”অহন বক্সিংয়ের জইন্য,—এই বইল্যা চুপ কইরা গেলি ক্যান? ক, কী কইতে চাস, ক?”
”ননী তুই…তোরা এখনও কি সেসব কথা মনে রেখেছিস?”
”অহন আমি রিসকা লইয়া বাইরমু, আজেবাজে কথা শোনার মতো সময় নাই। তুই কালাসাহেবরে দিয়াই নিতুদারে কওয়া।” ননী একটু বেশিই ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে গেল।
শিবা বুঝল, হঠাৎ পুরনো ব্যাপারটা উঠে আসায় ননী অস্বস্তিতে প্রায় পালিয়েই গেল।
কিন্তু সে পালাতে পারছে না।
.
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য চ্যাম্পিয়ানশিপের ফাইনালে শিবা উঠেছিল পর—পর দুটো লড়াইয়ে নক আউট করে। প্রথমটায় এক মিনিট, পরেরটায় কুড়ি সেকেন্ড সময় তার লেগেছিল। বক্সিং মহলে সাড়া পড়ে গেছল। সেবার শিবা ছাড়া আর কেউ নক আউটে একটা লড়াইও জিততে পারেনি। বলাবলির বিষয় হয়ে উঠেছিল তার ক্ষিপ্রতা আর ঘুসির জোর।
ফাইনালে রিংয়ে উঠে লড়াইয়ের আগে নিজের কর্নারে দাঁড়িয়ে শিবা দর্শকদের দিকে চোখ বোলাতে—বোলাতে দেখেছিল সাধুকে। অবাক হয়ে গেছল। টকটকে ফরসা গায়ের রং, ধুতি—পাঞ্জাবি পরা, সরু সোনালি ফ্রেমের চশমা চোখে দেওয়া, মাথার চুল পাতলা একটি লোকের পেছনে বসে সাধু, সামনে ঝুঁকে লোকটিকে কিছু বলছে আর তার দিকে তাকাচ্ছে। ঠোঁটে হাসি খেলছে।
প্রথম রাউন্ডেই সুনীল বেরাকে নক আউট করে শিবা বাংলার লাইট ওয়েট চ্যাম্পিয়ান হয়। রিং থেকে নেমে আসতেই বুকে জড়িয়ে ধরে আশ্চর্য ঘটক বলেছিল, ”এভাবে প্রত্যেকটা খেলায় নক আউট, আমি কখনও দেখিনি রে। লালাবাগানের ইজ্জত বাড়িয়ে দিলি।” ফ্র্যাঙ্ক গোমস বলেছিল, ”ঘোটক, তোমাকে যা বলেছিলাম এবার তা মিলিয়ে নাও। ঝুটা কি সাচ্চচা, আমি ঠিক চিনতে পারি।” তারপর শিবাকে বলেছিল, ”আই অ্যাম রিয়্যালি প্রাউড টুডে। এবার হার্ড ট্রেনিং ন্যাশনালসের জন্য।”
এরই মিনিটপাঁচেক পর এক অচেনা শীর্ণকায় প্রৌঢ় তার কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, ”তোমার সঙ্গে গোরাবাবু একটু কথা বলতে চান, একবার বাইরে আসবে?”
”কে গোরাবাবু?” শিবা জিজ্ঞেস করে।
”গোরাচাঁদ সেন। খেলাধুলোর একজন বড় পেট্রন, অনেক ক্লাবকে টাকা দেন। খুব বড় ব্যবসায়ী, কারখানা আছে তিনটে। তোমার লড়াই ওঁর খুব ভাল লেগেছে তাই কথা বলতে চান।”
গোরাবাবুর সঙ্গে শিবার সেই প্রথম সাক্ষাৎ। তাকে একশো টাকার নোট দিয়ে গোরাবাবু বলেছিল, ”পুরস্কার।” তারপর ”কাজ করবে? তোমার বক্সিংয়ের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনও কাজ নয়। সামান্যই। আমার বাড়িতে থাকবে, খাবে, মাইনেও দেব। এবার তোমার ভাল খাওয়াদাওয়া দরকার, মোটর গ্যারাজে পড়ে থেকে কি ওপরে উঠতে পারবে? এসো আমার বাড়িতে।” গোরাবাবু নাম—ঠিকানা লেখা কার্ড দিয়েছিল শিবাকে।
শিবার মনে হয়েছিল জীবনটাকে বদলে নেওয়ার একটা সুযোগ তার কাছে এসেছে। এটাকে সে ছাড়বে না। তখন নিতুদের কারখানায় ধর্মঘটের এগারো দিন চলছে। সেই ধর্মঘট ভাঙতে সাধু আর তার দলের ছেলেরা এসেছিল। শিবা খালি হাতেই লোহার চেন আর ছুরির সামনে দাঁড়িয়ে গুণ্ডাদের পালটা মার দেয়।
ঠিক তখনই সেই লোকটার আবির্ভাব হল, যে তাকে বলেছিল, গোরাবাবু তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। ধর্মঘটীদের মধ্যে ছিল শক্তি দাস। সে ফিসফিস করে একজনকে তখন বলে, ”এটা তো মালিকের সুকতোলা প্রিয় হালদার, এখানে যে!”
প্রিয় হালদার ক্ষুব্ধ স্বরে তখন বলেছিল, ”তুমি এখানে কী করছ শিবাজি! বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান কিনা মাস্তানি করছে? সকালে এদিকেই আমরা এসেছিলুম, খবর পেলুম তোমায় নাকি গুণ্ডারা ঘিরে ধরে মারছে! শুনেই তো গোরাবাবু ছুটে এসেছেন, গাড়িতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। চলো, চলো…এ কি তোমার হাতে কনুইয়ে কাটাছোঁড়া কেন? ভেঙেটেঙে গেলে চিরকালের মতো বক্সিংই যে শেষ হয়ে যাবে।”
এই বলে প্রিয় হালদার তাকে টেনে নিয়ে যায়। তখন হাত তুলে শিবা, নিতু আর শক্তি দাসকে জানিয়েছিল, সে এখনই আসছে। ওরা বিভ্রান্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে—থাকতে মুখটা কঠিন করে ফেলে।
কিন্তু শিবা আর আসেনি।
এখনও শিবা সেই স্মৃতি থেকে পালাতে পারছে না। সেদিন গোরাবাবুর মোটরে প্রিয় হালদার তুলে নিয়ে যাওয়ার পরই সাধুর দল ফিরে এসে মিনিট তিনেকের মধ্যেই ধর্মঘটীদের মেরে হটিয়ে দেয়, নিতু ও শক্তি দাসকে হাসপাতালে যেতে হয়। এসব কথা কয়েকদিন পর গ্যারাজে ফিরে এসে শিবা জানতে পেরেছিল। দুর্লভ চক্রবর্তী বলেছিল, ”নিজের দাদাকে গুণ্ডাদের হাতে ফেলে দিয়ে পালাবি, এটা আমরা কেউ ভাবতে পারিনি। ধর্মঘট ভেঙে গেছে, ওদের আর চাকরি হয়নি। এইসব জামা—জুতো পরার লোভেই পালালি?”
”আমি পালিয়েছি?” শিবা চিৎকার করে ছুটে গেছল বাড়িতে। প্লাস্টারে হাত—বুক মোড়া নিতু তাকে দেখে বলেছিল ”আয়, বোস।” শিবা বলেছিল, ”জানতুম না গোরাবাবুই তোমাদের কারখানার মালিক, বিশ্বাস করো দাদা।” নিতু ঘাড়টা নাড়তে গিয়ে যন্ত্রণায় কাতরে উঠে বলেছিল, ”আমি কিছু মনে করিনি।”
সেই সময়ই মা চিৎকার করে বলে উঠেছিল, ”বেরো, বেরো, বেইমান।” একটা অন্ধ রাগ হঠাৎই শিবাকে তখন আচ্ছন্ন করে দেয়। সেও পালটা চেঁচিয়ে ওঠে, ”কিসের বেইমানি? গুণ্ডা ঠেকাবার দায় আমার হাতে যাবে কেন? আমি কি ধর্মঘট করতে বলেছি?…আমারও জীবন আছে, সেটা কেউ দেখতে আসবে না? নিজেকে নিজেই দেখতে হবে।…সবাই বড় হতে চায়, সেজন্য যে পথই খোলা পাব সেই পথে আমি যাব।”
