আঙুলের ডগায় তিনটে গ্লাস ধরে শিবা বেরিয়ে গেল। গ্রেট বেঙ্গল অটো রিপেয়ারিং—এর হেড মেকানিক শ্রীকান্ত দাস ব্যাটারির খোলের ওপর বসে মোটরের চাকায় ব্রেক শু্য লাগাচ্ছে। গ্যারেজের মালিক দুর্লভ চক্রবর্তী আর ঘিয়ে রঙের প্যান্ট ও নীল টি—শার্ট পরা, কাঁচাপাকা চুলের কৃষ্ণকায় দোহরা গড়নের একটি লোক দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে তার কাজ।
চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়েই শ্রীকান্ত বলল, ”অ্যাহহ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, যা গরম করে নিয়ে আয়।” দুর্লভও গ্লাসের চা ফেরত দিল। দু’ গ্লাস চা ফিরিয়ে এনে শিবা দেখল সাধু ও তার সঙ্গীটি নেই। তার বুকের মধ্যে কেন জানি ছ্যাঁত করে উঠল। ভবানী—সারের কোচিংয়ের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় ওদের দেখতে পেল না। তা হলে ওরা গেল কোথায়?
চা আবার গরম করে গ্যারেজে পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় তার মনে হল কোচিংটা একবার দেখে এলে কেমন হয়।
তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি কখন এসেছিল, এই নিয়ে শিবা পরে যখনই ভেবেছে, ভাবতে—ভাবতে সে এই জায়গাটায়ই পৌঁছেছে। একবার দেখে আসার ইচ্ছাটা তার মনের মধ্যে তৈরি না হলে সেদিন কোচিংঘরের জানলায় এসে দাঁড়াত না। না দাঁড়ালে সে দেখতে পেত না সেই দৃশ্য।
।। ৫।।
”দুটো আলুর দম, রুটি।”
হুকুমের স্বরে কথাটা বলে লোক দুটি দু’ পা সরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করল। নিতু দুটো ডিশ ওদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের কাজে মন দিল। শিবা বালতি থেকে জল নিয়ে এঁটো ডিশ ধুচ্ছিল। একবার মাত্র লোক দুটির মুখের দিকে তাকাল। নতুন খদ্দের, আগে কখনও এদের সে দেখেনি।
”সদর দরজাটা আটকে দিলে বেরোবার আর কোনও রাস্তা নেই। তার আগে টেলিফোন লাইনটা কেটে দেওয়া।”
”ঘেরাও কদ্দিন চলবে?”
”যদ্দিন না রিজাইন করবে। আরে বাবা, ইলেকট্রিসিটি বন্ধ, জলের লাইন বন্ধ, বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ। বউ আর একটা বাচ্চচা নিয়ে ক’দিন ঘরে বসে থাকবে? বাচ্চচাটাকে খাওয়াতে হবে না?”
”উদ্ধার করতে পুলিশ এলে, তখন?”
”আসবে না, ওসব ব্যবস্থা করা আছে।” এই বলে লোকটি ঝোল মাখানো পাউরুটি চিবোতে—চিবোতে বলল, ”ঝোলটা বেড়ে করেছে। আর—এক প্লেট খাব।”
”আমাকেও আর—একটা দিতে বল।”
শিবা কথাগুলো শুনল বটে, মাথামুণ্ডু কিছু বুঝল না। আলুর দমের প্রশংসা শুনলে তার ভালই লাগে। লোক দুটো কুলিমজুর ধরনের নয়, কথার উচ্চচারণ থেকেই শিবা সেটা বুঝতে পারল।
জুট মিলে রাতের শিফটে কাজ করতে যাওয়ার আগে চা খাচ্ছিল কয়েকজন। একজন নিতুকে বলল, ”জোনাকিতে লকআউটে হচ্ছে, শুনেছ নাকি?”
”না।”
নিতু তার দোকান ছাড়া আর কোনও ব্যাপারে মাথা ঘামায় না, কৌতূহলও দেখায় না। ভোর থেকে রাত, শুধু খেটে যাওয়া। ব্যবসাটা বড় করা ছাড়া তার জীবনে আর কোনও লক্ষ্য নেই। একসময় সে ছোটখাটো একটা কারখানায় কাজ করত। মজুরি আর বোনাস বৃদ্ধি সহ এগারো দফা দাবি নিয়ে যে ধর্মঘট হয়, সে তার অন্যতম নেতা ছিল। সাধুর ছেলেদের দিয়ে পিটিয়ে মালিক গোরাবাবু ধর্মঘট ভেঙে দেয়। ধর্মঘট নেতাদের বেশিরভাগই বণ্ডে সই করে কাজে ফিরে যায়। নিতু যায়নি। ‘শ্রমিক আন্দোলন’ কথাটা শুনলেই এখন তার ঠোঁট মুচড়ে ওঠে, বিদ্রূপে না ঘৃণায়, সেটা বলা শক্ত।
”আমার কানেও অমন একটা কথা এসেছে।” আর—একজন বলল, ”ছেলে বলছিল, ওর এক বন্ধুর কাকা ওখানে কাজ করে, তার কাছেই শুনেছে। মালিক কারখানাটা তুলে দিয়ে ওখানে ফ্ল্যাটবাড়ি বানাবে। কিন্তু ছোকরা ম্যানেজার নাকি বেঁকে বসেছে। বলছে, কারখানা তুলে দেওয়া চলবে না। কোয়ার্টার সে ছাড়বে না। রগড় জমেছে ভাল। ম্যানেজারের সঙ্গে মালিকের লড়াই বেধে গেছে।”
শুনতে—শুনতে দুপুরে সেই দুটো লোকের কথোপকথন শিবার মনে পড়ে গেল। তার ভ্রূ দুটো তখন একবার শুধু কুঁচকে উঠল। রাতে বাড়ি ফেরার সময় সে জোনাকির মোড়ে থমকে দাঁড়াল। প্রায় দুশো মিটার দূরে কারখানার উঁচু পাঁচিল আর টিনের চালার কিছুটা দেখা যাচ্ছে। ভেতরে কাঠের থাম্বায় ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে। মানুষজন নেই। রাস্তার দু’ ধারে একতলা পাকা বাড়ি এবং মাটির বাড়ি। রাস্তায় আলো নেই।
দু’দিন পর সকালে শিবা ডেকচি ঘাড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ননীকে খুঁজল। দেখতে না পেয়ে হেঁটেই রওনা দিল। জোনাকির মোড়ের কাছে এসে ওপারের বাস স্টপে চোখ পড়তে তার চলা থেমে গেল।
সেই মেয়েটি, বোধ হয় বাসের জন্যই দাঁড়িয়ে। এত সকালে, এখানে। শিবা ইতস্তত করে, কৌতূহল আর না চাপতে পেরে রাস্তা পার হল।
”চিনতে পার?”
বড় ডেকচি ঘাড়ে বসানো একটি তরুণ হঠাৎ সামনে এসে হাসিমুখে কথাটা বলায় মেয়েটি প্রথমে থতমত হয়ে পড়ল। চোখ কুঁচকে চেনার চেষ্টা করতে—করতে অবশেষে মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। দুই মুঠো তুলে বলল, ”বক্সার না?”
শিবা মাথা কাত করল, ”দু’দিন আগেও তোমাকে দেখেছি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ। এখানেই থাক নাকি?”
”এখানে দিদি—জামাইবাবু থাকে। এই ভেতর দিকে জোনাকি নামে স্টোভ আর হ্যারিকেনের যে ফ্যাক্টরিটা আছে, দেখেছ কী, জামাইবাবু তার ম্যানজার। ওদের কোয়ার্টারটা ফ্যাক্টরির মধ্যেই একপাশে।”
”দেখিনি, তবে জানি ওই রাস্তাটার ভেতর দিকে একটা আছে।” শিবা ডেকচিটা ঘাড়—বদল করল।
”কী আছে এতে?”
