”অ্যাই, অ্যাই, দাঁড়া, দাঁড়া।”
ননী ব্রেক কষে মাথা ঘুরিয়ে দেখল শিবা রাস্তার ওধার দিয়ে হেঁটে যাওয়া, কালো সালোয়ার ও হলুদ কামিজ পরা, সাদা চন্নি গায়ে এক তরুণীর দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে। ”ননী চিনতে পাচ্ছিস ওকে?”
তীক্ষ্ন নজরে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ননী বলল, ”হেই মাইয়াডা না? ভবানী—সারের কোচিংয়ে আইয়া পড়ত!”
”হ্যাঁ। লালবাগান বক্সিং জিমন্যাশিয়ামেরই গায়ে একটা জিমন্যাস্টিক ক্লাবে ও প্র্যাক্টিস করত। লালবাগান পার্কের গেটের কাছে একদিন ওর সঙ্গে দেখা হতে বলেছিলুম, ”তুমি আর ভবানী—সারের কাছে পড়তে যাও না কেন?” বলেছিল, ‘ওটা গুণ্ডাদের জায়গা।’ আমি বললুম, ‘গুণ্ডারা ভীষণ মার খেয়ে প্রতিজ্ঞা করে গেছে ও পাড়ায় আর আসবে না।”
”ক্যারা মারচিল সেডা কি কইচিলা?”
”ধেত, নিজের ঢাক নিজে পেটায় নাকি, লোকে হাসবে।”
”পিডায়, পিডায়, তা না করলি অহনকার দিনে বড় হওন যায় না।”
ননী আবার প্যাডেল করতে শুরু করল।
”ও কিন্তু ভবানী—সারের কোচিংয়ে আর আসেনি। বোম্বাইয়ে ন্যাশনালে লড়তে গিয়ে আবার ওকে দেখেছিলুম। ভেবেছিলুম কোনও জিমন্যাস্টিক টুর্নামেন্টে বুঝি নামতে এসেছে। অ—ম্মা, দেখি স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলছে! খেলাটা ছিল বেঙ্গল—রাজস্থান। তারপর চৌপট্টিতে দেখলুম টিমের কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে ভেলপুরি খেতে এসেছে। তখন ওকে আবার বলেছিলুম, কোচিংয়ে যাও না কেন, গুণ্ডার ভয় তো আর নেই। কিন্তু কথাটায় কোনও গা করল না, এড়িয়ে গেল।”
”জিমনাস্টিক ছাইড়্যা কিরকেট! এর পর সারের কোচিংয়েও যখন আর গ্যাল না তাইলে তো পড়াডাও ছাড়চে!”
”রোজারিওর সঙ্গে আমার ফাইনালের লড়াইটা দেখতে ওরা কয়েকজন গেছল।”
”তাই কও! বক্সিংয়ের ওরা বোঝেডা কী?”
”না বুঝুক, হারা—জেতাটা তো বোঝে। দুয়ো শুনতে—শুনতে ড্রেসিং রুমে ফিরে যাওয়ার সময় ওকে দেখেছিলুম, চোখে চোখ পড়তেই মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিল।”
শিবার স্বরে বিষাদের ছোঁয়াটুকু নদীর কানে ঠেকল। সে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো নরম গলায় বলল, ”হাইর্যা গ্যালে না সবাই মুখ ফিরাইয়া লয়, এইডাই নিয়ম। দ্যাহনা জিতলা পরে কত না সংবর্ধনা, কত না পুরস্কার…।”
তখন শিবা মুখ ঘুরিয়ে পেছনের রাস্তা দেখছিল, ননীর কথাগুলো তার কানে গেল না। মেয়েটি হাঁটতে—হাঁটতে বাঁ দিকে জোনাকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কস নামে স্টোভ ও হ্যারিকেন তৈরির কারখানা যাওয়ার রাস্তায় বেঁকে গেল। শিবা অবাক হয়ে ভাবল, এত সকালে মেয়েটি এই রাস্তায় কেন, এখানেই থাকে নাকি! কই এতদিনে একবারও তো তার চোখে পড়েনি? রিকশাটা তো ওর বেশি দূর দিয়ে যায়নি, একবার মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েও ছিল অথচ তাকে চিনতে পারল না! তার চেহারাটা তিন—চার বছরে কি খুব বদলে গেছে?
ব্রেক কষার ঝাঁকুনিতে শিবা সামনে তাকিয়ে দেখল ননীর চোখ তার মুখে আটকে রয়েছে। বুকের কাছে দুই মুঠি জড়ো করা।
”শিবা, তুই আবার শুরু কর, আবার তুই রিংয়ে নাম একবারটি।” ননীর কণ্ঠে মিনতি, চোখ দুটি ভিক্ষাপ্রার্থীর মতো, ”মায়ের কিরা, বক্সিংয়ের কিরা…তুই চ্যাম্পিয়ান হইবিই। আমার মন কইত্যাচে… কথাডা শোন। এইসব আলুর দম—টম বেচা বন্ধ কইর্যা তুই প্র্যাক্সিসে নাইমা পড়। যহন তুই প্র্যাক্সিস করবি, তোর হইয়া নিতুদার লগে আমি কাম করুম। রোজারিওর লগে হাইরাচিস, জেতা লড়াই হাইরাচিস, কি দুখ্য যে পাইচিলাম, পূরবো পল্লীর হগ্গলে…”
ননীর চোখে জলের আবরণ ছড়িয়ে রয়েছে। শিবার বুকের মধ্যে একটা ভয় চমকে উঠল। ননী যখন ‘ওস্তাদ’ না ডেকে শিবা, আর ‘তুমি’র বদলে তুই বলে, শিবা বুঝতে পারে আবেগে, উত্তেজনায় ননী তখন গভীরভাবে আন্তরিক, অন্তরের অন্তস্তল থেকে সে কথা বলছে। ওর মুখে ‘শিবা’ ডাকটা তার কাছে অত্যন্ত দামি, বুকের মধ্যে গরম লোহার শিকের মতো সেঁধিয়ে যায়। ওই ডাকে, অনেকটা মায়ের চোখে দেখা জীবনের প্রথম ভয়টাই তাকে পাইয়ে দেয়। সে জানে ননী অতি সরল, অতি সৎ। সব বিরোধিতা এদের কাছে নুয়ে পড়ে। মুখটা নামিয়ে শিবা বলল, ”চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
।। ৪।।
দেবদাস পাঠক রোডে বটকেষ্টর চায়ের দোকানে এক সময় শিবা কাজ করত। রাতে বাড়ি না ফিরে সে দোকানেই ঘুমোত। ভোরে উনুন ধরানো থেকে রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত প্রধানত খদ্দেরদের চা দেওয়াই তার কাজ। অবশ্য, তারই ফাঁকে ওমলেট, টোস্ট আর ঘুগনিও সরবরাহ করতে হয়। দোকানে—দোকানে চা দিয়ে আসার জন্য পাঁচ আঙুলে পাঁচটা গ্লাস ধরে ঘণ্টায়—ঘণ্টায় তাকে বেরোতে হলেই ভবানী—সারের কোচিংয়ে একবার তখন উঁকি দিত।
যতীন্দ্রকিশোর হাই স্কুলে ক্লাস সেভেনে শিবা চার মাস পড়ার পর মাইনে বাকি পড়ায় নাম কাটা যায়। পূর্বপল্লীর শচীন বটকেষ্টর দোকানের রাঁধুনি। শিবাকে সে—ই কাজটা জুটিয়ে দেয়। দু’বেলা ভাত আর কুড়ি টাকা বেতন। প্রথমদিকে সে রাত্রে বাড়ি ফিরে যেত। কেউটে সাপের তাড়া খাওয়ার পর নিতুই বারণ করে বাড়ি না ফিরতে। মাসে একদিন যেত বেতনের টাকাটা দাদার হাতে দিয়ে আসার জন্য। দাদা দুটো টাকা তার হাতে দিয়ে বলত, ”তোর হাতখরচ।”
একটা টেবলে মৌরির বাটি আর খাতা নিয়ে বটকেষ্ট বসে থাকে সারাদিন, দুপুরে ঘণ্টাতিনেকের জন্য বাড়ি যায়। কোথায় ক’টা চা বা ওমলেট যাচ্ছে তাই দেখে আর খাতায় লেখে। কোনও কিছু দিতে দেরি হলে খদ্দেরদের আগে বটকেষ্টই তাড়া লাগায়—”শিবা, অ শিবা, আধঘণ্টা আগে যে ক্যাসেটের দোকান দুটো চা বলেছে” অথবা ”ডাক্তারবাবু যে মামলেট চাইল, কখন দিয়ে আসবি?” দু—তিন মিনিটকে বটকেষ্ট আধঘণ্টা বলে।
