”এই ছোকরা।” বৃদ্ধ শিবাকে ডেকে আঙুল দিয়ে দেখাল। ”তুমারা আদমি আতা হ্যায়।”
শিবা তাকিয়ে রইল। চেক লুঙ্গি আর গেঞ্জিপরা, হাতে একটা কাগজের মোড়ক নিয়ে যে—লোকটা এগিয়ে আসছে সেই কি ফ্র্যাঙ্ক গোমস?
”গোমস—সার।”
গোমস থমকে ঘুরে দাঁড়ালেন। ”হু?”
”আমি শিবা।”
এবার গোমসের চমকে ওঠার পালা।
”শিবা! আই মিন শিবাজি আইচ?”
”হ্যাঁ সার।”
”তুমি তো মরে গেছ শুনেছি!”
”না সার, তবে প্রায় মরে গেছলুম।”
গোমস হঠাৎ দু’ হাতে শিবাকে জড়িয়ে ধরল। শিবা ওর মুখ থেকে যে—গন্ধটা পেল, জুট মিলের বহু মজুরের মুখে সে এই গন্ধ পেয়েছে।
”কাম, কাম টু মাই রুম। আমি একাই থাকি।”
ঘরটায় একটা চৌপায়া, চামড়ার একটা জীর্ণ সুটকেস, প্লাস্টিকের জল—রাখার জার। দুটো কাচের গ্লাস আর হ্যাঙ্গারে প্যান্ট আর বুশ শার্ট। তার পাশে দেওয়ালে আঁটা বিঘতখানেক লম্বা মাটির একটা মূর্তি—ক্রুসবিদ্ধ যিশু। বিছানা বলতে সুজনি আর ওয়াড়বিহীন চিটচিটে বালিশ। বালব থেকে নির্গত জন্ডিস রুগির মতো পাণ্ডুর আলোয় ঘরটাকে শ্রান্ত, অবসন্ন দেখাচ্ছে।
”সিট ডাউন।”
শিবা চৌপায়ায় বসল। তারপরই দাঁড়িয়ে উঠে উত্তেজিত স্বরে বলল, ”সার, এ কী দশা হয়েছে আপনার! কী করে হল? কেন হল? আপনি যে এখানে নেমে আসবেন, এ তো কল্পনাও করা যায় না। আপনাকে যেভাবে দেখেছি, তার সঙ্গে আজকের এই দেখা…।” তার চোখে জল এসে গেল।
”সিট ডাউন, সিট ডাউন…আপসেট হয়ে গেছ তুমি। আমার কথা শুনে তোমার কোনও লাভ হবে না, আই অ্যাম ফিনিশড। আমার জীবনে আর কিছু করার নেই, শুধু এই বডিটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া। ওয়েলেসলিতে একটা পুরনো ফার্নিচারের দোকানে কাজ করি, ছ’শো টাকা দেয়। এই ঘরটার ভাড়া দেড়শো। বাকি টাকায় এর থেকে স্টাইলে কি থাকা যায়?”
হাতের মোড়কটা খুলে গোমস শিবার সামনে ধরল। রুটি, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর শুকনো কয়েক টুকরো ভাজা মাংস। ”টেক।”
”না।”
”বিফ, তাই খাবে না?”
”তা নয়। খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না।”
”কেন?”
”আপনি আমার সঙ্গে প্রথম যেদিন কথা বলেছিলেন, সেসব কথা কি আপনার মনে আছে?”
”প্রথম কবে বলেছি? আই কান্ট রিমেমবার।”
”দুর্লভ চক্রবর্তীর গ্যারাজ থেকে একটু দূরে একটা কোচিং, সেখান দিয়ে যেতে—যেতে আপনি কিছু একটা দেখেছিলেন।”
”ওহহ, ইয়েস, ইয়েস,…..ফ্যান্টাস্টিক! তুমি একটা মাসকিউলার গুণ্ডার জ—এ লেফট হুক ল্যান্ড করালে, তখন আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেটা দেখতে পেয়ে থেমে গেলাম। আই ওয়াজ স্টানড। তোমার কাছে গিয়ে বললাম—ইউ হ্যাভ আ বিউটিফুল লেফট হুক, টেরিবল, আ ডেডলি জেম অব আ পাঞ্চ, কতদিন ট্রেনিং করছ? যখন বললে জীবনে তুমি বক্সিং করোনি, নেভার ফট ইন দ্য রিং, তখন বললাম লালবাগানে এসো, আমি তোমাকে শেখাব, ট্রেনিং করাব।….ইয়েস শিবা, ভিভিডলি আমার মনে পড়ছে তোমার সেই মুখ, ফ্ল্যাবারগাস্টেড অ্যান্ট ইনোসেন্ট ফেস। আই লাইকড দ্যাট ফেস। বললে, তোমার বয়স ওনলি সেভেনটিন । শুনে আমি কী বলেছিলাম, মনে আছে?”
গোমসের কথাগুলো জড়িয়ে আসছে। রুটি ছিঁড়ে মুখে তুলতে দিয়ে যে থমকে বলল, ”খাবে না?”
”না।”
”ওয়েল।” মাংসের টুকরো মুখে ঢুকিয়ে গোমস শিবার দিকে তাকাল। ”কী বলেছিলাম সেদিন?”
হঠাৎ গলা চড়ে গেল গোমসের। ”হোয়াট আই সেইড অন দ্যাট ডে? আই সেইড—তুমি বড় আছ, স্ট্রং আছ, ফাস্ট আছ, কারেজিয়াস আছ। ভাল ফাইটার হবে।” গোমসের বসে যাওয়া দুটো গালের চামড়া টানটান হয়ে উঠেছে। কোটরের মধ্যে চোখের মণি দুটো জ্বলছে।
”তুমি কি ফাইটার হয়েছ?”
শিবার মাথা ঝুঁকে পড়ল।
”তুমি লালবাগান জিম—এ প্রথমে আসোনি। আমিই গিয়ে চা—এর দোকান থেকে তোমাকে ধরে দুর্লভের গ্যারাজে নিয়ে যাই। ওকে বলেছিলাম, দিস বয় উড বী আ ব্রিলিয়ান্ট ফাইটার। যদি আমার কাছ থেকে ফারদার কাজ চাও তা হলে একে চায়ের দোকান থেকে সরিয়ে এনে তোমার কাছে রাখো। বলেছিলাম, দারুণ জিনিস আছে এই ছেলেটার মধ্যে। দুর্লভ আমার রিকোয়েস্ট রেখেছিল, তোমাকে কাম দিয়েছিল। ঠিক কি না? বাট ইউ লেট মি ডাউন। রোজারিওর কাছে ফাইনালে হেরেছিলে, একটা ওল্ড ফাইটার…হোয়াট আ শ্যেম!”
শিবার মাথা আর—একটু ঝুঁকল।
”তুমি এখানে এসেছ কেন, হোয়াট ফর?” আচমকা গোমস বিরক্ত গলায় প্রশ্নটা করল। ”আই অ্যাম গ্র্যাজুয়ালি ফেডিং আউট ফ্রম লাইফ, একদিন এই ঘরেই লাশ পড়ে থাকবে। আমি চাই না চেনা কেউ এখানে এসে আমার খোঁজ করুক। ইউ মে গো নাউ।”
”সার, আমি আবার রিংয়ে নামতে চাই।”
”হোয়াট! সে ইট এগেইন!” গোমস প্রায় চিৎকার করে উঠল।
”আমি আবার শুরু করতে চাই, ফিরে আসতে চাই। আপনি আমাকে ফিরিয়ে আনুন।” শিবা অবলম্বন খোঁজার মতো করে দু’ হাত বাড়িয়ে দিল। গোমস তা দেখেও দেখল না।
”কাম ব্যাক? তুমি কাম ব্যাক করতে চাও? টেক সামওয়ান এলস অ্যাজ ইওর ট্রেনার। নট মি।….ইউ মে গো নাউ।”
”সার, এবার আমি কোনও ভুল করব না, চ্যাম্পিয়ান হবই।”
”ভেরি গুড, নাউ গেট আউট।” গোমসের তর্জনী দরজা দেখাল।
এর পর আর থাকা যায় না। শিবা উঠে দাঁড়িয়ে মন্থর ভাবে দরজায় পৌঁছে ঘুরে দাঁড়াল।
”সার, এই ঘরেই মরে পড়ে থাকবেন?”
গোমস রুটি চিবোতে ব্যস্ত, জবাব দিল না।
”আমাকে আপনি ভেসে উঠতে সাহায্য করবেন না।”
