সাধুর মুখ টসটস করছে উত্তেজনায়, কপালে ঘাম ফুটছে। একদৃষ্টে সে সারের মুখের দিকে তাকিয়ে। হাতের পেশিগুলো আরও কঠিন হচ্ছে।
সারের মাথাটা এবার ধীরে—ধীরে সামনে ঝুঁকে পড়ছে। ঠোঁট দুটি ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। থরথর করতে—করতে তাঁর দেহ কুঁজো হয়ে গেল। ”আহহ, আহহ, আমি নুইব না, কিছুতেই না, ওহহ… পারবে না, আমাকে দিয়ে অন্যায়, অধর্ম—”
এর পর শিবা নিজেও জানে না কখন সে কোচিংঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। সাধু মুখ ফিরিয়ে তাকে শুধু দেখল মাত্র। তখন ভবানী—সারের কবজিটা তার মুঠোর মধ্যে ধরা।
শিবা বলল, ”ছেড়ে দাও সারকে।” বাঘের গর্জনের আদল ছিল তার স্বরে।
.
পাঁচিল থেকে একটা বেড়ালের মতো লাফিয়ে শিবা ঘাসের ওপর নামল। ফ্যাক্টরি ঘিরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কোয়ার্টারের পেছনে অন্ধকার, সামনে আলো। এতে তার সুবিধেই হবে। গুঁড়ি মেরে সে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে অতি দ্রুত এগোল পেছনের জানলা লক্ষ্য করে।
জানলার নীচে উবু হয়ে বসে সে বোঝার চেষ্টা করল ঘরে কেউ জেগে আছে কি না। কোনও সাড়াশব্দ নেই। খোলা জানলার কাচে সে তিনটে টোকা দিল। সাড়া নেই। এবার একটু জোরেই টোকা দিয়ে সে ফিসফিসিয়ে ডাকল, ”উৎপলবাবু, উৎপলবাবু।”
”কে? কে?” সন্ত্রস্ত চাপা পুরুষ গলা।
”ভয় পাবেন না, জানলায় আসুন, আমি পারমিতার বন্ধু।” শিবা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে গলা নামিয়ে বলল।
একটা ছায়ামূর্তি সন্তর্পণে জানলার দিকে এগিয়ে এসে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। ”কে? কে আপনি?”
”আমার নাম শিবা। মিতা, পারমিতা আমার বন্ধু। আপনাদের তিনজনকে কোয়ার্টার থেকে বার করে নিয়ে যেতে এসেছি।”
একটা সন্দিগ্ধ নীরবতা। কোনও উত্তর এল না। ঘরের মধ্যে চাপা গলায় দু’জনের কথা বলার শব্দ শোনা গেল। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছে। শেষরাতে জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে কোনও অপরিচিত লোক যদি বলে, ”বার করে নিয়ে যেতে এসেছি” তা হলে চট করে তাকে বিশ্বাস করা শক্ত, উচিতও নয়।
”আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। ওরা আপনার টেলিফোন আর ইলেকট্রিক লাইন কেটে দিয়েছে, কাল থেকে কলের জলও পাবেন না। দরজায়ও তালা মেরে দিয়েছে। আপনাকে ওরা রিজাইন করতে বাধ্য করাবেই। আপনার ছেলে টুটু, যার হাম হয়েছে, তাকে বাঁচাবার কথা ভাবুন।” শিবা প্রায় মিনতির সুরে কথাগুলো বলল।
আবার ঘরের মধ্যে চাপা কথাবার্তা শোনা গেল। শিবা আবার বলল, ”মিতা ভবানী—সারের কোচিংয়ে পড়ত, আমি তার কাছাকাছিই থাকি। একদিন এক গুণ্ডা সারকে মারবার জন্য কোচিংঘরে ঢুকেছিল। তারপর থেকে ও আর পড়তে যায়নি।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ,” ঘরের মধ্যে নারীকণ্ঠে শোনা গেল, ”ঠিকই, পারো তারপর আর যায়নি। শিবা নামে একটা ছেলে গুণ্ডাটাকে নাকি—”
”দিদি, আমিই সেই শিবা। নির্ভাবনায় আপনারা আমার সঙ্গে আসতে পারেন।”
”তুমিই সেই বক্সার?” উৎপল জানতে চাইল।
‘হ্যাঁ বলতে গিয়ে শিবার জিভ আটতে গেল। বলল ”আগে ছিলাম। কিন্তু আপনারা আর দেরি করবেন না।”
”কীভাবে যাব? বাড়ির সামনে লোক, গেটেও লোক।”
”পেছনের পাঁচিল টপকে বেরিয়ে যাব। আপনারা ছাদ থেকে নামবেন। নিচু ছাদ, পা রাখারও জায়গা আছে। দিদিকে আর টুটুকে আমি নামিয়ে নেব। দরকারি জিনিস যা নেওয়ার, সঙ্গে নিন। একটা কাপড় নিন ছাদ থেকে ধরে নামবার জন্য। তাড়াতাড়ি করুন। পাঁচিলের বাইরে আমার বন্ধু ননী সাইকেল রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেরি করবেন না। একবার সামনের জানলা দিয়ে দেখে নিন তো লোকগুলো কী করছে।”
উৎপল আর মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে বলল, ”দু’জন মাত্র চ্যাটাইয়ে শুয়ে রয়েছে, ছিল তো পাঁচ—ছ’জন!”
”সব দরজা—জানলা বন্ধ করে এবার ছাদে চলে যান। টুটু কি ঘুমোচ্ছে? দেখবেন যেন কেঁদে না ওঠে।”
টুটু কেঁদে ওঠেনি। ছাদের পাঁচিল ডিঙিয়ে কার্নিসে পা রেখে, পাকানো বেড কভারটা ধরে মধুমিতাই প্রথমে নামল জানলার ওপরের ছাঁচায়। শাড়ি পালটে সালোয়ার—কামিজ পরে নেওয়ায় তার সুবিধেই হয়েছে।
”দিদি, কাপড়টা শক্ত করে ধরে থেকে এবার বসুন, পা দুটো ঝুলিয়ে আমার কাঁধে রাখুন, না, না, লজ্জা করবেন না, তাড়াতাড়ি।” জমিতে দাঁড়িয়ে শিবা জরুরি তাড়া দিল।
কাঁধে দাঁড়ানো মধুমিতাকে নিয়ে শিবা ধীরে ধীরে উবু হয়ে বসল। মধুমিতা কাঁধ থেকে ছোট্ট লাফে জমিতে নামল। উৎপল বেডকভারটা ধরে আছে ছাদে। শিবা এবার ছাঁচার ওপর উঠে বলল ‘টুটুকে নামিয়ে দিন আমার হাতে।”
অসুস্থ, সদ্য ঘুমভাঙা বাচ্চচার অন্ধকারের মধ্যে এই ধরনের নাড়ানাড়ি পছন্দ হচ্ছে না। দু’ হাত ধরে তাকে ঝুলিয়ে দিতে সে ভয়ে কেঁদে উঠল শিবাকে জড়িয়ে ধরে।
”দিদি ধরুন।” টুটুকে সে দ্রুত নামিয়ে দিল মায়ের বাড়ানো হাতে। ”যেন না কাঁদে আর।”
উৎপল চট্টরাজ যুবক এবং মোটেই আনফিট নয়। বেডকভার টেনে ধরে থাকার জন্য ছাদে আর কেউ নেই। সেটা ছাদেই রেখে দিয়ে সে কার্নিস থেকে অবলীলায়ই ছাঁচায় দাঁড়ানো শিবার পিঠে পা দিয়ে নামল এবং বগলে একটা পলিথিনের ব্যাগ ঝুলিয়ে।
সবাই জমির ওপর। অন্ধকার থেকে ফ্যাক্টরির পাঁচিল পর্যন্ত যেতে, দূর থেকে আসা আলোয় আবছা হওয়া প্রায় কুড়ি মিটার জমি অতিক্রম করতে হবে। শিবা এগিয়ে গেল দু’ধারে তাকাতে—তাকাতে। পাঁচিলের ওপর ননীর মুন্ডুটা দেখতে পেয়ে সে হাত নাড়ল। ননী দু’ বাহু তুলে হাতছানি দিয়ে বোঝাল, বিপদ নেই, চলে এসো।
