ভ্রূ তুলে গোমস একবার তাকাল।
”আপনি হেরে গিয়ে ডুবে মরতে চাইছেন।”
গোমস রুটি চিবনো বন্ধ করল।
”দ্যাটস মাই বিজনেস।”
”সার, একটা ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ানও আপনি তৈরি করতে পারেননি। সবাই বলে ফ্র্যাঙ্ক গোমস একটা জালি ট্রেনার। বক্সিং—এর কিচ্ছু জানে না, শুধু বড়—বড় কথাই বলে।”
”আই নো দ্যাট, আমিও শুনেছি।”
”একবার শেষ চেষ্টা করুন না সার…সবার মুখ বন্ধ করে দিয়ে তারপর যেখানে ইচ্ছে মরে পড়ে থাকুন। একটা নকআউট পাঞ্চ শেষবারের মতো দিয়ে যান।” শিবা দরজা থেকে ফিরে এসে গোমসের সামনে উবু হয়ে দুই মুঠি তুলে ধরল। ”এই দুটো আপনাকে ভাসিয়ে তুলবে সার…আপনি আমাকে শুধু তৈরি করে দিন।”
নীরবতা নেমে এল ঘরে। কেউ আর কথা বলছে না। গোমসের রুক্ষ কর্কশ মুখভাব ধীরে—ধীরে মোলায়েম হয়ে আসছে। সে মাথা নাড়ল ধীরে—ধীরে, অন্যমনস্কভাবে। মৃদু স্বরে বলল, ”ইউ আর টেমটিং মি। কিন্তু শিবা, লাইফে আমি একটা টোটাল ফেইলিওর…আমার সাকসেস দেখে খুশি হবে এমন কেউই আমার নেই।”
”কেন, আমি আছি, ননী আছে, আশ্চয্যদা আছে, সাগরমামি, পূর্বপল্লীর মানুষরা আছে।…আরও কত, কত লোক যে খুশি হবে! বেঙ্গল থেকে বক্সিং—এ একটা ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান কত বছর যে বেরোয়নি!”
শিবার উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল গোমস। ঠোঁট দুটো কাঁপল। নাকের নীচে রুটির গুঁড়ো লেগে, আঙুল দিয়ে মুছল। চোখ তুলে পেরেক দিয়ে ক্রুসে বেঁধানো যিশুর দিকে তাকাল। তার মুখের ওপর দিয়ে করুণাঘন যন্ত্রণার ছায়া ভেসে গেল।
”তুমি বাইবেল পড়োনি, তাতে রেজারেকশন বলে একটা ব্যাপার আছে। ক্রাইস্টকে কবর দেওয়ার পর তিনি উঠে এসেছিলেন। এর একটা ডিপার মিনিং আছে। জীবন মরে পড়ে থাকে না, সে উঠে আসে।…শিবা, আমি জিম—এ যাব।”
তাঁর দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা শিবার মাথায় গোমসের হাত নেমে এল।
।। ৯।।
গোমস একদা বলেছিল বটে, ‘এই ছেলেটার মধ্যে দারুণ জিনিস আছে’, কিন্তু শুধু ‘জিনিস’ দিয়েই তো খেলোয়াড় তৈরি করা যায় না! ‘জিনিস’টাকে মারাত্মক করে তোলার জন্য সেটাকে নিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ মানে পরিশ্রম। সেটাকেই ধ্যানজ্ঞান করে তোলা, অর্থাৎ তাতে সময় দেওয়া। এই সময় দেওয়াটাই শিবার কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠল।
সকালে ননী রিকশায় ডেকচি ও শিবাকে পৌছে দিত, যেহেতু শিবার পায়ের চোটটা বিশ্বাসযোগ্য করে নিতুর কাছে দাখিল করতে হত। দু—সপ্তাহ পর ননী ঘোষণা করে, ”ডাক্তারবাবু পরীক্ষা কইরা কইয়া দিচ্ছেন শিবা ফিট, অহন হাঁটতে—চলতে পারব আগের মতন।”
এবার বিপদে পড়ল শিবা। ফিট হয়ে যাওয়া মানে দু’বেলাই দাদার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, সাহায্য করা। তা হলে লালবাগানে সে যাবে কখন? সে সমস্যা সমাধানের জন্য সাহায্য চাইল ননীর।
”আর আমি মিথ্যা কইতে পারুন না।” ননী ঝাঁঝিয়ে উঠল। ”তুই অন্য লোক দ্যাখ এবার। তোর জইন্য এত মিথ্যা কথা কইচি যে, তিন—চারডা নরক লাগব আমারে শাস্তি দিতে…তুই কালা সাহেবরে দিয়া কওয়া না, মনে তো হয় নিতুদারে বোঝাইতে পাইরব।”
গোমসকে ননী ‘কালাসাহেব’ বলে, অবশ্য সামনাসামনি নয়। শিবা বিব্রত মুখে বলল, ”সারের অবস্থা তো বলেছি তোকে। বিনি পয়সায় ওঁর কাছ থেকে ট্রেনিং নিতে আমার লজ্জা করে, নিজেকে বড় সুবিধাবাদী মনে হয়।”
”মনে হওয়া তো উচিতই। আমি যে কষ্ট কইর্যা রিসকা চালানো শিকচি, সে কি লোককে মাগনায় রিসকায় চড়াইয়া ঘুরামু বইল্যা।”
”সারের জন্য কিছু একটা করা দরকার। অন্তত ভাল একটা জায়গায় রাখা, ভাল একটু খাওয়ার ব্যবস্থা করা…টাকাপয়সার থেকেও এটা জরুরি।”
”তারও আগে তর নিজের কথাটা তুই ভাইব্যা দ্যাখ। নিতুদারে বুঝাইয়া—সুঝাইয়া আলুর দমের হাত হইতে নিজেরে কিভাবে রক্ষা কইরবি, আগে সেইডা ঠিক কর। একসময় আমিই তোরে কইছিলাম, তুই যখন প্র্যাকটিস করবি তোর লইয়া নিতুদার লগে আমি কাম করুম। একবার তো কইতে গেলামও, দ্যাখলাম নিতুদা ব্যাপারডা অ্যাকদমই পসন্দ করতাচে না। রিসকা ফ্যালাইয়া চা—রুটি—আলুর দম পরের হইয়্যা বেচুম ক্যান? এ—কথার তো জবাব দিতে পাইরল্যাম না। কালা সাহেবরে দিয়া না হইলে অন্য কাউরে দিয়া কওয়া না, তুই নিজেই ক না!”
”ওরে বাবা! আমার দ্বারা বলাটলা হবে না। আমি তো জানি, কি কষ্ট করে দিনরাত খেটে, একাই দোকানটা দাঁড় করিয়েছে। দোকানে যাব না, এটা বলার মতো পাপ আর হয় না! আরও দুটো খাবার দোকান রয়েছে তাদের সঙ্গে কম্পিট করে বিক্রি বাড়ছে, এই সময়ই দাদার আরও বেশি করে হেল্পার দরকার। এখন যদি বক্সিংয়ের জন্য—।”
শিবা চমকে উঠল ননীর মুখের দিকে তাকিয়ে। মেদ মাংসহীন শীর্ণ মুখটা কঠিন হয়ে উঠেছে। ওর চোখ থেকে একটা হলকা বেরিয়ে এল। শিবার বুকের মধ্যে পর—পর কে যেন ঘুসি মেরে যাচ্ছে। ঢপ, ঢপ, ঢপ শব্দগুলো কলজের না ঘুসির, সে বুঝতে পারছে না। ননীর মুখে কী একটা যেন ফুটে উঠেছে!
কী কথা! শিবার মনে হল ননী যেন মনে—মনে বলছে, এই বক্সিংয়ের জন্যই তুই একদিন দাদাকে, মাকে, আমাকে, পূর্বপল্লীর সব মানুষকে ত্যাগ করে চলে গেছলি গোরাবাবুর কাছে। যেখানে পেট ভরে ভাল খাওয়া, ভাল জামা—জুতো, ভাল বিছানা, এইসবের লোভে তুই সোনার বকলেস পরে কুকুর হয়ে গেছিলিস। গোরাবাবুর কারখানার নিতুদারা ধর্মঘট করেছিল। সেই ধর্মঘট গোরাবাবু সাধুর দলবলকে দিয়ে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তুই কিনা সেই লোকটারই আশ্রয়ে গিয়েছিলি! বক্সিংয়ের নাম করেই, তুই বেইমানি করেছিলি আমাদের সঙ্গে।
