সন্ধ্যাবেলায় ‘আউট’ সঙ্কেত দেখে শিবা চা দিতে গেছল। ভবানী—সার চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলেন, ”শিবা, একটু যে মুশকিল হয়ে গেছে।”
”কিসের মুশকিল, হাত ভেঙে দেবে বলেছে?” কথাটা শিবার মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তই বেরিয়ে এসেছিল। স্বরে ছিল উৎকণ্ঠা।
ভবানী—সার তাচ্ছিল্যতায় তাকিয়ে বলেন, ”ওটা কোনও ব্যাপারই নয়। ধরা পড়লে ওরকম ভয়—দেখানো কথা সবাই বলে।” পর মুহূর্তেই তাঁকে উদ্বিগ্ন দেখায়। ”আসলে ভেতরে বোধ হয় মনে হচ্ছে আঁচ পেয়েছে। কেউ বোধ হয় বলে দিয়েছে।”
”কিন্তু আমি তো সার খুব হুঁশিয়ার হয়েই সাপ্লাই করি।”
”তা অবশ্য করো, কিন্তু পারিবারিক শান্তি বলে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে যার বিষয়ে তুমি এখনও কিছুই বোঝ না। এই শান্তিটা কিভাবে বজায় রাখা যায়, অর্থাৎ চা—এর সাপ্লাইটা—” ভবানী—সার শিবার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিলেন, একচুমুকে চা শেষ করে।
”ধরা পড়ে গেলে বলবেন শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল বলে আদা নিয়ে এককাপ—”
”আরে না, না, শরীর খারাপের অজুহাত একদম নয়। শরীর খারাপ হওয়াটা তো লজ্জার ব্যাপার। শিক্ষিত মানুষের শরীর খারাপ হবে, এটা কি একটা কথা হল! যারা লেখাপড়া শিখেছে তাদের অবশ্যই জানা উচিত শরীর কিভাবে কাজ করে, তাকে কিভাবে যত্ন করতে হয়, কি কি করা উচিত আর কি—কি খাওয়া উচিত নয়। এই থেকেই তো আসে ডিসিপ্লিন। বুঝলে শিবা, এই শরীরটাই হল মানুষের একমাত্র নিজস্ব সম্পদ, সবথেকে দুর্লভ সম্পদ। সম্পদ রক্ষা করতে জানলে সেটা ম্যাজম্যাজ করবে কেন? তোমার যে এমন দারুণ স্বাস্থ্য, তুমি যত্ন করো বলেই তো!”
শিবা বোকার মতো শুনে যাচ্ছিল, এইবার হেসে ফেলল।
”আমি আর কি যত্ন করব। দিনে একবেলা ভাত—ডাল আর রাতে রুটি—ঘ্যাঁট, তাও পেট ভরে নয়।”
ভবানী—সার অপ্রতিভ হয়ে টাকে হাত বুলোতে—বুলোতে বলেন, ”ওহ তাই বুঝি, পেট ভরে খেতে পাও না? সেটা অবশ্য একদিক দিয়ে ভালই, অতি ভোজনে—”
শিবা ততক্ষণে উশখুশ শুরু করেছে। বটকেষ্টর চিৎকার যে—কোনও মুহূর্তে বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে এল বলে! ভবানী—সারকে চুপ না করালে ছাড়া পাওয়া যাবে না, তাই সে দুম করে বলল, ”আচ্ছা সার, হাত ভেঙে দেওয়ার কথা শুনে আপনি ভয় পেলেন না, তা হলে চা খাওয়ায় ভয় পাচ্ছেন কেন?”
প্রশ্নটায় প্রথমে থতমত হয়ে তারপর ভবানী—সার হেসে ওঠেন।
”ওটাতে আমি ন্যায়ের পক্ষে, কর্তব্যের পক্ষে তাই, আর এটাতে আমি কারচুপি করছি, মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছি—তাই। ন্যায়—অন্যায় মানুষমাত্রই করে, না হলে মানুষ তো দেবতা হয়ে যেত। তবে দুটোর মধ্যে ডিগ্রির তফাত রাখতে হয়। আমি ন্যায়ের ডিগ্রিটা, মানে মাত্রাটা, বেশি রাখতে চাই, এই আর কি।”
”যদি ছেলেদের খাওয়ানোর জন্য মা ভাত চুরি করে, তা হলে কি অন্যায়?”
”কার ভাত? ভাতের মালিক কে?”
”বড়লোক, খুব বড়লোকের ভাত।”
”চুরির জন্য তাদের কি কম পড়ে?”
”একটুও পড়ে না। এই অ্যাতোটুকু ভাত আর ডাল, কি তরকারি। এতে কি কম পড়ার কথা?” শিবা তার দুই মুঠো জোড়া দিয়ে পরিমাণটা দেখাল।
জোড়ামুঠোর দিকে তাকিয়ে ভবানী—সার কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিলেন। ”আমি তো কোনও অন্যায় দেখতে পাচ্ছি না। তবে চুরি ইজ চুরি সেটা কিন্তু—”
বটকেষ্টর চিৎকার ভেসে এল এবং শিবা বাকি কথা শোনার জন্য আর দাঁড়িয়ে থাকেনি। দোকানে ফেরামাত্রই বটকেষ্ট খিঁচিয়ে ওঠে।
”মাস্টারের কাছে অ্যাতক্ষণ কি অঙ্ক কষছিলি? খদ্দেরকে নিজে হাতে করে চা দেব বলে লোক রেখেছি? গ্যারেজে তিন কাপ চেয়ে গেছে, দৌড়ে নিয়ে আয় গে।”
মুখ নামিয়ে বটকেষ্ট গজগজ করে যাচ্ছে। শচীনকাকু চা বানাচ্ছে। শিবার চোখ তখন টেবলে বসা দুটো লোকের দিকে। ওদের একজনের নাম সে জানে। বিটি রোডের ওপারে, মিনিট দশেক হেঁটে গেলে মিলন পল্লী, সেখানে থাকে। ওর নাম সাধু, ভাল নাম সাধন।
ওর সম্পর্কে অনেক কাহিনী শিবা শুনেছে। সাধু আর তার দলবলকে কেন্দ্র করে বীভৎস, নির্মম নানান গল্প এই অঞ্চলের মানুষের মুখে শোনা যাবে। ভয়ের দ্বারা অতিরঞ্জিত হলেও অনেক ঘটনাই সত্যি। দয়া, মায়া, মমতার ছিটেফোঁটাও সাধুর অন্তরে নেই। অথচ কলেজে দু’ বছর পড়েছে, ছাত্র রাজনীতিতেও ছিল। ওয়েটলিফটার হওয়ার জন্য পরিশ্রম করে তাল—তাল পেশী সংগ্রহ করেছে। চলাফেরার সময় পেশীগুলো অজগরের মতো ওর শরীরে নড়াচড়া করে। ওর পাশব শরীরে সব থেকে বেমানান মুখটি। গ্রিক দেবতার মতো মুখের আদল, শিশুর মতো চাহনি। বেঁটেখাটো সাধুর ডান পা—টি জন্ম থেকেই একটু ছোট।
এই পাড়ায় সাধু বহুদিন আসেনি, তাই অনেকের চোখ তার দিকে। দোকানে যারা এক গ্লাস চা নিয়ে সারা সন্ধ্যা বসে থাকে, তারা উঠে চলে গেছে। রাস্তা দিয়ে যেতে—যেতে অনেকেই সাধুর দিকে একবার তাকিয়েই চলার বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেবদাস রোডে ছমছমে একটা ভাব।
সাধু আঙুল নেড়ে শিবাকে ডাকে, ”শুনে যা।”
ফ্যালফ্যাল চোখে শিবা শুধু তাকিয়ে থাকে। রোগাটে, লম্বা সাধুর সঙ্গীটি তিরিক্ষে করে বলল, ”অ্যাই ব্যাটা, শুনতে পাসনি নাকি?”
শিবা তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসে।
‘মাস্টারটাকে চা দিতে গেছলি?” সাধু শান্ত গলায় জানতে চায়।
”হ্যাঁ।”
”ঘরে এখন কে আছে?”
শিবা জবাব দেওয়ার আগেই বটকেষ্ট বলে ওঠে, ”কে আবার থাকবে, কয়েকটা ছেলে আর একটা মেয়ে…..ওরে শিবা যা যা দৌড়ে যা, গ্যারেজে চা দিয়ে আয়।”
