”আগে তুমি একটু শান্ত হয়ে দাঁড়াও দেখি। হাতের কাজ সেরে নিই।” শিবাকে বিচলিত দেখাল। দু’দিন আগে দুটো লোক খেতে—খেতে যা বলছিল, সেই কথাগুলোই তো ঘটেছে।
”এইসব শুনে কি কেউ শান্ত থাকতে পারে? আমি পেট্রল পাম্প থেকে কোয়ার্টারে টেলিফোন করি, লাইন ডেড। ভাবছি থানায় যাব।”
”যেতে পারো, কিন্তু কোনও কাজ হবে না। পুলিশ তোমার জামাইবাবুকে উদ্ধার করতে যাবে না, ব্যবস্থা করা আছে।”
”বলছ কী!”
শিবা জবাব না দিয়ে নিতুর কাছে এল। ”দাদা, এর নাম মিতা। ভবানী—সারের কোচিংয়ে পড়ত। ওর জামাইবাবু জোনাকির ম্যানেজার। আজ দুপর থেকে তাকে ফ্যামিলি সমেত কোয়ার্টারে আটকে রেখে ধর্মঘট শুরু করেছে। আমি একটু দেখে আসব ব্যাপারটা, তুমি ততক্ষণ চালিয়ে নিয়ো।”
”ধর্মঘট! তুই কী করবি ওখানে? ও তো আপনিই ভেঙে যাবে—তোকে আর ঝামেলায় জড়াতে হবে না।” নিতু বিরক্ত স্বরে ভাইকে বারণ করল।
”তবু একবার দেখে আসি। একটা দু’ বছরের ছেলে বন্দি থাকবে, দুধ পাবে না, জল পাবে না, তা কি হতে পারে।”
বসার টুলটা মিতার সামনে রেখে শিবা বলল, ”তুমি এখন বসে থাকো। জোনাকি থেকে আমি একবার ঘুরে আসি, কোয়ার্টারটা কোথায়?”
”গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে একটা ফাঁকা জমির পরেই একতলা গোলাপি রঙের বাড়ি। বেরোবার একটাই দরজা। গেটের কাছ থেকে দেখা যায়। আমি দেখেছি গোটাকতক লোক কোয়ার্টারের সামনে হাত তুলে—তুলে স্লোগান দিচ্ছে।”
কিছুক্ষণ পরে শিবা ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে হাঁটতে—হাঁটতে জোনাকির গেটের কাছে পৌঁছল। জনাপঁচিশ লোক সেখানে। গেটের সামনে চৌকি। তার পেছনে লাল শালুর কাপড়ে শ্রমিক ইউনিয়নের নাম লেখা। খুঁটিয়ে সে লোকগুলির মুখ দেখল, কিন্তু একজনকেও তার চেনা লাগল না। পরিবেশটা শান্ত, ধর্মঘট হলে যে চাঞ্চল্য বা উত্তেজনা থাকে, তার কিছুই নেই । পাঁচিলের গায়ে হাতে—লেখা কয়েকটা পোস্টার। অনেকেই ভাঁড়ে চা খাচ্ছে। দুটো বড় বালব থেকে আলো ছড়িয়ে রয়েছে।
শিবা গেট পর্যন্ত চলে গেল। কেউ তাকে লক্ষ করল না। লোহার চাদরের গেট, পাল্লা দুটো আধ—খোলা। কিছু ধর্মঘটী ভেতরেও রয়েছে। তীক্ষ্ন নজরে সে বাঁ দিকটায় চোখ পাঠাল। কাঠের থাম্বায় ফ্যাক্টরির ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে। ফাঁকা জায়গায় বড়—বড় ঘাস, কিছু ভাঙা প্যাকিং বাক্সের কাঠ, টিনের স্ক্র্যাপ, তার পেছনে একতলা আবছা একটা বাড়ি। জানলাগুলো বন্ধ, সদর দরজাটাও। বাড়ির মধ্যে কোনও আলো জ্বলছে বলে তার মনে হল না। কয়েকটা লোক বন্ধ দরজার সামনে বসে শালপাতা থেকে কিছু খাচ্ছে। বাড়ির পেছন দিকে কী রয়েছে বোঝা গেল না। দেড় মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ফ্যাক্টরি এলাকাটা ঘেরা। পাঁচিলের ধারে গোটা পাঁচেক কৃষ্ণচূড়া গাছ।
”অ্যাই এখানে কি চাই, য়্যা? ভেতরে কী দেখছ?” চৌকিতে আধশোয়া একটি লোক চোখ কুঁচকে কর্কশ স্বরে বলল।
”ননীকে খুঁজছি।” শিবার নিরীহ মুখ থেকে ব্যস্ত স্বরে কথা বেরোল।
”কে ননী? কোথায় কাজ করে?”
কোথায় করে! শিবা ফাঁপরে পড়ল বটে, কিন্তু সঙ্গে—সঙ্গে একটা স্টোভকে সে মনে মনে দেখে নিল।
”বলেছিল রঙের কাজ করে। আলুর দম আর রুটির দাম পাব, মাসকাবারে দেবে বলেছিল। ধর্মঘট চললে তো আমার টাকা—হ্যাঁ দাদা কদ্দিন চলবে বলতে পারেন?” শিবার মুখে দুর্ভাবনা ছড়িয়ে পড়ল।
লোকটির চোখ এবার স্বাভাবিক হয়ে এল। ”কত টাকা খেয়েছে? দেখতে কেমন?”
”সাতাশ টাকার। দেখতে খুব রোগা, কালো, আমার মতোই লম্বা। একটা গেঞ্জি পরে, তার বুকে লেখা—’আই লাভ ইউ’।”
লোকটা খিকখিক করে হেসে উঠল। ”ভালবাসে যখন, ও টাকা মার যাবে না, দু’দিন পরে এসে খোঁজ নিয়ো।”
”তখন ফ্যাক্টরি খুলে যাবে?”
”তা আমি কী করে বলব। সবই নির্ভর করছে ওদের মরজির ওপর। দাবিগুলো মেনে নিলে আমরাও ধর্মঘট তুলে নেব।”
”দাবি নিয়ে কী কথা হচ্ছে তুলসীদা?” এগিয়ে এল এক গাঁট্টাগোট্টা অল্পবয়সী, বুকে পিন দিয়ে আঁটা কাগজের ব্যাজ। শিবার মনে হল, একে কোথায় যেন সে দেখেছে। মনে—মনে সে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। ”আলো আজ বন্ধ হয়েছে, কাল জলও বন্ধ হবে। কার মরজির ওপর দাবি মেটানো হবে সেটা কি অন্য লোক ঠিক করে দেবে?” হাতের খেঁটোটা তক্তায় ঠুকে লোকটা কটমটিয়ে এবার শিবার দিকে তাকাল। ”আমরা ঠিক করে দেব।”
এবার শিবার নজরে পড়ল দু’হাত করে লম্বা কয়েকটা খেঁটো আর লোহার রড চৌকির পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা। দুটো লোক ফ্যাক্টরির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।
”একটা শতরঞ্চি কি মাদুর হবে তুলসীদা?”
”কেন, ঘুমোবি নাকি?” বুকে ব্যাজ আঁটা বলল। কথা বলার ভঙ্গিটা শিবাকে মনে পড়িয়ে দিল একে সে দেখেছে ছায়াবাণী সিনেমা হলের সামনে। লোকটা টিকিট কালোবাজারীদের সর্দার।
”ঘুমোব না তো কী! সারারাত জেগে বসে থাকার দরকার কি? সদর দরজাটায় তালা মেরে দিয়েছি, বেরোবার আর তো পথ নেই।”
”অ্যাই তোমার আর কি এখানে দরকার, যাও, যাও, কেটে পড়ো। ননীটনি বলে এখানে কেউ নেই।” তুলসীদা উঠে বসল।
অনিচ্ছুক পায়ে ফিরে যেতে—যেতে শিবা বলল, ”তা হলে কাল সকালে একবার আসব।”
”তাই এসো।”
সাইকেল রিকশায় বসে ছিল ননী। শিবাকে দেখে নেমে পড়ল।
”বুইজল্যা শুইনল্যা কী, ব্যাপারডা ক্যামন ঠ্যাকল?”
”বলছি। মিতা বাড়ি চলে গেছে?”
