে বলেছিল, হ্যাঁ, সোনার বকলেসই পরব।
কিন্তু এর পরও দাদা, ননী, শক্তিমামা, সাগরমামি, আশ্চর্যদা,…সবাই তাকে আপন করে কাছে টেনে নিয়েছে। ওরা হয়তো ভুলে যাওয়ার ভান করছে, কিন্তু সে তো ভুলতে পারছে না। দাদাকে দোকানে একা ফেলে রেখে বক্সিংয়ে আবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা সে বলবে কোন মুখে! তার প্রধান সহায় ননী। কিন্তু সে স্পষ্টই জানিয়ে দিল, অন্য কাউকে দিয়ে বলাও।
গোমস—সারকে বললেই রাজি হয়ে যাবেন, কিন্তু দাদা কি ওঁর কথা শুনবে? তবু একবার চেষ্টা করে দেখা যাক, এই ভেবে শিবা লালবাগান জিম—এ যাওয়ার জন্য যখন বাসস্টপে দাঁড়িয়ে, একটা স্কুটার তখন তাকে দেখেই থেমে পড়ল।
হাত নেড়ে সাধু তাকে ডাকছে। ভ্রূ কুঁচকে শিবা স্কুটারের দিকে এগিয়ে গেল।
”আবার বক্সিং শুরু করেছিস?”
”হ্যাঁ।”
”হলধর বর্ধন টুর্নামেন্টে নামছিস?”
”কে বলল?”
”আমি সব খবরই রাখি। গোমস তোকে ট্রেনিং করাচ্ছে, কর, ভাল করে কর। কোনও সরঞ্জামের, কি জিনিসপত্রের যদি দরকার হয় আমাকে বলিস…না, না, আগে যা হয়ে গেছে তা হয়েই গেছে, সেসব কথা আমি মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। গোরাবাবুর সঙ্গেও আমার আর কোনও সম্পর্ক নেই। ঠিক করেছি, আমি নিজেই এবার বেটিং অর্গানাইজ করব।” সাধু হেলমেটটা মাথা থেকে নামিয়ে পেটের পর চেপে ধরে রয়েছে। এবার সেটায় হাত বোলাতে লাগল।
”কী অর্গানাইজ করবে?” শিবা ভ্রূ কুঁচকে সন্দিগ্ধ গলায় বলল।
”গোরাবাবু যা করত, সেটাই। বেটিং করে লোকটা কয়েক লাখ কামিয়েছে। কিন্তু তোর ওপর বাজি ধরে যে চোটটা পেল..যাকগে ওসব কথা—।”
”যাকগে কেন?” দাঁত চেপে বলার সঙ্গে—সঙ্গে শিবা হাত মুঠো করল।
”ন্যাশনালের ফাইনালে রোজারিওর মতো বুড়োর হাতে মার খেলাম, তারপর ইনভিটেশন টুর্নামেন্টেও ওর হাতে ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট হলাম। কেন? লড়াইয়ের আগে ড্রেসিংরুমে কান্তিদা কমলালেবু এনে বলল, গোমস পাঠিয়ে দিয়েছে। গোমসের নাম শুনে চোখ বুজে সেই কমলা আমি খেলাম, আর তারপরই সব ঝাপসা দেখতে লাগলাম, শরীর ঝিমিয়ে পড়ল। কান্তিদাকে বিষাক্ত কমলা দিয়ে কে পাঠিয়েছিল?”
”টাকা কামাবার জন্য রোজারিওর ওপর বেট করে, কিন্তু কাজটা আমি করিনি। হ্যাঁ, তুই ঠিকই ধরেছিস, ইঞ্জেকশন করে ওষুধ ঢোকানো কমলা কান্তির হাত দিয়ে আমিই পাঠিয়েছিলাম।” স্বচ্ছ চোখে, সরল ভঙ্গিতে সাধু খুবই সাদামাঠা গলায় তার দুষ্কর্মের কথাটা জানাল। ”আমি শুধু শোধ নিতে চেয়েছিলাম।” সাধুর বাঁ হাতটা তার বাঁ চোয়ালের কাছাকাছি উঠে এসেই নেমে গেল। এক চিলতে হাসি শুধু তার ঠোঁটে লেগে রইল।
”তা এখন হঠাৎ কী মনে করে? জিনিসপত্তর দেব, ভাল করে ট্রেনিং কর…ব্যাপারটা কী?”
”এবারের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ানশিপে তুই হবি আমার বাজির ঘোড়া। তোকে জিততে হবে, চ্যাম্পিয়ান হতে হবে।”
”অদ্ভুত তো! গোরাবাবুর হুকুমে সেদিন রিং থেকে কতকগুলো লোক সোজা আমাকে তুলে ওর বাড়িতে নিয়ে গেছল। আমার শরীরে তখন একফোঁটা শক্তিও ছিল না। সেখানে একটা ঘরে দুটো লোক দু’দিক থেকে আমায় চেপে ধরেছিল, আর একজন আমায় হেভিব্যাগ বানিয়ে পাঞ্চ করে গেছল। পাঞ্চিং শুরু করার আগে সে বলেছিল, ”চোয়ালের কথা আমার মনে আছে। আমার গায়ে হাত তোলার সাহস আজ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। তুই এখনও সে বেঁচে আছিস এটাই আশ্চয্যের।”…সেই লোকটার বাজির ঘোড়া এখন আমি! আমি তা হলে এখনও বেঁচে আছি! মার খেতে—খেতে সেদিন অজ্ঞান হয়ে গেছলাম। ভোরবেলায় বি.টি. রোডের ধারে একটা নালায় আমাকে পড়ে থাকতে দেখে রিকশাওয়ালা তুলে নিয়ে হাসপাতালে দিয়ে আসে। বিছানায় উঠে বসতে চার মাস লেগেছিল আর এই আঙুলটা সিধে হল না।” শিবা বাঁ হাতের তর্জনীটা সাধুর চোখের সামনে তুলে ধরল।
সাধুর ঠোঁট থেকে হাসিটা কিন্তু মুছল না। বাঁকা তর্জনীটা আলতো করে দু’ আঙুলে ধরে বলল, ”অপারেশন করে ঠিক করে নে, আমি খরচ দেব।…তোর মাথা গরম হয়ে উঠছে, এখন তোর সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। পরে বলব’খন।” সাধু হেলমেটটা পরে স্কুটারে স্টার্ট দেওয়ার জন্য কিকার—এ লাথি দিল। ক্লাচ দিয়ে স্কুটারটাকে সাত—আট মিটার চালিয়েই থামিয়ে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে সাধু বলল, ”জোনাকির ঘটনাটা শোনামাত্রই বুঝে গেছলাম কাজটা কার। পাঁচটা রডের সঙ্গে খালি হাতে একজনই লড়তে পারে। ওরা কিন্তু আমার ছেলে নয়। আর—একটা জিনিসও বুঝে গেছি, আগের শিবা আবার ফিরে এসেছে।….চলি, আবার পরে কথা হবে।”
সাধুর বিলীয়মান পিঠ থেকে চোখ সরিয়ে শিবা দেখল বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে। তাদের চোখে চাপা সমীহ আর ভয়।
।। ১০।।
ট্র্যাফিক জ্যামের জন্য চিড়িয়ার মোড় পার হয়েই বাসটা দাঁড়িয়ে গেল। টালা ব্রিজের ওপরও যানবাহন জমে রয়েছে, হয়তো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় পর্যন্তও এই অবস্থা। এই জট কখন ছাড়াবে, সেজন্য বসে থেকে সময় নষ্ট না করে শিবা বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করল।
