”হ। বাসে তুইল্যা দিয়ে কইয়া দিচি, দু’জনায় মিল্যা রাত্রে ভাবনাচিন্তা কইর্যা একডা উপায় বাইর করবই। কাইল হগ্গালে ভবানী—ছারের কোচিংয়ে যেন আসে।”
শিবা রিকশায় উঠে বসে বলল, ”চল, যেতে—যেতে বলছি। একটা প্ল্যান করতে হবে। ননী তুই এখানকার পথগুলো সব চিনিস? জোনাকির পেছন দিকে পাঁচিলের ধার দিয়ে রাস্তাটা কোথায় গেছে জানিস?”
”সব জানি না, তয় কিছু কিছু জানি।”
”দাঁড়া, দাঁড়া, এটা কিছু—কিছু জানলে হবে না, ভাল করে জানা চাই। এখুনি তুই একটা চক্কোর দিয়ে ঘুরে দেখে আয় তো, পেছন দিয়ে বি টি রোডে বেরোবার কোনও পথ আছে কি না। আমি ওদের সামনে দিয়ে এখন যাব না, তুই যা।”
”ওস্তাদ, তোমার মতলবডা কী?”
”বলছি। ভেতর থেকে কৃষ্ণচূড়া গাছের কোনও ডাল পাঁচিলের বাইরে বেরিয়ে আছে কি না দেখছি। গেটের সামনে দুটো বালব ছাড়া বাইরে সব অন্ধকার, তবু দেখবি রাস্তায় আলোটালো আছে কি না। যা, চট করে ঘুরে আয়, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর গ্যারেজে যাব, ওখানে মোটা—মোটা দড়ি দেখেছি একধারে পড়ে আছে। হাত পাঁচেক লম্বা একটা নিতে হবে। তারপর—”
।। ৬।।
জোনাকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কস—এর পাঁচিল ঘেঁষে ননীর রিকশা যখন নিঃশব্দে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়াল, তখন রাত আড়াইটে। আরোহী শিবা। সিটের ওপর সে উঠে দাঁড়াতেই পাঁচিল ছাড়িয়ে প্রায় দু’ফুট ওপরে উঠে গেল তার মাথা। ফ্যাক্টরির পেছন দিকটা এই প্রথম সে দেখছে। দূরে জ্বলছে ইলেকট্রিক বাতি। আবছা আলো যতটা দেখা যায় তাইতে দেখল লম্বা—লম্বা ঘাস, ডোবার মতো একটা শুকনো গর্ত, প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে কোয়ার্টারটা। একতলা, নিচু ছাদ। তার মনে হল, ডান দিকের ঘরটাই শোওয়ার।
দুটো বড় জানলাই খোলা। নিশ্চয় গরম সহ্য করতে না পেরে খুলতে বাধ্য হয়েছে।
ছাদের পাঁচিল থেকে কার্নিসে নামাটা শক্ত নয়। তার দু’ হাত নীচেই জানলার ওপরে বেরিয়ে রয়েছে কংক্রিটের ছাঁচা। ওর ওপর নামতে গেলে একটু সাহায্য লাগবে। তারপর ছাঁচা থেকে মাটিতে, কাঁধে পা রেখে নেমে পড়তে পারবে। একটু মুশকিলে হবে দু’ বছরের বাচ্চচাটাকে নিয়ে।
ওটা কিছু নয়, এই ভেবে শিবার মাথাটা যখন হালকা হতে শুরু করেছে, তখনই টর্চের আলো অন্ধকার কেটে—কেটে ঘাসের ওপর খাঁড়ার কোপ দিল। শিবা চট করে নামিয়ে নিল মাথা। কোয়ার্টারের অপর দিকে কেউ একজন জেগে পাহারা দিচ্ছে, অন্ধকারে তাকে দেখা যাচ্ছে না। পাঁচিলের ওপর চোখ পর্যন্ত তুলে সে লক্ষ করতে লাগল লোকটা এখন কোথায়, ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না, এই দিকে আসবে কি না।
এল না। কোনও সাড়াশব্দ বা টর্চের আলো আর পড়ল না। তা হলেও খানিকটা সময় দেওয়া দরকার, এখনই কাজে নামা ঠিক হবে না। শিবা রিকশার সিটের ওপর বসল।
”ক্যামন দ্যাখলা?” ননী ফিসফিসিয়ে বলল।
”একজন জেগে পাহারায় রয়েছে, টর্চ নিয়ে।”
”তা হলে তো ডেঞ্জার।”
”ডেঞ্জার আবার কী, একটু টাইম দিয়ে তারপর নামব। তুই কাছিটা ওদিকে ঝুলিয়ে রাখবি। মিতার দিদি, জানি না ধরে উঠতে পারবে কি না, মিতা হলে বিনা দড়িতেই একটা ভল্ট দিয়ে উঠে যাবে, জিমন্যাস্টিক করত তো!”
”ওর দিদিও তো মিতা, পুরা নাম মধুমিতা, পারমিতারই বড় বইন। তাইলে ভল্ট দিতি পারুম না ক্যান?”
”তোর বুদ্ধিশুদ্ধি কি শুধু রিকশার প্যাডেলেই ঘুরপাক খাবে, হ্যান্ডেল পর্যন্ত ওঠাতে পারিস না? দু’ বছরের একটা বাচ্চচার মা, সে কিনা ভল্ট খাবে?….জামাইবাবুর নাম উৎপল, সেটা মনে রাখবি।”
‘পদবিটা চাটুজ্জে না রায়, কি একডা যেন কইছিল মিতা?”
”চট্টরাজ। আর মিতাকে বাড়িতে ডাকে পারো বলে। দুই বোন মধু আর পারো। কিন্তু ওকে জিজ্ঞেস করেছিলি জামাইবাবুর ফিটনেস কেমন, দৌড়তে, লাফাতে পারে কিনা?”
”জিগাই নাই। তয় দুখ্যু কইরা কইছিল, মালিকের লগে আপস ক্যইল্লে আইজ আর দিদিরে এই হ্যানস্তায় পইড়তি হইত না।”
”লোকটা খুব জেদি, মনের ফিটনেসটা দারুণ!”
”কিন্তু সংসারের ব্যাপার—স্যাপারে একদম আনফিট। ওনার উচিত আছিল রিজাইন কইর্যা, টাহাকড়ি পকেটে পুইর্যা চইলা যাওয়া। কাম জানা, ল্যাহাপড়া জানা লোক, ওনার কি চাকরির অভাব হইব?”
”তার মানে! অন্যায়কে মেনে নিতে বলছিস? অধর্মকে তুই বলছিস মেনে নিতে? একটা এত বড় ফ্যাক্টরি, কত লোক এখানে কাজ করে! এটা তুলে দেওয়া কি অন্যায়, অধর্ম নয়?”
কথাটা বলেই শিবা বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎচমক বোধ করল। মাথার মধ্যে আলোর ঝলকানি লাগল। তার মুখ দিয়ে ‘অন্যায়’ আর ‘অধর্ম’ শব্দ দুটো কী করে বেরোল? কে তুলে দিল তার মুখে? তার মাথার মধ্যে এই শব্দ দুটো বাসা বেঁধে রয়েছে কবে থেকে?
আবার একটা ঝলকানি।…শিবা দেখতে পেল জানলার একটা পাল্লা আধখোলা। ঘরের ভেতরে দেখা যাচ্ছে শুধু একটা কোণ। সে দেখতে পাচ্ছে পাঁচটি ছেলে ও একটি মেয়ে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। তারা যেন কাঠের পুতুল, কেউ নড়ছে না, শুধু সামনে তাকিয়ে। প্রত্যেকের চোখে ভয়, মুখের চামড়ার নীচে রক্ত নেই।
শিবার কেন যে ইচ্ছে হল ভবানী—সারের কোচিংটা একবার ঘুরে দেখে আসার। বটকেষ্টর দোকানে সাধু আর তার সঙ্গীকে দেখতে না পেয়ে তার মনে যে ভয় ধরল, হয়তো তাই থেকেই কৌতূহলটা তৈরি হয়।
