জানলা দিয়ে ছয়জনের দিকে হতভম্ব হয়ে সে যখন তাকিয়ে, তখন ঘরের আর—এক কোণে, ভেজানো পাল্লার পাশেই একটা কণ্ঠস্বর শুনল।
”যদি হাতটা ভেঙে দি?” মৃদু, শান্ত উচ্চচারণ। শিবার মনে হল, সাধুর গলা।
উত্তর দিল না কেউ।
”কথা নেই কেন মুখে? যদি ভেঙে দিই, তা হলে অঙ্ক কষাবেন কী করে?”
”বাঁ হাত দিয়ে।”
”ওরে বাবা! দেবু শুনলি, বাঁ হাত দিয়ে উনি—”
”বাঁ হাতটাও তা হলে ভেঙে দাও।”
”দরকার নেই ওসবের। শুনুন, পরীক্ষার ক’টা দিন আপনি স্কুলে যাবেন না। এই ঘরে বসে যত খুশি অঙ্ক কষুন, কিন্তু স্কুলে যাবেন না।”
”তার মানে অন্যায়ের কাছে আমাকে মাথা নোয়াতে হবে, অধর্ম আমাকে মেনে নিতে হবে।”
ভবানী—সারের গলা। অনুত্তেজিত, গম্ভীর অথচ কঠিন। শিবার সারা শরীর শক্ত হয়ে পড়ছে। পাঁচটি ছেলে ও একটি মেয়ে একই ভাবে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে।
”অতশত বুঝি না, মোট কথা, যা বললুম তাই করবেন। বাড়িতেই থাকবেন, পরীক্ষা হয়ে গেলে স্কুলে গিয়ে চুটিয়ে মাস্টারি করবেন। কাল আপনি তিনটে ছেলের ক্ষতি করতে গেছলেন, ওদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন, অবশ্য ম্যানেজ করে নিয়েছি।”
”আমি সত্যিই দুঃখিত যে, ওদের ক্ষতি করতে পারিনি। একটা কথা তুমি শুনে রাখো, হাতই ভাঙো আর পা—ই ভাঙো, অন্যায়কে আমি প্রশ্রয় দেব না। আমার হাতের চেয়েও বড় ব্যাপার এই ছেলেদের চরিত্র, তাদের মনুষ্যত্ব। সেটা আমাকে বাঁচাতেই হবে। এভাবে স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করলেও, জীবনের পরীক্ষার তো এরা বরাবরই ফেল করবে। ঘুণ ধরে ঝাঁঝরা হওয়া মানুষ, কি পরিবারের কি সমাজের কোনও বড় কাজের দায়িত্বই তো নিতে পারবে না, ভেঙে পড়ে যাবেই।”
”বড়—বড় কথা এখন শোনার সময় নেই, ওসব ক্লাসে কপচাবেন। পাশ করলে চাকরি জুটবে, খাইয়ে—পরিয়ে সংসার বাঁচাতে পারবে, এটাই বড় কথা।” সাধুর গলা থেকে এবার রাগ বেরিয়ে এল।
”না, না, পারবে না, এটা কোনও কাজের কথা নয়। মানুষ শুধু খেয়েই বাঁচে না। তার মন আছে, চেতনা আছে, আত্মা আছে।” ভবানী—সারের গলায় ব্যাকুলতা।
”সাধু, কথাবার্তা কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?” দেবুর ধৈর্য আর অপেক্ষা করতে পারছে না।
”থাম তুই, আমাকে আত্মা দেখাচ্ছে! আত্মা তা হলে তো আমারও আছে, বলুন, আছে তো?”
সাধু এক পা পিছিয়ে দাঁড়াতেই শিবা ওকে এবার দেখতে পেল, ডান হাতটা বুকে ঠেকানো। আত্মা বোধ হয় ওখানেই থাকে। সাধুর সুন্দর মুখটা কুঁকড়ে রয়েছে রাগে, চোখ জ্বলছে। বাঁ হাতের বেতের ব্যাটনটা দিয়ে সে সামনে দাঁড়ানো কাউকে খোঁচা মারল, বোধ হয় সারকেই।
”তা হলে আমারও আত্মা আছে, বলছি আছে। এই ছেলেগুলোরও আছে, দেখবেন?”
সাধু তালুর উলটো পিঠ দিয়ে একটি ছেলের গালে আঘাত করল। ”আঁ’ বলেই ছেলেটি গালে হাত দিয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল। বিশ্বাস করতে পারছে না এভাবে মার খাবে! সংবিৎ ফিরে পেয়েই ছেলেটি খোলা দরজা দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেল। সাধু হাসতে শুরু করল।
”দেখলেন? ওর আত্মা বলল পালাও, তাই সটকান দিল।”
সাধু আর—একটি ছেলের সামনে দাঁড়াল। ডান হাতটা ধীরে—ধীরে তুলতে শুরু করতেই দু’ হাতে মুখ ঢেকে ছেলেটি ফুঁপিয়ে উঠল।
”এর আত্মা বলল কাঁদো, তাই না?” সাধু ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘরের কোণের দিকে তাকিয়ে হাসল। ”এই হচ্ছে আত্মা। শরীরের জন্যই আত্মা। এই এলাকার সব আত্মা সুযোগ—সুবিধে পাওয়ার জন্য, কাজ উদ্ধারের জন্য আমাকে তোয়াজ করে, ভয় পায়, হাতজোড় করে।” তারপর সে দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে চারটি ছেলে ও মেয়েটিকে মৃদু স্বরে বলল, ”বাড়ি যাও।”
মেঝে থেকে বই—খাতা কুড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েই ওরা বি টি রোডের দিকে প্রায় ছুটতে শুরু করল, শুধু মেয়েটিই একবার দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে পেছনে তাকায়।
জানলা দিয়ে দেখতে—দেখতে শিবার মনে হচ্ছিল, সে যেন হিন্দি সিনেমা দেখছে। পরদা থেকে একটা ভিলেন জ্যান্ত নেমে এসেছে তার চোখের সামনে। বটকেষ্টর চিৎকার ভেসে এল। চেঁচাক, এমন একটা সত্যিকারের সিনেমা ফেলে তার এখন যাওয়া সম্ভব নয়।
সাধু পা—পা এগিয়ে গেল ঘরের কোণের দিকে, মুখভরা হাসি।
”আমার আত্মা বলছে আপনার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করতে হবে, আপনার আত্মা বলছে হাত দুটো আস্ত রাখতে হবে। দুটোই সম্ভব। ঠিক বলেছি কি?”
জানলার কিনারে মুখ রেখে একচোখ দিয়ে শিবা ঘরের অন্য দিকটা দেখার চেষ্টা করল। ভবানী—সার ডান হাতটা বাড়িয়ে, মুখে পাতলা হাসি। চশমার পুরু কাচে ইলেকট্রিক আলো, বরফ কুচির ওপর রোদের মতো ঝকঝক করছে।
”হাত আমার দরকার নেই, তুমি এটা নিতে পারো, কিন্তু স্কুলে আমি যাবই।”
”যাবেনই।”
”হ্যাঁ।”
কোনও দ্বিধা নেই একফোঁটা শব্দটিতে। বাড়ানো হাতটা আর—একটু তুলে বিবেকানন্দর ছবিটির দিকে নিবদ্ধ করলেন।
”ওই মানুষটি একটি কথা বলেছেন।”
সাধু মুখ ঘুরিয়ে ছবিতে চোখ রাখল।
”বলেছেন, সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনও কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।” হাতটা নামিয়ে ভবানী—সার হেসে বললেন, ”পরীক্ষার ক’টা দিন আমি স্কুলে যাব। অন্যায় হচ্ছে দেখলে বাধা দেব।”
এবার সাধু এগিয়ে গেল। ভবানী—সারের ডান হাতের কবজি মুঠোয় ধরে চোয়াল শক্ত করল। সাধুর হাতের পেশিগুলো, আঙুল থেকে কাঁধ পর্যন্ত, ফুলে উঠে ডেলা বেঁধে গেল। সারের মুখের হাসিটা থমকে গিয়ে যন্ত্রণায় একবার কুঁকড়ে উঠল, তবে দু—তিন সেকেন্ডের জন্য। আবার হাসি ফুটল।
