”আমারে মাইরা হাতে গন্ধ কইরলে তর হাতের থাইকা আলুর দম কিন্তু খামু না। আমি নিতুদার থাইকাই নিমু।”
”কোথায় ওরা?”
”অতক্ষণে ট্যাসকিতে ভবানী—সারের কোচিং হইতে পাইকপাড়ায় মিতাগো বাড়ি পৌঁচাইয়া, হন্দেশ, রসগোল্লা বইস্যা—বইস্যা সাঁটাইতেচে।”
”শিগগির চল, মা ডেকচি নিয়ে বাড়িতে বসে আছে।” শিবা ব্যস্ত হয়ে গেঞ্জিটা পরে নিল।
”অহন নয়ডা বাজে, ডেচকি লইয়া গিয়া নিতুদার সামনে দাঁড়াইয়া কইবিডা কী? আগে সেইডা মনে—মনে ঠিক কইরা ল।” তারপর রিকশা থেকে নেমে ননী শিবাকে নির্দেশ দিল, ”নাম।”
”কেন?”
”আগে নাম তো, তারপর কইত্যাচি।”
শিবা নামতেই, সিট তুলে যাত্রীদের সামনে ঝোলাবার পলিথিনের ময়লা চাদরটা বার করে ননী বলল, ”হাসপাতালে যেভাবে রুগিরা যায়, ত্যামন কইরা এডা আপাদমস্তক গায়—মাথায় জড়াইয়া সিটে কাত হইয়া শুইয়া থাক। অরা পথে ঘুরতাসে, যদি তরে একবার দেইখা চিইন্যা ফেইলতে পারে.. নে জড়া, জড়া, গায়ে জড়া।”
পলিথিনে মাথা—মুখ ঢেকে শিবা রিকশায় কাত হয়ে পড়ল, ননী হুডটা তুলে দিল। মিনিটদশেক চলার পর রিকশা থামল। শিবার মনে হল, এত তাড়াতাড়ি তো পূর্বপল্লীতে পৌঁছনোর কথা নয়! মুখের সামনে থেকে চাদরটা সামান্য সরিয়েই সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।
রিকশাটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। নিতুদা গ্লাসের ওপর গুঁড়ো চা দেওয়া ছাঁকনিটা ধরে গরম জল ঢালতে—ঢালতে তারই দিকে তাকিয়ে। সামনে আলুর দমের ডেকচিটা।
কী ব্যাপার, ডেকচিটা পৌঁছল কী করে!
”কেন লাফালাফি করতে যাস?” নিতু বিরক্ত স্বরে ধমকে উঠল। ”কী বললেন ডাক্তারবাবু, হাত—পা ভেঙেছে?”
বুঝতে না পেরে শিবা হকচকিয়ে তাকাল নদীর দিকে। ননী ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি বলল, ”কইলেন, বোধ হয় ভাঙে নাই। তবুও পনেরো ফুট উঁচা কার্নিস থাইক্যা লাফাইছে তো, একবার খালি হাড়ের একটা ছবি তুইলবার কইচে আর দুইহপ্তা পুরা রেস্ট। ত আমি কইলাম, ডাকতারবাবু শিবা যদি পুরা রেস্ট লয় তাইলে নিতুদা একা দোকানডা সামলাইব কী কইর্যা?…তহন অনেক ভাইব্যা তিনি কইলেন, ঠিক আচে একবেলা কাম কইরব আর বাকি দিনডায় রেস্ট লইব। বড় ডাকতার তো, নামের পর বিলাতি ডিগ্রিই ছয়—সাতটা! চিকিচ্ছার কায়দাই আলাদা। কোনও ওষুদপত্তর না, মলম—ইনজেকশান না, কইয়া দিলেন শুদ্দ রেস্ট।”
”কী দরকার ছিল তোর, অত রাত্তিরে জানলার ওপর থেকে বেড়াল—বাচ্চচা নামাতে যাওয়ার? …সারারাত আমি আর মা ভেবে মরি!” কাজের মধ্যেই নিতু গজগজ করতে লাগল। ”এখন চুপ করে বসে থাক এখানে। পায়ের রেস্ট মানে দাঁড়ানো উচিত নয়।”
”রিসকায় বইসা আছে, ওহানেই থাউক, আমি বরং অহন ওরে বাড়ি লইয়া যাই। তোমার লগে হগালে যে কথাডা হইল নিতুদা, মনে আছে তো?”
”মনে আছে মানে?” নিতু বিরক্ত হয়ে বলল, ”তুই বিকেলে এসে শিবার বদলে কাজ করবি আর আমি তোর সেই কাজ নেব?”
”আহা রাগ করো ক্যান। বিড়াল—বাচ্চচাটা নামাইতে আমিই তো অরে উসকাইয়া ছিলাম। দোষ তো আমারই। দুপুর থাইকা বিড়ালডা জানলার উপর। ডাকতারবাবুর মাইয়া কান্নাকাটি করতা আছিল। তাই দেইখা আমিই শিবারে খোঁচাইলাম, দ্যাখ নামাইয়া আনতে পারস কিনা। তয় একডা কথা নিতুদা, ডাকতারবাবু ভদ্দর লোকই, রাইতে তিনি শিবারে বাড়িতে রাইখা সেবাযত্ন করচ্যান। আমার মনের মইধ্যে একটা খচখচানি তহন থাইকাই কইরত্যাচে—ইয়ের জন্য দায়ী তো আমিই। শিবা তো সাদাসিদা মানুষ, তার ক্ষতি তো আমিই কইরাচি।…না না নিতুদা, অর আধা কাম আমিই করুম, তুমি না কইরো না।” চোখে জল এনে, গলা কাঁপিয়ে ননী ঝপ করে বসে নিতুর পা জড়িয়ে ধরল।
”অ্যাই, অ্যাই, এ কী হচ্ছে! ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুইই আদ্ধেক কাজ করবি।” নিতু আপ্লুত হয়ে ননীকে দু’ হাতে দাঁড় করাল। ”ডেকচিটা—আনা—নেওয়া শুধু এইটুকু করে দিস। তা হলেই হবে। তোকেও না, শিবাকেও না, কাউকেই আমার দরকার নেই। রিকশা চালানো বন্ধ করে লোকসান করবি, তাতে আমার মনেও তো খচখচানি শুরু হবে।”
শিবার কাছে পুরো ব্যাপারটাই হেঁয়ালির মতো প্রথমে ঠেকছিল। এইবার কুয়াশাটা যেন রহস্য থেকে কিছুটা কাটছে। ডেকচিটা সকালে বাড়ি থেকে ননীই তা হলে এনে দিয়েছে। রাতে বাড়িতে না ফেরার জন্য কোনও এক কাল্পনিক ডাক্তারের মেয়ের বেড়াল—বাচ্চচা পাড়া এবং পাড়তে গিয়ে পায়ে চোট আর সেজন্যই বাড়ি ফিরতে না পারা! কৃতজ্ঞ চোখে ননীর দিকে তাকিয়েই শিবার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ননীর বরাভয় দানের পাঞ্জায় চারটে আঙুল উঠে রয়েছে। সারা মুখে নধর একটি হাসি ছড়ানো।
”দাদা, ননীর…ইয়ে,” শিবা ঠিক গুছিয়ে কথাটা বলতে পারছে না।
”আমার আবার কী!” ননী খুবই অবাক হয়ে শিবার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই কিছু একটা মনে পড়ার মতো ভাব করে বলল, ”অ্যাঁযাঁঅঅ, হগালে আমি কী খামু তাই নিয়া তুই ভাবতাচস? আরে দূর পাগল, নিতুদারে এসব কওন লাগে না। চাইরডা আলু আর একডা পাউরুটি, এ তো নিতুদা আসামাত্রই দিব।”
”নিশ্চয় দেব। ননী, খাওয়ার ব্যাপারে তুই একদম নিশ্চিন্ত থাকবি।” নিতু শশব্যস্তে বলে উঠল। ”তুই চারটের সময় আসবি, আটটা পর্যন্ত থাকবি, ওই সময়টায়ই আমার একটু হেলপ দরকার হবে। সেজন্য তোকে পাঁচটাকা রোজ দেব।”
রিকশায় শিবাকে নিয়ে পূর্বপল্লীতে ফেরার সময় ননী বলল, ”তর ভাগ্যি ভাল অমন এক ভাই পাইচিস। খাঁটি মানুষ, লোক ঠকাইয়া পয়সা করে না।”
