বাঁচার প্রেরণা সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হলে। সেদিনে ছিল দেবুর ছোরা, আর এখন তাকে ঘিরে রড আর লাঠি। ওদের উদ্দেশ্যটা একই—তাকে খুন করে ফেলা। সেদিনের মতোই, মাথা থেকে একটা সঙ্কেত তার স্নায়ুতন্ত্রী মারফত বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে, ”শিবা, বাঁচা নিজেকে।”
দেবুর ছোরাটা তার তলপেট লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে—একটা রড উঁচু থেকে মাথায় নেমে আসছে—প্রায় দশ ইঞ্চি ঝকঝকে একটা ইস্পাতের ফলা—প্রায় দু’ হাত লম্বা কালো একটা লোহার রড—আসছে, আসছে, এক সেকেন্ডও লাগবে না দু’ মিটার বাতাস কেটে ছোরাটার এগিয়ে আসা।
সেদিনের মতোই শিবার এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় শুধু লাগল নেমে আসা রডের পথ থেকে নিজেকে বিঘতখানেক সরিয়ে নিতে। তার কাঁধ থেকে রডটা পিছলে জমিতে ঠোক্কর খেল আর মারার ঝোঁকে লোকটার মাথা নেমে গেল।
সেদিন বে—টাল দেবুর মুখটাও ঠিক এইভাবে তার দিকে এগিয়ে এসেছিল। স্নায়ুকেন্দ্র থেকে সঙ্কেত পৌঁছে গেল বাঁ হাতে—মারো। দেড় ফুট দূরে ছিল দেবুর বুক আর পেট। কনুইটা সামান্য পেছনে টেনে পলকে সে ওর পেট লক্ষ্য করে বাঁ হাতের মুঠোটাকে স্প্রিংয়ের মতো ছেড়ে দিয়েছিল।
রড হাতে লোকটা মাথা তোলামাত্র শিবা বাঁ হাতের হুকটা তার ডান চোয়াল রাখল। ‘আঁক’ শব্দটার পরই জমিতে একটা ভারী জিনিস পড়ার শব্দ হল। তারপরই শিবা দুই মুঠো মুখের কাছে ধরে তিন পা পিছিয়ে এসে নাচ শুরু করল যেভাবে বক্সিং রিংয়ে প্রতিপক্ষকে ঘিরে সে নাচত।
তিনটে লোক প্রথমে হকচকিয়ে গেল শিবায় এহেন কাণ্ড দেখে। তাদের একজন পাশ থেকে রড চালাল। শিবার বাহুর এক হাত দূর দিয়ে সেটা অর্ধচক্রাকারে বেরিয়ে গেল। দড়িতে স্কিপ করার মতো জমি থেকে সামান্য লাফিয়ে—লাফিয়ে শিবা সরে—সরে যাচ্ছে শরীরটা দুলিয়ে ক্রিকেট ব্যাট ধরে পুল করার ভঙ্গিতে, ওরা রড তুলে পা—পা এগিয়ে এল।
ডান দিকের লোকটা। শিবা বেছে নিল ওকেই। রড ধরা হাতটা বেশি নামিয়ে রাখার জন্য রডের মাথাটা জমির দিকে। ওটা তুলে নিয়ে পেছন দিকে টেনে তারপর সামনে চালাতে গেলে, অন্তত এক সেকেন্ড বেশি সময় খরচ হবে। ওই এক সেকেন্ডেই ফয়সলা হয়ে যাবে।
শিবা এক পা, দু’ পা, তিন পা এগোল নাচ না থামিয়ে। বাঁ দিকের লোকটা দাঁত চেপে একটা শব্দ করে হাতের রড তুলল। শিবা জানে দু’ হাত লম্বা কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করতে হলে আঘাতের জিনিসটাকে অন্তত তিন থেকে আড়াই হাত দূরে থাকতে হবে। ওই তিন হাতের মধ্যে ঢুকে লোকটার শরীরের কাছে চলে যেতে পারলে—।
ভাবার সঙ্গে—সঙ্গেই শিবা ডান দিকের লোকটাকে যেন মারতে যাবে এমন একটা ভান দেখাতে, ডান দিকে শরীর হেলিয়েই ছোবল মারার মতো পলকে বাঁ দিকে সরে, তিন হাত গণ্ডির মধ্যে ঢুকেই লেফট হুক করল। ঠিক ডান কানের নীচে চোয়ালের গোড়ায়—ফ্রাঙ্ক গোমস বলেছিল, ‘ইউ হ্যাভ আ বিউটিফুল লেফট হুক’—ঘুসিটা জমে গেল।
ঘুসির পরিণতিটা জানার জন্য শিবা চোখের কোণ দিয়েও তাকাল না। ঘুসিটা শেষ করার সঙ্গেই সে ডাইনে নজর ঘুরিয়েছে। ডান দিকের লোকটার রডের মাথা জমি থেকে উঠছে।
”হঅঅঅ…উউউ।” বিকট স্বরে সে এক ডাকাতে চিৎকার করেই লোকটার এক হাতের মধ্যে ছিলে—ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল। অবশ্যই হকচকিয়ে গেছল লোকটা এবং তারপরই কম্বিনেশন পাঞ্চ—এর ওয়ান—টু—থ্রি, ওয়ান—টু—থ্রি তার দুই চোয়ালকে ও সংবিৎকে অবশ করে দিল। টলতে—টলতে দু’ পা পিছিয়ে গিয়েই লোকটি উবু হয়ে বসল এবং কাত হয়ে জমিতে গড়িয়ে পড়ল।
তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া রডটা তুলে নিয়ে শিবা অবশিষ্ট লোকটিকে চাপা গলায় বলল, ”এবার তোর পালা।”
দূর থেকে আসা ফ্যাক্টরির আলোয় চোখমুখের ভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু লোকটির ভঙ্গিতে ধরা পড়েছে, প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে।
”না, না, আমি না—” বলার সঙ্গেই লোকটা পেছন ফিরে অবিশ্বাস্য গতিতে দৌড়তে শুরু করল ”ডাকাত, ডাকাত” চিৎকার তুলে।
একটা হইচইয়ের শব্দ গেটের দিক থেকে উঠল। শিবা বুঝে গেল, দল বেঁধে এবার ওরা আসবে, আর এখানে থাকা নয়। সে ছুটে গেল পাঁচিলের কাছে। লাফিয়ে পাঁচিলের মাথা ধরে হিঁচড়ে নিজেকে তুলে একটা পা রেখে পাঁচিলে উঠে বসেই দেখতে পেল কিছু লোক ছুটে আসছে। ইটের বড় একটা খণ্ড শিবার হাতচারেক দূরে পাঁচিলের গায়ে এসে লাগাতেই টুক করে সে ওধারে লাফিয়ে যে রাস্তায় ননীর রিকশাটা গেছে, সেইদিকে ছুটতে শুরু করল। ভাঙা ইট, পাথরকুচি, গর্ত করা রাস্তা তার খালি পা—দুটিকে ব্যথায়, যন্ত্রণায় নাজেহাল করতে লাগল।
মিনিট কয়েক ছোটার পর তার মনে হল, কেউ আর তাড়া করে আসবে না। অন্ধকারে এভাবে ছোটা বা হেঁটে যাওয়াও বিপজ্জনক। তাকে চোর ভেবে যদি কেউ চেচিয়ে ওঠে, যদি কুকুরে তাড়া করে! পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার ঘটনা তো এখন চারদিকেই ঘটছে।
একটা পুকুরের ধার দিয়ে যেতে—যেতে সে অসম্ভব ক্লান্তি বোধ করল। জল দেখে তার ইচ্ছা হল স্নান করে তাজা হয়ে নেওয়ার। অন্ধকারে সে আঘাটাতেই, গেঞ্জি খুলে জলে নেমে পড়ল। গলা পর্যন্ত শরীর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। চার বছর সে এই ধরনের পরিশ্রম করেনি। এই ধরন বলতে, বক্সিং। প্রায় এক রাউন্ড সময় সে ব্যয় করেছে পাঁচটা লোকের সঙ্গে। সেইসঙ্গে উদ্বেগ, ভয় আর উত্তেজনার ধকল যোগ করলে—! পুকুর থেকে টলতে—টলতে সে উঠল। তার সারা দেহে পানা, দু’পায়ে পাঁক।
