শিবা ত্যারচা চোখে ননীর মুখটা একবার দেখে নিয়ে বলল, ”শুধু একটা আলু, ঝোল পাবি না।”
”এইডা কি একটা কথা হইল। এক মাইল পথ…না, না, এহান থিকা আধা মাইলই….কিনা একডা মাত্তর আলু, তাও ঝোল নয়!”
ডেকচি মাথায় শিবা দাঁড়িয়ে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে ননীর সাইকেল রিকশাও।
”তোর সঙ্গে কথাই ছিল মাইল পিছু দুটো আলু আর ঝোল। আর মাইল তো আমি হেঁটেই চলে এসেছি, বাকিটাও হেঁটে চলে যাব।” শিবা রাগত স্বরে বলল।
”হেই ওস্তাদ, একটু লেট কইরা ফ্যালাইচি, সেজন্য এভাবে ফাইন কইরো না। কাইল রাতে একটা খুচরা অ্যাসকিডেন্ট কইরা এমন মাইর খাইচি….ওঠো, ওঠো, যাইতে—যাইতে কমু।” সাইকেলের সিট থেকে নেমে ননী ব্যস্তভাবে শিবার মাথার ডেকচিতে হাত লাগাল। উচ্চতায় সে প্রায় শিবারই সমান, ছ’ ফুট। কিন্তু প্রস্থে, দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হবে বটগাছের পাশে সুপুরি গাছ।
ননী ঢ্যাঙা, লিকলিকে, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। পরনে একটা ঢলঢলে সবুজ গেঞ্জি, যার বুকে ইংরেজিতে হলুদ অক্ষরে লেখা ‘আই লাভ ইউ’। জিনস—এর প্যান্টটা দু’ বছর আগে শিবারই দেওয়া, হাঁটুর ওপর নীল কাপড়ের তাপ্পি, পায়ে হাওয়াই চটি, পেছনে ওলটানো চুল, যার প্রান্তভাগ পায়রার ছড়ানো লেজের মতো। ননী বয়সে শিবার থেকে এক বছরের ছোট। ওর বাবা রাধেশ্যাম রিকশা চালাত, হাঁপানির জন্য আর পারে না। বউ আর দুই মেয়ের সঙ্গে বাড়িতে বসে এখন ঠোঙা বানায়।
ননীর শরীর দেখে বোঝা যায় না তার মধ্যে কতটা ক্ষমতা, সহনশীলতা লুকনো আছে। দুশো কিলোগ্রাম ওজনের চালের বস্তার বা একটি সুপুষ্ট পরিবারের ভার, দেড় বা দুই মাইল সে রিকশায় চাপিয়ে সহজেই নিয়ে যায়। অকল্পনীয় তার কলিজার শক্তি। আর ঠিক ততটাই তার দুর্বলতা শিবা সম্পর্কে। যেদিন শিবা ঘুসি মেরে সাধুর চোয়াল ভেঙে দিয়েছিল, তার শাগরেদ দেবুর মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল, সেদিন ওই দু’জনের বাড়ি ফেরার মতো শরীরের জোর ছিল না। সাধু একটা রিকশা ডেকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল ইশারায়, চোয়াল নাড়াবার মতো অবস্থা তার ছিল না। রাধেশ্যাম পাগলের মতো চিৎকার করেছিল, ‘অহনো ভগমান আচে, বুঝলা আচে। দীন—দুঃখীর ডাকে অহনো সাড়া দ্যায়। আমার পোলাপানগুলোর সেই শুকনা মুখ—”
সাধু ও দেবুর প্রচণ্ড মার খাওয়া দেখে আনন্দে রাধেশ্যামের ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর কারণও ছিল। একবার সাধু তার রিকশায় চড়ে ভাড়া দেয়নি। না দেওয়াই তার রীতি। যেমন মিষ্টির দোকানে খেয়ে, লণ্ড্রিতে কাপড় কাচিয়ে বা হকারের কাছ থেকে ম্যাগাজিন নিয়ে টাকা না দেওয়াটাও তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। রাধেশ্যাম সেদিন ভাড়া না পেয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ করেছিল। তাইতে বহু লোকের সামনেই সাধুর ছেলেরা তার রিকাশার একটা চাকা খুলে নিয়ে যায়। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি, বরং রাধেশ্যাম যে চেঁচামেচি করে পাড়ার শান্তি বিপন্ন করল, এজন্য তারা খুবই ক্ষুব্ধ হয়। পনেরো টাকা জরিমানা দিয়ে সাতদিন পর সে চাকাটা ফেরত পায়, সেজন্য তাকে কর্জ করতে আর সুদে—আসলে ধার শুধতে দিয়ে হয় মোট পঁচিশ টাকা। সাতটা দিন তার আধপেটার সংসারকে সিকিপেটা থাকতে হয়েছিল।
শিবার হাতে সাধু আর দেবু বেদম মার খাওয়ার পর রিকশা চেয়েছিল। হেঁটে ফেরার মতো অবস্থা তাদের ছিল না। তখন রাধেশ্যামের গাল বেয়ে জল ঝরছিল আর বলছিল, ”সাক্ষাৎ শিবরে আইজ চক্ষে দ্যাখতাসি…” তখন ননী তার বাবার হাত ধরে শান্ত স্বরে বলেছিল, ”বাবা তুমি চুপ করো, এই দুডারে রিকশায় কইরা আমিই পৌঁছাইয়া দিমু।” তারপর সে আরও ঠাণ্ডা শক্ত গলায় বলেছিল, ”রিকশাডারে সোজা বনোয়ারির নাদার গর্তে লইয়া ফ্যালামু।” বনোয়ারি গোয়ালার আটটা গোরু—মোষের খাটালের কিনারে গভীর একটা গর্ত আছে, সেখানে গোবর জমানো হয়, দু’ হপ্তা অন্তর বিক্রির জন্য। ননী অবশ্য রিকশাটাকে সেই গর্তে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি, কারণ সাধু তার রিকশায় উঠতে অস্বীকার করেছিল।
.
আলুর দমের ডেকচিটা রিকশার পাদানিতে সাবধানে রেখে শিবা বলল, ”হয়েছিল কী? মার খেলি কেন?’
”কইতাচি।” নদী রিকশার সিট তুলে ঢাকনা লাগানো একটা প্লাস্টিকের কৌটো বার করে বলল, ”একডা না, তোমারে ওস্তাদ কই, তুমি দুইডাও দাও। ইজ্জত বাঁচনের ব্যাপার কিনা।”
শিবা প্রথমে একটা, পরে আর—একটা আলুর খণ্ড কৌটোয় রেখে আড়চোখে তাকাল। ননী তখন গভীর মনোযোগে টায়ারের হাওয়া পরীক্ষায় ব্যস্ত। উৎকণ্ঠায় ভুরু কোঁচকানো। শিবা তৃতীয় খণ্ডটি কৌটোয় রাখতেই ননীর ভুরু সমান হয়ে প্রায় উদাসীনতার পর্যায়ে চলে গেল। ”নাহ, হাওয়া ঠিকই—” বলতে—বলতে কৌটোয় ঢাকনা এঁটে সিটের নীচে রেখে দিল।
প্যাডেল করতে—করতে ননী বলল, ”বাসী রুটি দিয়া আলুর দম, বুঝলা ওস্তাদ, অ্যামন খাওয়া হগ্গের—”
”বুঝেছি। ডিম নিতে যাব, তাড়াতাড়ি চালা।…বল এবার, কেন মার খেলি?
”কাল সন্ধ্যায় ব্যালঘরিয়ায় গ্যাছিলাম একডা ফ্যামিলিরে লইয়া…।” এর পর ননী যা বলল তার সংক্ষিপ্তসার: লোডশেডিংয়ের জন্য সরু রাস্তায় কতটা কিনার দিয়ে গেলে নালায় পড়বে না তাই নিয়ে সে খুবই ভাবিত ছিল। ফলে রাস্তার ধারে রাখা স্কুটারটা সে দেখতে পায়নি। রিকশার চাকার ধাক্কায় স্কুটারটা জমিতে পড়ে যায় । ব্যস, হইহই করে কয়েকটা লোক ছুটে এসে তাকে পিটোতে শুরু করে। যাই হোক, চড়চাপাটি, লাথি—ঘুসি খাওয়ার পর ননী আবিষ্কার করল এবং এইটিই মোক্ষম আঘাত, তার সওয়ার ফ্যামিলিটি অন্ধকারে ইতিমধ্যে মিলিয়ে গেছে। ”আসল মারডা ওস্তাদ অরাই মাইরা গেল। ছয়—ছয়ডা ট্যাহা…।” ননী আফশোসে মাথা নাড়ল।
