গন্ধটা নাক দিয়ে শরীরের মধ্যে পাঠিয়ে সে নিশ্বাস বন্ধ করে রাখত। তখন সারা শরীরে একটা ঝিমঝমে ভাব তৈরি হত। বারবার ঢোক গিলে চেষ্টা করত গন্ধটাকে পাকস্থলিতে চালান করার। তখন পেট জুড়ে একটা ব্যথা ছড়িয়ে যেত। ফুটন্ত মাছের ঝোলের বা ডালের বগবগ শব্দও সে শুনতে পেয়েছে কোনও—কোনওদিন। একটা বড় থালা দিয়ে মা কড়াইয়ের মুখ ঢেকে দিলে শব্দটা বন্ধ হয়ে যেত, গন্ধটাও আর পাওয়া যেত না। এক—একদিন সে ভাবত, মাকে বলবে কড়াইটা ঢেকে না দিতে। ওই রান্নার শব্দ আর গন্ধর জন্যই তো সে সারাদিন জানলাটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত।
বিরাট কড়ায় আঠারোজনের রান্না হয়। মা নামাতে পারত না, হরিহরকে ডাকতে হত কড়া নামাবার জন্য। তখন সে কল্পনা করত, মুখুজ্যেবাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার আগে দালানে সার দিয়ে খেতে বসেছে। গরম—গরম ভাত, ডাল, তরকারি, মাছের ঝোল। সবই তার মায়ের হাতে রাঁধা। ওই সারির মধ্যে রয়েছে রঞ্জুও। সেজোবাবুর ছেলে রঞ্জন, তারই বয়সী। ধবধবে ফরসা গায়ের রং। বি টি রোড থেকে স্কুলবাসে ওঠার জন্য সে হরিহরের সঙ্গে হেঁটে যেত। পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে রঞ্জুর হাঁটা দেখতে তার খুব ভাল লাগত।
রান্নাঘরের জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ওদের খাওয়ার দৃশ্য সে কল্পনায় দেখত। খেতে—খেতে রঞ্জুর মুখে তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠেছে, এটাই সে ভেবে নিত। রঞ্জুর তৃপ্তিকে নিজের তৃপ্তি করে নেওয়ার জন্য সে মনে—মনে চেষ্টা করলেই তখন পাকস্থলিটা ঘুলিয়ে উঠে মুখে জল জমা হত । কিন্তু কান তার সজাগ থাকত একটা কথা শোনার জন্য, ”শিবা হাত বাড়া।”
জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে মায়ের হাতটা বেরিয়ে আসত। শালপাতা অথবা কাগজে মোড়া ভাত, ডাল, তরকারির একটা মণ্ড থাকত তার মধ্যে। সেটা হাতে নিয়েই বিদ্যুদ্বেগে সে জানলা থেকে সরে গিয়ে, ভাঙা পাঁচিল টপকে বাড়ির দিকে ছুটত। মণ্ডটা থেকে গরম ভাপ তালু বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে যেত তখন।
দিলু আর নিলু ঘরের কাছাকাছিই অপেক্ষা করত। তাকে দেখামাত্রই ”মেজদা এসে গেছে” বলে ছুটে আসত। তাকে ঘিরে ওরা দাওয়ায় উবু হয়ে বসত। জাদুকর যেভাবে টুপির মধ্য থেকে খরগোশ বার করে সেইভাবে সে শালপাতা বা কাগজের মোড়কটা খুলত। ভাত, চচ্চচড়ি বা সিদ্ধ ডাল, এইরকম কিছুই বেরিয়ে আসত। দিলু বা নিলু, কেউ একজন, ”ই ই ই” বলে আওয়াজ করে উঠত।
কিন্তু একদিন তারা ধরে পড়ে গেল।
নিশ্চয় কেউ তাদের লক্ষ করেছিল। হাতেনাতে ধরার জন্য তক্কে—তক্কে ছিল। মা ”শিবা আছিস” বলে ডাকতেই সে জানলার সামনে এসে হাত বাড়ায়। মা শালপাতার মোড়কটা যখন হাতে দিয়েছে তখন সে দেখতে পায়, রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গিন্নিমা তাকিয়ে রয়েছে।
সে ছুটে পালাতে যেতেই একেবারে হরিহরের মুখোমুখি। তার চুলের মুঠি ধরে হরিহর টেনে আনল বাড়ির মধ্যে। সে দেখতে পেল গিন্নিমার পা জড়িয়ে ধরে মা কী একটা কথা বলার চেষ্টা করছে। গিন্নিমাকে গালে হাত দিয়ে বলতে শুনেছিল, ”বলো কী! এগারো বছর মাত্র বয়স, দেখে তো মনে হয় ষোলো—সতেরো!”
”সত্যি বলছি মা, ও বাচ্চচা ছেলে, ওকে মারবেন না। দোষ আমারই, আমিই চুরি করে ওকে দিয়েছি। ওর কোনও দোষ নেই মা। পেটের জ্বালায় বাচ্চচা ছেলেগুলো ছটফটায়, মাথার ঠিক রাখতে পারিনি মা। ওদের উপোসি মুখ চোখ দিয়ে আর দেখতে পারি না।”
তখন সে মায়ের চোখ দুটো দেখেছিল। ভয়, নিদারণ একটা ভয় সেই চোখে। চাকরিটা চলে যাবে। ষোলো বছরের বড় ছেলে নিতু চার টাকা রোজ—এ কারখানায় কাজ করে। তার রোজগারের টাকায় পাঁচটা পেট চালানো মানে একবেলা দু’ মুঠো ভাতও নয়, হয়তো এইজন্যই ভয় কিংবা এগারো বছরের ছেলে চোরের মার খাবে বা পুলিশের হাতে যাবে, হয়তো সেইজন্যও।
শিবা তার জীবনের প্রথম ভয়কে দেখেছিল মার চোখে। তখন বয়স এগারো। সেই প্রথম শুনেছিল তার শরীরের আকারটি বড়, অন্তত পাঁচ—ছ’ বছর টপকিয়ে তার শরীর এগিয়ে রয়েছে। মায়ের সেই ভীত চাহনি একজোড়া গরম লোহার শিকের মতো সঙ্গে—সঙ্গে তার চেতনায় গেঁথে গেছল। তার যন্ত্রণা কখন যে নিঃসাড়ে শিরা—উপশিরা দিয়ে পেশীতে ছড়িয়ে গেছল, সে টের পায়নি। হরিহর একটা প্রচণ্ড থাপ্পড়ে তাকে যখন উঠোনে ফেলে দেয়, সে কোনও ব্যথা বোধ করেনি। তার সর্বাঙ্গ মায়ের চাহনি থেকে পাওয়া ভয় আর লজ্জায় অসাড় হয়ে ছিল। সে তখনই জেনে যায় ভয় একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এর মধ্যে ডুবে থাকার সময় খুব জোরে আঘাত এলেও দেহ তা শুষে নেয়।
এর কিছুদিন পর বিয়েবাড়ির বাসি খাবার খেয়েছিল ওরা তিন ভাই। চাকর ফেলে দিচ্ছিল, শিবাই চেয়ে এনে, রেলপুকুরের ধারে লুকিয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে দিলু—নিলুকেও খেতে দেয়। সন্ধ্যায়। পরদিন সকালে ওদের দু’জনের ভেদবমি শুরু হতেই সে ভয়ে কথা বলতে পারেনি। দিলু—নিলু রাত্রে মারা যায় বিনা চিকিৎসায়। সে রক্ষা পেল কী করে, তাই নিয়ে অনেক ভেবেও কোনও কারণ খুঁজে পায়নি। কলেরাকেও তার শরীর শুষে নিয়েছিল।
.
সিনেমা চলতে—চলতে হঠাৎ ফিল্মের রিল ছিঁড়ে যাওয়ার মতো, অতীতে ফিরে গিয়ে পুরনো একটা ঘটনা দেখা বন্ধ হল ননীর ডাক শুনে।
”চাইরবার চিল্লালাম ‘ওস্তাদ ওস্তাদ’ কইরা, মনডা কি ডেচকির মদ্যে আলুর দমের সাথেই ঢাকনা দিয়া রাখলা?” ধীরে প্যাডেল করতে—করতে ননী শিবার পাশাপাশি সাইকেল রিকশাটাকে চালিয়ে যেতে—যেতে বলল।
