হাঁটু থেকে পায়ের নীচের দিক তার পাথরের মতো ভারী লাগছে। সে পা টেনে—টেনে কিছুটা হেঁটে আর পারল না। শরীরটা দুলছে, মাথার মধ্যে কামড়ে ধরছে যন্ত্রণা। ঠাণ্ডা জল শরীরটা জুড়িয়ে দেওয়ায় এখন তার শরীরে বিছিয়ে যাচ্ছে আলস্য।
রাস্তাটা ফাঁকা—ফাঁকা, বাড়িগুলো দূরে—দূরে। একটা ছোট মাঠের মতো, মাঝখানে ঝাঁকড়া ডালপালা নিয়ে একটা গাছ। শিবা এগিয়ে গেল গাছটার দিকে। গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসল। ভোরের হাওয়ায় শীত—শীত লাগছে। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠছে।
ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। শিবা জোরে মাথা ঝাঁকাল। ননী ওদের নিয়ে ঠিকমতো পৌঁছতে পেরেছে কি না কে জানে! সে আকাশের দিকে মুখ তুলল। গাঢ় অন্ধকারটায় এখন ছাই—ছাই রং ধরেছে। একটু পরেই ভোর হবে। একটা দিন থেকে আর—একটা দিন…জীবনের একটা সময় থেকে আর—একটা সময়…।
হঠাৎ শিবা সোজা হয়ে বসল। …আশ্চর্য, সবই তো ঠিকঠাক রয়েছে।…সেই ফুটওয়ার্ক, সেই হুক, আপার কাট, রাইট ক্রস! কিছুই তো সে ভোলেনি, কিছুই হারায়নি।
মনে পড়ছে জীবনের প্রথম ঘুসিটা! শিবা অবাক হয়ে আকাশে তাকাল। পাশে একটা দোতলা বাড়ির পাঁচিল। এটা বোধ হয় খেলার মাঠ। আবছাভাবে গোলপোস্ট দেখা যাচ্ছে। তার মনে পড়ল, দেবুর পেট লক্ষ্য করে প্রথম ঘুসি, তারপরই ডান হাতের মুঠো নীচের থেকে ওপরে উঠল থুতনিতে। দেবু দেওয়ালে ছিটকে গিয়ে খালি বস্তার মতো ঝরে পড়ল মেঝেয়। তিন—চার সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল।
তারপর একটা খ্যাপা গোরিলার মতো সাধু দু’ হাত ছড়িয়ে এগিয়ে এল। এক পা পিছিয়ে সরে যাওয়ার জন্য শিবা জলপোকার মতো নড়াচড়া করল ডাইনে—বাঁয়ে। সাধুর দুটো হাত হাতুড়ির মতো নেমে এল শিবার দুই কাঁধের দিকে। বিদ্যুৎগতিতে হাঁটু ভেঙে শরীরটা নামিয়ে নিয়ে আঘাতের ধাক্কাটা কমিয়ে নিতে—নিতেই সে পাশে সরে গেল। কিন্তু বাঁ কাঁধটা এড়াতে পারেনি সাধুর ডান মুঠোর আঘাতটা। অসাড় হয়ে গেল বাঁ কাঁধ।
সাধু আবার জোড়া মুঠো তুলেছে। ‘মারো’—সঙ্কেতটা ডান হাতে পৌঁছনো মাত্র ঘুসিটা বেরিয়ে এসে সাধুর বাঁ কানের নীচে চোয়ালে বসে গেল। সাধুর চোখদুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে বিস্ময়ে কিংবা আঘাতের ধাক্কায়। তোলা দুটো হাত ধীরে—ধীরে নেমে এল। তারপরই শিবার দুটো ঘুসি পাঁজরের দু’ধারে ‘ঢপ ঢপ’ শব্দ তুলল। দু’ হাতে বুক চেপে সাধু ধীরে—ধীরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল।
তখন তার মাথার মধ্যে কিছু নেই, একদম খালি। শুধু সোঁ—সোঁ বাতাসের শব্দ। সে বুঝতেই পারছিল না দু’ মিনিটের মধ্যে কোচিংঘরের মধ্যে নিঃশব্দেই প্রায় কী ঘটে গেছে। …ভোররাতে গাছতলায় বসে সেদিনের মতো শিবা বুঝতে পারছে না, জোনাকি—ফ্যাক্টরি—পাঁচিলের ধারে, নিঃশব্দেই বলা যায়, সে কি ঘটাল!
সেদিন ছুটে এসেছিল অনেকে। প্রথমে বটকেষ্ট এসে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে, কুঁজো হয়ে বসা ভবানী—সার, দেওয়ালে নেতিয়ে থাকা দেবু, হাতে ভর দিয়ে মেঝে থেকে ওঠার চেষ্টা করা সাধু, আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা শিবাকে দেখে চিৎকার করে মাথা চাপড়ে বলেছিল, ”সব্বোনাশ হয়ে গেছে গো, এবার আমরা মারা পড়ব গো! আর আমাদের রক্ষে নেই। শিবা আমাদের সব্বোনাশ করেছে।”
”কী হল বটকেষ্ট, চ্যাঁচাচ্ছ কেন?”
”বটাদা, কীসের সব্বোনাশ?”
”বটুবাবু, কে মারা গেল?”
সবশেষে হাউহাউ করে উঠে সুপ্রভা বলেছিলেন, ”ওগো, আমি কোথায় যাব গো!”
ঘরের মধ্যে অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখতে—দেখতে জমে ওঠা ভিড়ের মধ্যে কে ফিসফিস করে প্রথম বলেছিল, ”শিবা, আমাদের শিবা করেছে!”
”শিবা, চায়ের দোকানের ছেলেটা?”
সাধু কথা বলতে গিয়ে, ”আহহ” বলে গাল চেপে ধরল। তারপর ইশারায় জানাল, সাইকেল রিকশা চাই। ননী তখন বলেছিল, ”এই দুডারে রিকশা কইর্যা আমিই পৌঁছাইয়া দিমু।”
.
রিকশাটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। শিবার মুখের ওপর ননীর ছায়া। চোখ পিটপিট করে দু’ধারে তাকিয়েই শিবা ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। গাছতলায় কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল!
প্যান্ট থেকে ধুলো ঝাড়তে—ঝাড়তে বোকার মতো হেসে শিবা বলল, ”তুই। …ক’টা বাজে? …ইসস বেলা হয়ে গেছে, দাদা বসে আছে দোকানে আলুর দমের জন্য, আর আমি কিনা…তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চল আমায়।”
শিবা প্রায় ছুটে গিয়েই রিকশায় বসল। তারপরই মনে পড়ায় উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ”ওদের ঠিকমতো নিয়ে গেছিস তো?”
প্যাডেল করতে—করতে ননী বলল, ”তর হারগোর ঠিক আচে তো?”
”যা বলছি তার জবাব দে।” শিবা ঝাঁঝিয়ে উঠল। ”ওরা কোথায় এখন?”
”বোধ হয় অহন কোয়ার্টারেই। পথেই ধরা পইরা গ্যালাম আন্ধারে ওত পাইত্যা কয়েকজন যে বইসা আছে, তা আর ক্যামন কইরা জানুম… আমারে কয়ডা চরচাপ্পর মাইরা কইল ভাগ, নয়তো খতম কইরা ফ্যালামু। এই বইলা অগো নামাইয়া লইয়া গেল।” ননী নিস্পৃহ স্বরে কথাগুলো যখন বলছে, শিবার অবস্থা তখন বজ্রাহতের মতো।
”এত কাণ্ড করে শেষে কিনা—”। দুঃখে, মর্মবেদনায়, হতাশায় শিবার স্বর আটকে গেল। মাথা নিচু করে সে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল ঝরল।
ব্রেক কষে রিকশাটা থেমে যেতেই শিবা মুখ তুলল। ননী হাসছে। কয়েক সেকেন্ড তার সময় লাগল হাসির অর্থটা বুঝে নিতে। তারপরই, ”ছুঁচো কোথাকার, ছারপোকা কোথাকার…।” হাত বাড়িয়ে শিবা ননীর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল।
