ভবানী—সারের সঙ্গে শিবার সম্পর্কটা ছিল একটু অন্যরকমের। শান্ত, নির্বিরোধ, গম্ভীর প্রকৃতির ভবানীচরণ মাইতি পঁচিশ বছর যতীন্দ্রকিশোরে অঙ্কের শিক্ষকতা করছেন। ছোটখাটো শীর্ণ চেহারা, মাথায় টাক, কাচের গ্লাসের তলার মতো চশমার লেন্স দুটি পুরু, চশমা ছাড়া প্রায় অন্ধ। খদ্দর ছাড়া পরেন না। হাঁটেন মিলিটারির মতো থুতনি তুলে, সটান দেহে। বয়স প্রায় পঞ্চাশ।
সকাল—সন্ধ্যায় কয়েকটি ছেলে ও একটি মেয়ে পড়তে আসে। ভবানী—সারের কোচিংয়ের খ্যাতি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো। সিঁথি, বরানগর, বেলঘরিয়া থেকে পড়ুয়ারা আসে, কিন্তু তিনি দশটির বেশি নেন না। তার মধ্যে দু’জনকে পড়ান বিনা দক্ষিণায়, যেহেতু তারা গরিব এবং অঙ্কের মাথাটা দারুণ।
কোচিংয়ের একটি দেওয়ালে ব্ল্যাক—বোর্ড ঝোলানো। তার ওপরে স্বামী বিবেকানন্দর রঙিন একটি বাঁধানো ছবি। পড়ুয়ারা বসে মেঝেয় শতরঞ্চিতে। শিবা স্কুলে ভবানী—সারের কাছে কখনও পড়েনি। উনি শুধু উঁচু ক্লাসে অঙ্ক এবং প্রয়োজনে ইংরেজি পড়ান।
শিবা বুঝতে পারত না, এই লোকটি কেন তাকে আকর্ষণ করে। রাশভারী, কম কথা বলা, গম্ভীর, কিন্তু একটা ছেলেমানুষিও আছে। কোচিংঘরের পাশের দরজা দিয়ে তিন হাত গলিতে বেরিয়ে পেছনে গেলেই সারের সংসার, কোচিংঘর ও সংসারের মধ্যে কোনও দরজা—জানলা নেই, স্ত্রী সুপ্রভা শুধু সেখানে। একমাত্র ছেলেটি পিকনিক করতে গিয়ে পুকুরে ডুবে মারা গেছে। ভবানী—সার স্ত্রীকে ভয় পান। সুপ্রভা মুখরা এবং বাজে খরচ একদমই বরদাস্ত করেন না। তাঁর ধারণায়, সকাল—সন্ধ্যা এককাপ করে চা, ব্যস, এর বেশি খাওয়ার দরকার নেই। দু’ কাপের বেশি হলেই সেটা বাজে খরচের তালিকায় পড়ে, তবে অনেক কাকুতিমিনতির পর সারাদিনে তিন কাপ বরাদ্দ করেছেন। ভবানী—সার গঞ্জনাকে ভয় পান। অথচ চা তাঁর কাছে খুবই জরুরি পানীয়। আধঘণ্টা অন্তর গলাটা না ভেজাতে পারলে, অঙ্ক ব্যাপারটা তাঁর কাছে নীরস কিছু সংখ্যা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
একদিন শিবা চা দিতে ঢুকেছিল কোচিংঘরে। দরজায় দাঁড়িয়ে ভবানী—সার তখন কথা বলছিলেন স্ত্রীর সঙ্গে। পড়ুয়াদের জনাদুই সবেমাত্র এসেছে। শিবার হাতে চায়ের গ্লাস দেখে সুপ্রভা ভুরু কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ”কী ব্যাপার? চা খাচ্ছ?” ফ্যাকাসে মুখে ভবানী—সার মাথা নেড়ে বলে ওঠেন, ”চা খাব আমি! পাগল নাকি! শিবা কোচিংয়ে পড়তে চায়, আমি বলেছি চায়ের দোকানের কাজ ছাড়লে, স্কুলে ভর্তি হলে, তবেই পড়াব। কিন্তু কাজটা ছেড়ে দেওয়াও তো ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে—ওখানে দেওয়ার জন্য চা নিয়ে যাতায়াতের পথে রোজই একবার এসে ধরাধরি করে। যত বলি হবে না, স্কুলের ছাত্র ছাড়া পড়াই না, তবু শোনে না। এই দ্যাখো, সকালে একবার এসেছিল, আবার এখন এসেছে। উফফ কী যে নাছোড়বান্দা ছেলে। শিবা, বলেছি তো তোমাকে—এখন তুমি যাও, পরে ভেবে দেখব।”
শিবা প্রথমে হকচকিয়ে গেছল। কিন্তু ভবানী—সারের মতো লোক যখন এইভাবে ঝাড়া মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছেন, তখন নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। তার প্রাথমিক অনুভূতি বলল—বিপদে পড়েছেন, এখনই সারকে সাপোর্ট কর।
সঙ্গে—সঙ্গে চায়ের গ্লাসসমেত হাত দুটো বুকের কাছে তুলে কাঁচুমাচু মুখে সে বলল, ”আপনি রোজই বলেন পরে ভেবে দেখব। কিন্তু কখনওই আমার কথা ভাবেন না।” তারপর একটু রাগ দেখিয়ে বলল, ”ঠিক আছে, আমি গরিব, আপনাকে মাইনে দিতে পারব না তাই আমাকে ভর্তি করতে চান না। ঠিক আছে, আর কখনও আপনাকে বলতে আসব না।” এই বলেই সে আর দাঁড়িয়ে থাকেনি।
আধঘণ্টা পর বটকেষ্টর দোকানের সামনে এসে ভবানী সার হাতছানি দিয়ে শিবাকে ডাকেন।
”তুমি যে এত বুদ্ধিমান, তা তো জানতাম না। খুব বাঁচান বাঁচিয়েছ। ব্যাপারটা কি জানো, পারিবারিক শান্তি বজায় রেখে তো চলতে হবে।” ভবানী—সার তারপর দৈনিক তিন কাপ বরাদ্দের কথা বলে শিবার কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন, ”কি করে একটু চা খাওয়া যায় বল তো?”
শিবার পরামর্শে মতোই তিনি প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর কোচিংঘরের বাইরে এসে ডান হাতটা তুলে দাঁড়ান, যেভাবে ক্রিকেট আম্পায়াররা আউটের সঙ্কেত দেন। এইভাবে সঙ্কেতের অর্থ: অনর্থ হবে না, চা দিয়ে যাও। শিবাও এক ঘণ্টা অন্তর দোকান থেকে বেরিয়ে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে তাকিয়ে দেখে, হাত তুলে কোনও লোক স্ত্রীকে ফাঁকি দিচ্ছেন কি না।
তখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা চলছিল। অঙ্ক পরীক্ষায় একটা গোলমাল হয়েছে যতীন্দ্রকিশোর স্কুলে। দোকানে চা খেতে আসা দুটি ছেলের কথা শিবা ভাসা—ভাসা শুনেছে। একতলায় পরীক্ষা ঘরের জানলা দিয়ে কয়েকটা সাদা খাতা পাচার হয়ে আবার ফিরে আসে উত্তরে ভরা হয়ে। স্কুলেরই এক শিক্ষক—ইনভিজিলেটর সেটা ধরে ফেলেন হাতেনাতে। এর পর কিছু লোক স্কুলে ঢুকে হেডমাস্টারকে শাসিয়ে গেছে, যদি কোনও পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রিপোর্ট পাঠানো হয় তা হলে বোমা মেরে পরীক্ষা বন্ধ করে দেবে, সেই ইনভিজিলেটরেরও হাত ভেঙে দেবে।
কথাগুলো শুনেই শিবার মনে হয়েছিল, এরা যে শিক্ষকের কথা বলছে সে ভবানী—সার ছাড়া আর কেউ নয়। যতদিন সে স্কুলে পড়েছে, দেখেছে এবং শুনেছে কত ছেলে সারের হাত পা—য় ধরেছে অঙ্কে পাশ করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিছু উনি আধ নম্বরও বাড়িয়ে কাউকে পাশ করাননি। দারুণ কড়া যেমন, তেমনই অসম্ভব ধৈর্যে ছেলেদের অঙ্ক বোঝান। কামাই করেন না, এক মিনিটও দেরি করেন না ক্লাসে ঢুকতে। ভবানী—সার সম্পর্কে স্কুলে নানা কথা শুনে ছমছমে একটা শ্রদ্ধা শিবার তৈরি হয়েই ছিল। তার মনে হত, উনি মুনিঋষির মতো কেউ। কিন্তু চা—এর প্রতি ওঁর দুর্বলতা থেকে শিবার কাছে উনি ভালোবাসার জন হয়ে যান।
