”খাঁটি মানুষ বলেই ঘেন্নায় ইউনিয়নবাজি থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তুই ওখানে পৌঁছলি কী করে?”
”কোথায়? যেহানে তুই ঘুমাইতেচিলি?”
এর পর ননী যা বলল তার সারাংশ: রিকশায় সে উৎপল, মধুমিতা এবং টুটুকে নিয়ে হুহু করে চালিয়ে ভোর হওয়ার আগেই পৌঁছে যায় ভবানী—সারের কোচিংয়ে। সার অপেক্ষা করছিলেন তাদের জন্য। কিন্তু শিবা ফিরে না আসায় তিনি খোঁজ করার জন্য বেরোতে যাচ্ছিলেন। ননীই তাঁকে আটকে রেখে ভোরের আলো ফুটতেই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
প্রথমে সে যায় শিবার বাড়ি। নিতুদা তখন বেরিয়ে গেছে। তারাময়ী ওর কাছে শিবার হদিস জানতে চাইলে তখন বিড়াল নামানোর গল্পটা তার মাথায় আসে। তারপর সে আলুরদমের ডেকচিটা রিকশায় তুলে নিয়ে—”মা কালীর কিরা ডেচকির ঢাকনা খুলি নাই।”—নিতুর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বেরিয়ে প্রথমে ভবানী—সারের কোচিংয়ে এসে শুনল, মিতা এসেছিল। ওরা ট্যাক্সিতে পাইকপাড়ায় চলে গেছে। নিতুকেও সে গল্পটা বলে এবং শিবার জন্য একবেলা ছুটির ব্যবস্থা করে নেয়। তারপর সে শিবাকে খুঁজতে বেরিয়ে, বহু ঘোরাঘুরির পর আদর্শ সম্মেলনীর ফুটবল মাঠে তাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে।
”ওস্তাদ, একবেলা ছুটির ব্যবস্থা কেন কইরলাম কইতে পারো?” ননী গম্ভীর গলায় বলল দেবদাস পাঠক রোডে ঢোকার আগে রিকশাটা থামিয়ে।
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই সে আবার বলল, ”ওস্তাদ, আইজই বিকালে লালবাগানে গিয়া প্র্যাকটিস শুরু কইর্যা দাও। নিতুদা বাইর হইলেই তুমিও বাইর হইবা। মায়েরে কইবা ডাক্তারের কাছে যাইতেচি। রোজ বিকালে প্র্যাকটিস করনের জইন্যই ছুটির এই ব্যবস্থাডা! নইলে আমি মিথ্যা কথা কইতাম না।”
মুখ ঘুরিয়ে শিবার চোখের দিকে তাকাল। জ্বলজ্বল করছে ননীর মুখ। চপল, পরিহাসপ্রবণ ভাবটা চোখে আর নেই। এই ননী যেন রিকশাওলা নয়, কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের সারথি শ্রীকৃষ্ণ! ”শিবা তোরে ফিইরা আইতে হইব। বকসিং তোর রক্তে। চার—পাঁচডারে একসঙ্গে ফ্যালাইতে পারিস আর রিংয়ে উইঠ্যা একডারে ফ্যালাইতে পারবি না? ক শিবা ক, তুই আবার ফিরবি। আমাগো পোলা ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হইতে পারে নাই, আমাগো হেই লজ্জা মুইছ্যা দিবি।”
দু’ জোড়া চোখ পরস্পরের সঙ্গে প্রায় কুড়ি সেকেন্ড ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধে রত হল। অবশেষে একজোড়া চোখ পরাজয় মেনে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বলল, ”চেষ্টা করব।”
”চেষ্টা!” চিৎকার করে উঠল ননী। ”যারা জিততে চায় তারা কহনো ‘চেষ্টা’ কয় না, তারা কয় ‘জিতুম’। হ, চেষ্টা নয়, জিতুমই।”
”জিতুম।” শিবা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীরকণ্ঠে, চোখে চোখ রেখে বলল, ”ননী আমি ফিরব, জিতব।”
শিবার মাথার থেকে সঙ্কেত তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। মুঠি দুটো পাকিয়ে সে শূন্যে পর—পর কয়েকটা ঘুসি ছুড়ল।
ঠিক সেই সময় বি টি রোড দিয়ে দ্রুত ধাবমান একটা স্কুটার ব্রেক কষে মন্থর হল। হেলমেট পরা চালক পেছনে বসা লোকটিকে বলল, ”দেবু, ওটা কে রে? শিবা না? আবার বক্সিং শুরু করেছে নাকি?”
”কই, তেমন তো কিছু শুনিনি! আচ্ছা খবর নিচ্ছি।”
চালকের হাতটা ডান কানের নীচে চোয়ালে অজান্তেই যেন উঠে এল। চোয়ালটা কঠিন হল।
।। ৮।।
”আরে শিবা না! আয়, আয়…কত বছর পরে আবার তুই এলি। …থাক, থাক, ভালভাবে বেঁচে থাক। শরীরে আর কোনও ঝামেলা নেই তো?…সব শুনেছি আমি, গুণ্ডারা মেরে তোর কী অবস্থা যে করেছিল…।”
লালবাগান জিমন্যাশিয়ামের আঠারো বছরের সচিব আশ্চর্য ঘটক শিবার প্রণাম নিতে—নিতে কথাগুলো বললেন। সারা মুখে প্রসন্ন হাসি। প্রথম দিন শিবা যেমনটি দেখেছিল, আশ্চয্যদা আজও তেমনই বয়েছেন। মিশকালো বিরাট কাঠামো, একটু কুঁজো, চিবুকে ও ঘাড়ে দু’ থাক চর্বি। সাদা ধুতি, সাদা হাফ শার্ট, বাহুতে সোনার তাবিজ, চোখ দুটি আয়ত ও কোমল।
রিংয়ের ধারে লম্বা বেঞ্চটায় দু’জনে বসল। দু’ জোড়া ছেলে রিংয়ে স্পার করছে। দড়ি নিয়ে স্কিপ করছে একজন। রিং ঘিরে দুটি ছেলে ছুটছে শূন্যে ঘুসি ছুড়তে—ছুড়তে। অ্যাসবেসটসের চাল দেওয়া হলঘরটায় কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো হেভি ব্যাগে ঘুসি মেরে যাচ্ছে একটা ছেলে। বালিভরা ব্যাগটা আকারে বছর সাত—আট বয়সী ছেলের মতো। একটি ছেলে সেটা দু’হাতে ধরে রয়েছে যাতে না দোলে।
সাধুর চোয়াল ভেঙে দেওয়ার কয়েকদিন পর শিবা প্রথম লালবাগান জিম—এ পা দিয়ে যা কিছু দেখেছিল, আজও ঠিক তাই দেখছে। তেলোহাঁড়ির মতো রবারের স্পিড ব্যাগে অনবরত ঘুসি মেরে চলেছে একজন। ওপরে—নীচে স্প্রিং দিয়ে টানা, তার মাঝখানে ব্যাগটা শূন্যে। ঘুসি খেয়ে বলটা ছিটকে গিয়েই পলকে ফিরে আসছে মুখের কাছে, সঙ্গে সঙ্গে আবার ঘুসি। অতি দ্রুত হাত চালাবার প্র্যাকটিস!
দেওয়ালে বিরাট আয়নাটার সামনে শ্যাডো করে যাচ্ছে দু’জন। নিজেদের প্রতিবিম্বের সঙ্গে একাকী লড়াই করে চলেছে তারা। ঘুসি চালাচ্ছে, ঘুসি কাটাচ্ছে, নেচে—নেচে সরে যাচ্ছে, হঠাৎ মাথাটা ডুব দেওয়ার মতো নামাচ্ছে, পেছনে হেলছে, পাশে কাত হচ্ছে।
বেঞ্চে বসে জানলা দিয়ে জিম—এর মধ্যে অনেকটা অংশ দেখা যায়। আশ্চয্যদা এইখান থেকে ভেতরে—বাইরে দু’ দিকেই নজর রাখেন। এটা শিবা টের পেয়েছিল প্রথম দিনেই। সেদিন অবাক হয়ে এখানকার ব্যাপারস্যাপার লক্ষ করতে—করতে রিংয়ের পেছনে ছ্যাঁচা বাঁশের ছ’ ফুট উঁচু বেড়ার ওধারে তার চোখ আটকে গেছল।
