”আলুর দম। দাদা একটা দোকান দিয়েছে ফিডার রোডের মোড়ে, খদ্দের সব পার্কিনস জুট মিলের। আমি সাহায্য করি দাদাকে। বাড়িতে মা তৈরি করে, এখন আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
”তোমরা তো সেই ভবানী—সারের কোচিংয়ের কাছাকাছিই থাকো, না?”
”হ্যাঁ। তুমি তো আর পড়তে গেলে না।”
”নাহ। বাবা মারা গেলেন, একটু অসুবিধায় পড়ে গেলাম আমরা, খরচটরচ কমাতে হল।”
একটা শ্যামবাজারগামী বাস এসে দাঁড়াল। দুটো দরজায় যাত্রী ঝুলছে। শিবা বলল, ”সকালে বাসে খুব ভিড় হয়। আটটায় যাদের হাজিরা তারা এই সময়ই যায় তো।”
মেয়েটা হতাশ চোখে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ”অসম্ভব। আমার দ্বারা হবে না। কলেজে যেতে আজও দেরি হবে।”
”এখান থেকে কলেজে যাবে! কোথায় কলেজ?”
”এখান থেকে প্রথমে যাব বাড়ি, পাইকপাড়ার মোড়ে। চান—খাওয়া সেরে সেখান থেকে মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ।”
”দিদির বাড়িতে তা হলে বেড়াতে এসেছ?”
মেয়েটি হেসে ফেলল। ”দিদি সবে জনডিস থেকে উঠেছে, আবার ওর দু’ বছরের ছেলেটার হয়েছে জ্বর। জামাইবাবু তো ফ্যাক্টরির নানা গোলমাল নিয়ে সারাদিনই ওখানে। দেখাশোনা, সাহায্য করার জন্য নিজেদের একজন কারও তো থাকা দরকার, তাই আমি আসি, মাও আসে।”
আর—একটা বাস এল। এটাতে আরও ভিড়। মেয়েটা এবার ওঠার চেষ্টা করতে দরজার দিকে এগোল। সেই সময় শিবার নজরে এল খালি রিকশা নিয়ে ননী ফিডার রোডের দিকেই চলেছে, বোধ হয় তারই সন্ধানে। ‘হগ্গের দ্যাবতাদেরও জোটে না’ এমন খাদ্য ননী হারাতে রাজি নয়।
মেয়েটিকে হাত ধরে টেনে শিবা দাঁড় করাল। ”উঠো না, উঠো না, তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করছি…ননী।” শিবা চিৎকার করল, ”অ্যাই ননইই।”
মুখ ঘুরিয়ে দেখেই, ব্রেক কষে ননী হাত তুলল। রাস্তা পার হয়ে সে আসামাত্র শিবা বলল, ”একে এখুনি ডানলপে নিয়ে গিয়ে বাসে তুলে দে। তুমি এর রিকশায় চলে যাও। ডানলপ ব্রিজ থেকে বাস ছাড়ে, বসে যেতে পারবে। ননী ফুল স্পিডে যাবি,…অ্যাঁ।” শিবা হতভম্ব হয়ে তাকাল। বরাভয় দানের মতো ননী হাতটা বুকের কাছে রেখে পাঁচটা আঙুল নাড়াচ্ছে।
”বেশি নয়, পাঁচটা।” ননীর মুখে বুদ্ধের প্রশান্তি ও সৌম্যতা।
”না, না, রিকশা আমার দরকার নেই, পাঁচ টাকা দিয়ে এইটুকু পথ যাওয়ার কোনও মানে হয় না।” মেয়েটি শশব্যস্তে বলল।
”দাঁড়াও তুমি, ব্যাপারটা টাকার নয়।” এই বলে দ্রুতপায়ে শিবা রিকশার কাছে এল। ”পাঁচ কী রে, অ্যাঁ। চারটে দোব।”
”উঁহু, চারটার কাম নয়, পাঁচটা।”
”এইটুকু তো পথ।” শিবা গলা চেপে ধমকাল।
”দূরত্বটা তো বড় কথা নয়, দু’বার প্যাডেল মাইরলেই তো ডানলপ পৌচায়ে যামু। কামের গুরুত্বটাই হইল আসল কথা। হক্কালবেলায় বিউটিফুল একডা মাইয়ারে রিকশায় একা বসাইয়া বি টি রোড ধইরা যাওয়া….এতে কত যে রিকস, কত যে ডেঞ্জার, তা…তুমি বুঝবা না…না, না, পাঁচটাই।”
”ঠিক আছে।” দাঁতে দাঁত চেপে শিবা রাজি হল। হাতছানি দিয়ে সে মেয়েটিকে ডেকে এনে বলল, ”উঠে পড়ো। এর নাম ননী। আমার বন্ধু, উপকার করতে খুব ভালবাসে। সকালে প্রথম প্যাসেঞ্জারের কাছ থেকেও ভাড়া নেয় না, তাই না রে ননী? ঠিকমতো বাসের সিটে ওকে বসিয়ে দিবি।”
”দ্যাহো ওস্তাদ, পরশুও শুনচি, অহনও শুইনলাম, ‘ওকে, ওকে’ কইরা ওনাকে বইলত্যাচ, ক্যান, ওনার কি কোনও নাম নাই? হ্যাঁ দিদি, আপনার নামডা কি?”
”মিতা, পারমিতা দাস। তোমার নাম তো শুনলামই, আর তোমার নামটাও জানি।”
শিবা অবাক হয়ে বলল, ”জানো। কী করে?”
”বোম্বাইয়ে, মনে আছে, তোমার লড়াই দেখতে গেছলাম। গ্যালারি থেকে চিৎকার হচ্ছিল, ‘কীল শিবা, কীল কীল কীল, নকআউট শিবা, নকআউট।’ তুমি অবশ্য পারনি।”
মিতার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে—সঙ্গেই শিবার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে ননী প্যাডেল শুরু করে দিল। সে দেখেছে, শিবার মুখটা যন্ত্রণায় আর লজ্জায় ফ্যাকাসে হয়ে আসছে।
.
তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ফিডার রোডের মোড় জমজমাট। রাস্তায় সওদা রাখা ফেরিওলাদের চিৎকার, সাইকেল রিকশার ভেঁপু, আনাজপাতির বাজার থেকে হাঁকাহাকি, এরই মাঝে খিদে পাওয়া মানুষদের তাড়া। শিবা আর নিতুর দম ফেলার সময় নেই। তারই মধ্যে শিবা দেখতে পেল মিতাকে।
বিভ্রান্তের মতো ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এধার—ওধার তাকাচ্ছে। দু’চোখে উদ্বেগ। শিবা হাত তুলল, যদি দেখতে পায়। পায়নি, তবে দাঁড়িয়ে থাকা এক চানামটরওলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে। শিবা নিশ্চিত, তাকেই খুঁজছে, নয়তো এখানে ওর আসার আর কোনও কারণ তো থাকতে পারে না।
”এই যে, তোমাকেই খুঁজছি শিবা, ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি। ননী বলেছিল, কোনও দরকার—টরকার হলে তোমাকে বলতে।” মিতা নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, পারছে না। ”দিদি, জামাইবাবু, ওদের বাচ্চচাটা…।”
”কী হয়েছে?” শিবা হাত ধরে মিতাকে সরিয়ে আনল দোকানের সামনে থেকে। নিতু অবাক হয়ে দেখছে।
”কোয়ার্টারে ওদের আটকে রেখে দিয়েছে, ঘেরাও, ধর্মঘট, অবরোধ যাই বলো না কেন, স্রেফ বন্দি হয়ে আছে। টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছে। কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না, বেরোতেও না। বিকেলে এসে ঢুকতে গিয়ে ফ্যাক্টরির গেটেই ওরা আমায় আটকে দিল।”
”ওরা কারা?”
”যারা দুপুর থেকে ধর্মঘট শুরু করে গেটের সামনে বসে পড়েছে। আমার পক্ষে তো কাউকেই চেনা সম্ভব নয়। একজন আমার দিকে তেড়ে এসে বলল, মালিকের দালালকে তো বটেই, তার আত্মীয়স্বজনকেও ধোলাই দেওয়া হবে। ওখানেই শুনলাম, যতক্ষণ না জামাইবাবু রেজিগনেশন লেটারে সই করছে, ততক্ষণ কোয়ার্টারের মধ্যে ফ্যামিলি সমেত তাকে আটকে রাখা হবে, বাইরের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। টেলিফোন, ইলেকট্রিক, জল, সব কিছুর কানেকশন কাট—অফ করে দেবে। রেশন, ওষুধ, দুধ এসব কিছুই পাবে না। খাবার জলটুকুও না। শিবা, তা হলে ওরা বাঁচবে কী করে, ওরা তো মরে যাবে।” মিতা দু’হাতের মুঠো ঝাঁকাল। তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থায়।
