ওজন—যন্ত্রের কাঁটার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য ঘটক ভ্রূ কোঁচকালেন। ”করেছিস কী, প্রায় বাহাত্তর কেজি!…লাইট মিডল। অবশ্য ট্রেনিং করতে—করতে শরীর ঝরবে, একাত্তরের নীচে ওয়েল্টারে এসে যাবি।”
খালি গায়ে শুধুমাত্র জাঙিয়া পরে শিবা ওজন দিতে যন্ত্রের ওপরে উঠেছিল। প্যান্ট আর টি—শার্টটা পরতে—পরতে বলল, ”গোমস—সার কখনও আসেন আশ্চয্যদা?”
”গোমস?” আশ্চর্য ঘটক আমতা—আমতা করে বললেন, ”ও তো আর আসে না। বছর—দুই আগে ওর একমাত্র মেয়ে বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার পর থেকেই কীরকম যেন হয়ে গেল। দুনিয়ায় ওই মা—মরা মেয়েটি ছাড়া আর কেউ তো ছিল না। প্রাণ দিয়ে ভালবাসত। পুরনো মোটর কেনাবেচার ব্যবসাটা ছেড়ে দিল। হাতে যা টাকা ছিল তাই দিয়ে দিনরাত্তির মদ খেতে শুরু করল।….জিম—এ আসা বন্ধ করল। ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা আমরা করেছি। দু—তিনবার এসেওছিল; বুঁদ হয়ে বসে থাকত, হঠাৎ—হঠাৎ চিৎকার করে উঠত, ছেলেদের চড়—থাপ্পড়ও মারত। তারপর নিজেই আসা বন্ধ করে দিল।”
”সেই পার্ক সার্কাসের বাড়িতেই আছেন?”
”না রে, ওখান থেকে বাড়িওলা উঠিয়ে দিয়েছে। আর ভাড়া দিতে পারত না।”
ফ্র্যাঙ্ক গোমসের কথা শুনতে—শুনতে শিবা যেমন দুঃখ পেল তেমনই অসহায়ও বোধ করল। গোমসই তাকে বক্সিং শিখিয়েছে, তার প্রথম ও একমাত্র গুরু। এখন নতুন করে শুরু চাই।
”আমাদের এখানে ট্রেনার এখন কান্তি, কান্তি সরকার। তুই তো ওকে চিনিস।”
কান্তি নামটা শোনামাত্র শিবার মুখ হাজার বছরের পাথরের মূর্তির মতো ঘষা, ভাঙা, কর্কশ হয়ে উঠল। লোকটাকে সে হাড়ে—হাড়ে চেনে। ধূর্ত, শয়তান এবং অতি—অমায়িক। লালবাগান জিম—এরই বক্সার ছিল। গোমস যখন ইস্টার্ন রেলওয়ের কোচ ছিলেন তখন সেখানে ওকে চাকরি করে দেন। কান্তি এখন আর রিংয়ে নামে না।
শিবা মাথা নেড়ে বলল, ”কান্তিদাকে নয়, আমার চাই গোমস—সারকে। ওঁকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”
”বলতে পারব না, তবে পাড়ার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো হদিস মিলতে পারে।”
শিবা ঠিক করল হদিসই করবে। পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপোর পাশের রাস্তায় গোমস থাকতেন। পরদিন বিকেলে সে হাজির হল সেখানে। কাঠের পাল্লার ফটক দিয়ে ঢুকে দশ মিটার জমি পেরিয়ে চারধাপ সিঁড়ি। ঢাকা বারান্দা। এখানেই চেয়ার—টেবল নিয়ে বৈঠকখানা, পেছনে দুটো ঘর। এখন আর তা নেই। বারান্দার আধখানা কাঠের পার্টিশান দিয়ে জেরক্স মেশিন বসিয়ে ব্যবসা চলছে।
সেখানে মালিকের মতো হাবভাব দেখে লোকটিকে সে জিজ্ঞেস করল, ”এখানে ফ্র্যাঙ্ক গোমস নামে একজন থাকতেন, তিনি কোথায় গেছেন, বলতে পারেন কি?”
লোকটি জানাল সে মাত্র সাতমাস এখানে ভাড়া নিয়ে এসেছে। ভেতরের ঘরে কিসের একটা অফিস। শিবা উঁকি দিয়ে জনাচারেক লোককে দেখল। নিশ্চয় এখানে বাস করে না, সুতরাং কিছুই বলতে পারবে না গোমস সম্পর্কে। তবু একবার বলে দেখাই যাক না ভেবে সে একজনকে জিজ্ঞেস করল। তিনজন মাথা নাড়ল, শুধু চতুর্থজন পরামর্শ দিল—”গেটের সামনে পানের দোকানটায় জিজ্ঞেস করতে দেখতে পারেন।”
পানওয়ালা গোমসকে চেনে, কিন্তু কোথায় যে গেছে সেটা আর জানে না। ”কিছুই বলে যায়নি। রাতারাতি হাওয়া হয়ে গেল। তবে শুনেছি এধার—ওধারেই কোথাও আছে।”
ওদের কথা দাঁড়িয়ে শুনছিল মাঝবয়সী একজন। সে বলল, ”হপ্তাতিনেক আগে ট্রাম থেকে ওকে এলিয়ট রোডে দেখেছি। একটা বড় হোটেল আছে, তার সামনের গলিতে ঢুকল।”
এলিয়ট রোডে কীভাবে যাবে জেনে নিয়ে শিবা বাসে উঠল এবং কন্ডাক্টরের হাঁক শুনে ঠিক জায়গাতেই নামল। বড় হোটেল ওই একটিই, অতএব সেটিকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। তার উলটোদিকের গলিটি এঁকেবেঁকে কত দূর ঢুকে গেছে কে জানে! দু’ ধারে ঘিঞ্জি পুরোনো বাড়ি, রাস্তায় প্রচুর আবর্জনা আর দোকান। এখানবার লোকেদের পোশাকআশাক দেখেই বোঝা যায় অঞ্চলটায় অভাবী মানুষই বেশি।
কাকে সে জিজ্ঞেস করবে ফ্র্যাঙ্ক গোমস নামে কাঁচাপাকা চুল, কুচকুচে কালো, ছিপছিপে গড়নের, বাংলা—হিন্দি বলা এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সাহেবকে কোথায় পাব?
সে একের পর এক দোকানদারদের জিজ্ঞেস করে—করে এগোতে থাকল। শোনামাত্রই তারা মাথা নেড়ে দিল, কেউ—কেউ কয়েক সেকেন্ড ভাবার চেষ্টাও করল। সন্ধ্যা নামছে। রাস্তার আলো, দোকানের আলো জ্বলল। কিন্তু গোমসের পাত্তা সে পাচ্ছে না। যত সে গলির মধ্যে ঢুকছে, বাড়ির চেহারাগুলো বদলে যাচ্ছে। টালির বা টিনের চালের কাঠের দোতলা বাড়ি, তবে একতলা বাড়ির সংখ্যাই বেশি। রাস্তার জলের কলে ভিড়। শিবা ঠিক করল আর সে এগোবে না।
ফিরে আসার জন্য ঘুরে হাঁটতে শুরু করেই ভাবল, শেষবার সে একজন কাউকে এবার জিজ্ঞেস করবে। বাড়ির দরজার পাশে রকে এক বৃদ্ধা চিনা, কোলে বাচ্চচা নিয়ে বসে। একেই বলা যাক, ঠিক করে শিবা এগিয়ে গেল।
শিবার কথাগুলোয় মন দিয়ে শুনে সেই চিনা আঙুল দিয়ে সামনের বাড়িটা দেখিয়ে বলল, ”ওহি কোঠিমে দেখো তো। ডাহিনা বহেলা কামরামে এক আদমি আয়া। তুম য্যায়সা বোলতা, ওহি মাফিকই হ্যায়। উয়ো লোক তো আভি বাহার গিয়া, থোড়া ওয়েট করো। আ যায়গা।”
শিবার কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে পায়চারি শুরু করল। গোমস—সার এইরকম একটা নোংরা বস্তিতে আছেন, এটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে মনে—মনে বলল, যে লোকটার জন্য অপেক্ষা করছে সে যেই হোক গোমস সার যেন না হয়! ফিটফাট শৌখিন মানুষ এই দুর্গন্ধভরা পরিবেশে!
