ওধারে একটা জিমন্যাসটিকস ক্লাব। সেখানে বিম—এর ওপর একটা মেয়ে দেহটাকে চাকার মতো ঘুরিয়ে ভল্ট দিচ্ছিল। কখনও তার দুটো পা শূন্যে উঠছে, কখনও—বা দু’ হাত ছড়িয়ে বিমের ওপর দিয়ে টলমল করে হাঁটতে গিয়ে নৌকো থেকে প্রতিমার বিসর্জনের মতো পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটির মুখ চেনা—চেনা লাগছিল বলেই সে তাকিয়ে থেকেছিল। সেই সময় আশ্চয্যদা পেছন থেকে বলে উঠেছিল, ”ওদিকে কী দেখছ? এখানে কেউ আশপাশে তাকায় না। এটা ঘাম—রক্ত ঝরিয়ে সাধনার জায়গা।” কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপ বা রুক্ষতা ছিল না। শিবা লজ্জা পেয়েছিল।
বিম—এ ভল্ট দেওয়ার প্র্যাকটিস করছিল যে—মেয়েটি, শিবা পরে তাকে চিনতে পেরেছিল। ভবানী—সারের কোচিংয়ে পড়তে আসে। তারপর এখন তো সে জানেই ওর নাম মিতা, পারমিতা দাস।
”আশ্চয্যদা, আমি আবার শুরু করব, রিংয়ে নামব।” গলা নামিয়ে শিবা প্রায় ফিসফিস করে বলল।
আশ্চর্য ঘটক ভালমতো শুনতে পেলেন না। মাথাটা কাত করে বললেন, ”কিছু বললি?”
”আমি আবার শুরু করব।”
”কী শুরু করবি?”
”বক্সিং।”
আশ্চর্য ঘটকের চোখ পৃথিবীর নবম বা দশম আশ্চর্যতম বস্তুটি দেখার মতো হয়ে উঠল। কী বলবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।
”তুই…তুই আবার—।”
”পারব না? মাত্র তো চারটে বছর সরে আছি, আবার ফেরা যাবে না?” শিবা ব্যগ্র উৎকণ্ঠা নিয়ে আশ্চর্য ঘটকের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে রইল।
”ফেরা যায় না মানে! আলবাত ফেরা যায়। মহম্মদ আলি সাড়ে তিন বছর পর রিংয়ে ফিরে আরও দু’বার চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল। তা হলে তুই কেন ফিরে আসতে পারবি না?”
”আলির সঙ্গে আমার কোনও তুলনাই হয় না। কী বিরাট ফাইটার! ওর কাছে আমি তো একটি পিঁপড়ে।”
”ঠিক কথাই, তুই আলি নোস কিন্তু তোর অপোনেন্টরাও তো কেউ ফ্রেজিয়ার, নর্টন বা ফোরম্যান হবে না। বড়—বড় ফাইটারদের মতো নিজেকে ভাব, তাদের সঙ্গে একই লাইনে নিজেকে দাঁড় করা, এটাকে ‘বামন হয়ে চাঁদ ধরা’ বলে হেসে উড়িয়ে দিসনি। এইরকম করে ভাবলে তবেই চেষ্টাটা আসে।” আশ্চর্য ঘটক থেমে গিয়ে হেসে উঠলেন। ”এই দ্যাখ লেকচার দিয়ে ফেলছি! কবে থেকে শুরু করবি?…তোর শরীর তো আগের থেকে অনেক বড় হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে জোরও বেড়েছে, লাইট ওয়েটে লড়েছিলি, এখন ওজন কত?”
”জানি না, ওজন নিইনি।”
”চল, চল, ঘরে চল, ওজনটা নিয়ে দেখি।”
শিবাকে নিয়ে তিনি হলঘরে এলেন। এরই কোণের দিকে ছোট্ট অফিসঘরটা। আশ্চর্য ঘটককে দেখে ছেলেরা জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাল। জরুরি কিছু বলার না থাকলে, যখন ট্রেনিংয়ে ছেলেরা ব্যস্ত থাকে তখন তিনি হলঘরে পা দেন না।
হেভি ব্যাগটার পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে আশ্চর্য ঘটক থেমে গিয়ে মুচকি হাসলেন। ব্যাগে হাত রেখে বললেন, ”মনে আছে তোর?”
শিবা লাজুক হাসল। ঘটনাটা মনে তো আছেই, চিরজীবনই তার মনে থাকবে।
.
তখন রাত প্রায় দশটা। জিম—এর হলঘরটা, ইলেকট্রিক খরচ বাঁচাবার জন্য অন্ধকার। শিবা একাই হেভি ব্যাগে ঘুসি মেরে চলেছে। বাইরে কয়েকজন প্রবীণ মেম্বারের সঙ্গে আশ্চর্য ঘটকও বেঞ্চে বসে গল্প করে যাচ্ছেন। ঢপ—ঢপ—ঢপ, ব্যাগে ঘুসি মারার শব্দটা ওদের কানে আসছিল।
একজন জানতে চাইল, ”অন্ধকারের মধ্যে কে ট্রেনিং করছে, আশ্চয্য?”
”গোমসের ছেলে, ডেডিকেটেড, শিবা নাম। গোমস এবার একে নিয়ে পড়েছে।” আশ্চর্য ঘটক বললেন।
”এই নিয়ে গোমস ক’টাকে ধরে আনল বল তো? একটাও তো ন্যাশনালের ফাইনালে পর্যন্ত উঠতে পারল না।….ওঠার জন্য খাটতে হয়, এটাই বাঙালি ছেলেরা পারে না। জোর চাই জোর, ঘুসির জোর।” এই বলে ভদ্রলোক বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক তখনই হলঘরের দরজার কাছ থেকে শিবার ভীত সন্ত্রস্ত গলা শোনা গেল, ”আশ্চয্যদা, একবার আসবেন।”
আশ্চর্য ঘটক হলঘরে গেলেন, আলো জ্বাললেন এবং এক মিনিটের মধ্যেই ছিটকে বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে ডাকলেন, ”নোটনদা, নোটনদা, এক মিনিট, একটু এদিকে আসুন।’
কৌতূহল নিয়ে সবাই হলঘরে ঢুকলেন। এককোণে শিবা জড়োসড়ো, চুরির দায়ে ধরা পড়ার মতো মুখ। ওঁরা সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে কিছুই বুঝতে পারলেন না।
আশ্চর্য ঘটক আঙুল দিয়ে হেভি পাঞ্চিং ব্যাগটাকে দেখালেন। ক্যাম্বিসের খোলের মধ্যে বালি ভরা ব্যাগটা নিথর হয়ে ঝুলছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে ব্যাগের একটা জায়গায় দুটো আঙুল ঢুকিয়ে দিতেই ঝুরঝুর করে মেঝেয় বালি পড়ল।
”অ্যা, ফেটে গেছে!” নোটনদা হাঁ করে শিবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ”তুমি ফাটিয়েছ?”
সবাই ব্যাগটাকে তন্নতন্ন পরীক্ষা করলেন। কাপড়টা খুব পুরনো নয়। মাসছয়েক আগে ব্যাগটা করানো হয়েছে। সন্দেহ প্রকাশ করে তখন ওঁরা অনেক কথাই বলেন—কাপড়ের ওই জায়গাটা পচে গেছল, ছেঁড়াটেড়া ছিল, বাহাদুরি নেওয়ার জন্য ছেলেটা কিছু একটা দিয়ে খুঁচিয়ে গর্ত করে রেখেছিল।
শিবা কাঁদো—কাঁদো হয়ে বলল, ”আমি শুধু পাঞ্চ করে গেছি, আর কিছু করিনি।”
ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর শিবা চোখে জল নিয়ে বলে, ”আশ্চয্যদা, মাইনে পেলেই আমি নতুন ব্যাগ করিয়ে দেব, ইচ্ছে করে আমি ফাটাইনি।”
”তুই একটা বলদ! ইচ্ছে করে কি কেউ ঘুসি মেরে এই ব্যাগ ফাটাতে পারে?” তারপর ভাল্লুকের থাবার মতো বিশাল দুই তালুতে শিবাকে আঁকড়ে বুকে টেনে নিয়ে আশ্চর্য ঘটক বলেছিলেন, ”সামনেই হলধর টুর্নামেন্ট, তোকে নামাব।….চালিয়ে যা শিবা, চালিয়ে যা, যত ব্যাগ ফাটাতে চাস ফাটিয়ে যা।”
