টুটুকে কোলে নিয়ে মধুমিতা দৌড়ল পাঁচিলে ঝোলানো কাছিটা লক্ষ্য করে। তার পেছনেই শিবা এবং উৎপল। বড়—বড় ঘাসের মধ্যে একটি ঢিপি, দেখে বোঝা যায় না। মধুমিতা হোঁচট খেয়ে টুটুকে নিয়েই ঘাসের ওপর পড়ল। ভয়ে এবং আঘাত পেয়ে টুটু এবার জোরেই কেঁদে উঠল। ওকে এক ঝটকায় কোলে উঠিয়ে শিবা ছুটে গেল পাঁচিলের দিকে।
”ননী একে তুলে নে।”
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, শীর্ণ দুটি হাত টুটুকে তুলে নিয়েই মুহূর্তে পাঁচিলের ওপাশে অদৃশ্য হল। টুটুর কান্না বেড়ে তখন আরও উচ্চগ্রামে উঠছে।
”দিদি কাছিটা ধরুন, কাঁধে উঠুন।” শিবা উবু হয়ে বসেই দ্রুত নির্দেশ দিল। আর সেই সময়ই টর্চের আলো এসে পড়ল এবং চিৎকার শোনা গেল, ”কে ওখানে, কে?…আরে পালাচ্ছে, ওরে দৌড়ে আয়, ম্যানেজার পালাচ্ছে।”
মধুমিতাকে কাঁধে নিয়ে শিবা সোজা হয়ে দাঁড়াল। পাঁচিলের ওপর সে উঠে বসতেই ননীর অনুত্তেজিত গলা শোনা গেল, ”আমার হাতডা ধরেন…রিসকাডা পায়ের নিচেই, নাইম্যা পড়েন।”
চারটে লোক ছুটে আসছে। হাতে লাঠি আর রড। ওরা চিৎকার করছে, ”পালাচ্ছে, পালাচ্ছে, ধর, ধর, ধর,…পিটিয়ে লাশ ফেলে দেব।”
”দেখছেন কী হাঁ করে? উঠুন।” উবু হয়ে বসে, শিবা অধৈর্য স্বরে ধমক দিল।
”তুমি?”—ইতস্তত করল উৎপল।
”ধ্যাত তুমি, আগে নিজে বাঁচুন তো।”
কাছি আঁকড়ে উৎপল কাঁধে পা রেখে দাঁড়াতেই শিবা সোজা হয়ে উঠল। উৎপল চটপট ওধারে যখন নেমে যাচ্ছে ঠিক তখনই শিবার পিঠে প্রথম লাঠিটা পড়ল।
রিকশার সিট আর হ্যান্ডেল ধরে ননী তৈরিই ছিল। প্রায় পনেরো মিটার রিকশাটা নিয়ে দৌড়ে, লাফিয়ে উঠেই সে দেহটিকে খাড়া রেখে, সামনে ঝুঁকে, সিট থেকে পাছা তুলে প্রাণপণে প্যাডেল করতে শুরু করল।
শিবা যে ভেতরে রয়ে গেল।” উৎপল চাপাগলায় আর্তনাদ করে উঠল। ”পাঁচটা লোক, হাতে ডাণ্ডা!”
ননী গ্রাহ্য করল না কথাগুলো। জোনাকির পেছনের পাঁচিল ঘেঁষে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে মিনিটখানেক যাওয়ার পর তার প্যাডেল করার গতি বাড়ল।
”অহন চুপ থাহেন। শিবারে লইয়া আপনার ভাইববার দরকার নাই, নিজেদের কথাডা ভাবেন।”
এর পরই রিকশা প্রচণ্ড গতিতে বাঁ দিকে ঘুরে কলোনির ইট বাঁধানো সরু রাস্তায় ঢুকল। ঘুটঘুটে অন্ধকার, একতলা ছোট—ছোট বাড়িগুলোকে ভূতুড়ে মনে হয় যেন, ভাঙাচোরা রাস্তায় রিকশা ছোটার ধড়ধড় শব্দে ঘুম ভেঙে ছুটে আসা কুকুরের চিৎকার পেছনে রেখে রিকশাটা অন্তত সাত—আটবার পথ বদল করে ইলেকট্রিক আলো জ্বলা একটা পিচের রাস্তায় উঠল। আরোহীরা নির্বাক, টুটু কান্না বন্ধ করে মাকে জড়িয়ে। তাড়া করে তাদের ধরতে যাতে না পারে ননী সেইজন্যই অনেকটা ঘুরে এসেছে। এখান থেকে বিটি রোড আরও আধ মাইল।
”চালাইলাম ক্যামন, কন?”
ঢোক গিলে উৎপল বলল, ”দারুণ! ভাবাই যায় না তোমার পায়ে এত জোর আছে!”
প্যাডেল ঈষৎ মন্থর করে, মাথা ঘুরিয়ে ননী বলল, ”আমার পায়ের থাইক্যাও শিবার হাতের জোর বেশি। ও যদি বক্সিং ভুইল্যা না যায় তাইলে লোকগুলার কপালে আইজ দুঃখ আচে। মাইর যেমন খাইতে পারে তেমনি দিতেও পারে। মুস্কিলডা হইল কি, শিবার তো অহন কোনও প্র্যাকটিসই নাই!”
ক্ষীণ স্বরে অতঃপর মধুমিতা জানতে চাইল, ”আমরা এখন যাচ্ছি কোথায়?”
”ভবানী—সারের বাসায়। আপনার বুইনরে ওখানেই হগালে আইবার কইচি।”
এর পর ননী কুঁজো হয়ে হ্যান্ডেলের ওপর ঝুঁকে পা দুটোকে পিস্টনের মতো ওঠানামা করাতে শুরু করল।
।। ৭।।
লাঠিটা পিঠের ওপর আসছে, চোখের কোণ দিয়ে শিবা তা দেখেই পিঠের পেশিগুলো শক্ত করে ফেলেছিল। লাঠিটা পড়ার সঙ্গে—সঙ্গেই সে ঘুরে ডান হাত বাড়িয়ে মুঠোর মধ্যে সেটা পাওয়ার চেষ্টা করেও পেল না। একটা রড তার মাথা তাক করে চালিয়েছিল যে—লোকটি, সে খুবই নিশ্চিত ছিল সেটা শিবার খুলি দু’ ফাঁক করে দেবে। রড চালিয়েই সে ঝুঁকে পড়েছিল। শিবা একটা রাইট ক্রসকে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ার মতো বাঁ হাত তুলে রডটাকে পুরো বাহুর পেশির ওপর নেওয়ার সঙ্গেই ডান হাতে আপার কাট চালাল। দু’ পাটি দাঁতের মধ্যে প্রবল সঙ্ঘর্ষের এবং আঘাতজনিত যন্ত্রণা পাওয়ার শব্দ হল। লোকটা ছিটকে পড়েই থুতনি চেপে ধরল দু’ হাতে।
বহু দিন, বহু মাস পর শিবা হাড়ের সঙ্গে হাড়ের, হাড়ের সঙ্গে পেশির ধাক্কা লাগার শব্দটা পেল। তার ঘাড়ের রোম খাড়া হয়ে উঠেছে। একটা বাঘ যেন তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরটা চাটছে আর ক্রমশ সে নিজেই বাঘ হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক এইরকম একটা বোধ সেদিন তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। ”ছেড়ে দাও সারকে” বলার সময় মাথার মধ্যে গরগর করে উঠেছিল একটা খ্যাপা রাগ। দমকে—দমকে সেই রাগটা ফুলে উঠে তাকে ঠেলে দিয়েছিল ফেটে পড়ার জন্য। এগিয়ে গিয়ে সে সাধুর ঘাড় ধরে ধাক্কা দেয়। ওর সঙ্গী দেবুর হাতে একটা ছোরা তখন ঝলসে উঠেছে। ভবানী—সার কবজি ধরে উবু হয়ে, ছোরাটা সাপের ফণার মতো দোলাতে—দোলাতে দেবু এক পা—দু’ পা এগোল। শিবা একদৃষ্টে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে। এক পা—দু’ পা পিছিয়ে গিয়ে সে দেওয়ালে বাধা পেল। আর তার পিছু হটার উপায় নেই। ডাইনে দেওয়াল, বাঁয়ে খোলা দরজা। ছুটে বেরিয়ে যাওয়া যায়। পালাবে? তার মাথার মধ্যে একটা কথাই ঝনঝন করছে, ”বাঁচতে হবে, বাঁচতে হবে।”
