বিটি রোড থেকে প্রায় এক মাইল পশ্চিমে গঙ্গার ধারে, পার্কিনস জুট মিল—এর কাছে ফিডার রোডের মোড়ে সাত—আটটি চায়ের ও খাবারের দোকানের একটি হল নিতুর। তিন বছর আগে সে শুধু আলুর দমের ডেকচি, থলিভরা পাঁউরুটি, জলের বালতি ও কয়েকটি চায়ের প্লেট নিয়ে খোলা আকাশের নীচে তার ব্যবসা শুরু করেছিল। এখন বাঁশের খুঁটিতে লম্বায় ও চওড়ায় চার হাত করে পলিথিন চাদরের চালা, ইট আর মাটি দিয়ে তৈরি কোমর সমান উঁচু কয়লার উনুন, যাতে চা, ওমলেট ও রুটি সেঁকা হয়। বালতি এখন তিনটে। কাচের গ্লাস ও প্লেট দু’ ডজন করে।
নিতুর প্রথম কাজ সকালে এসে উনুন ধরানো, সাইকেল ভ্যানে বেকারি থেকে পাউরুটি দিয়ে গেলে সেগুলো চার টুকরো করা, চায়ের জল গরম করা ইত্যাদি। তার আগে অবশ্য গ্লাস, প্লেট, অ্যালুমিনিয়ামের মগ, সসপ্যান, চা তৈরির সরঞ্জাম, ঘুঁটে—কয়লা ইত্যাদি যেসব জিনিস রাত্রে বাড়ি ফেরার আগে অধীরের সাইকেল গ্যারাজের এককোণে রেখে দেয়, সেগুলো নিয়ে আসে। রাখার জন্য মাসে চল্লিশ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এই অধীর নন্দীই নিতুকে এখানে খাবার বিক্রির জন্য বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে জুট মিলের ইউনিয়ন, থানার মেজোবাবু আর মিউনিসিপ্যালিটির স্থানীয় কমিশনারের সঙ্গে ব্যবস্থা করে। তবে সেজন্য সে শর্ত দিয়েছিল, ”যখন গ্যারাজে থাকব না, তখন নজর রাখবি চুরিটুরি যেন না যায়, আর ঝামেলাটামেলা হলে দৌড়ে আসবি। তুই না তুই না, শিবা যেন এসে দাঁড়ায়।”
শর্তের কথা শুনে শিবা ক্ষুব্ধ হয়ে নিতুকে বলেছিল, ”আমাকে ভেবেছে কী, গুণ্ডা? আমি গিয়ে মারামারি করব?”
”আহহ, এটা একটা মাথাগরম করার মতো কথা নাকি?” ভাইকে ঠাণ্ডা করার জন্য নিতু বলে। ”ওখানে পা রাখার মতো একটা সুযোগ প্রথমে দরকার। অধীরদা যা বলে, শুনে যাওয়া আর ঘাড় নাড়া। ঝামেলা যদি হয়ই, মিটমাট করে দিবি। মারপিটই করতে হবে এমন কোনও কথা আছে কী? মনে রাখিস আমাদেরও ওখানে ব্যবসা চালাতে হবে। মারপিট একদম নয়।”
নিতু গম্ভীর ও কড়া স্বরে শেষ বাক্যটি বলে দিল। শিবা মাথা নিচু করে শুনে বিড়বিড়িয়ে বলে, ”আমার সম্পর্কে কী যে ধারণা লোকের।”
”ওই যে সাধুকে ঘুসি মেরেছিলি, লোকে সেটাই মনে করে রেখে দিয়েছে,” নিতু বলেছিল।
”তারপর, সাধুরা যে আমায় মেরে ছ’ মাস বিছানায় শুইয়ে রাখল—সেটা আর লোকেরা মনে রাখল না।”
নিতু ম্লান হেসে বলেছিল, ”লোকেরা বীরত্বকেই মনে রাখতে চায়, কাপুরুষত্বকে নয়। একের সঙ্গে এক মুখোমুখি লড়াইটাই হল বীরের ধর্ম, কাজ। তুই সেটাই করেছিলি।”
শিবা তখন আড়চোখে তারাময়ীর দিকে তাকিয়ে দেখেছিল, মায়ের চোখ জ্বলজ্বল করছে বড় ছেলের কথা শুনে, আর চাহনি ধরে হালকা মেঘের মতো ছায়ারা ভেসে আসছে তার দিকে।
প্রতিদিন সকালে শিবার প্রথম কাজ, তারাময়ীর রাঁধা আলুর দমের অর্ধেকটারও বেশি একটা বিশাল ডেকচিতে ঘাড়ে নিয়ে এক মাইল হেঁটে সাতটার মধ্যে দোকানে হাজির হওয়া। যাওয়ার পথে ডিম ব্যবসায়ী সতু বাঁড়ুজ্যের দোকান থেকে থলিটা এক হাতে তুলে নেয়, যাতে থাকে পঞ্চাশটা ডিম। তারপর সে খালি ডেকচি নিয়ে দুপুরে ফিরে এসে আবার বাকি আলুর দমটা নিয়ে যায় সন্ধ্যার খদ্দেরদের জন্য।
নিতুর দোকানের আলুর দমের চাহিদা আছে, কেননা তারাময়ীর রান্নার হাতটি অসাধারণ। কিন্তু উনুন থেকে রান্না নামাবার পর প্রতিদিনই তিনি বুকে অতি ক্ষীণ একটা কাঁপুনি বোধ করেন এই ভেবে—ঠিকমতো হয়েছে তো?
আজও তিনি প্রতিদিনের মতো ডাকলেন, ”শিবা আয়।”
স্নান করে এসে শিবা ঘরে চুল আঁচড়াচ্ছিল। অস্ফুটে ”উঁউ” বলে এমন গলায়, যা তারাময়ীর কানে পৌঁছল না।
বাটিতে আলুর দমের ঝোল নিয়ে তিনি ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। ”শিবা ঘরে আছিস?” ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে চুল আঁচড়ানোয় ব্যস্ত শিবাকে দেখে বললেন, ”ঘরে ঢুকব না, হাত বাড়া, ধর তাড়াতাড়ি।”
বন্ধ হয়ে গেল চুল আঁচড়ানো। শিবার সারা দেহ শক্ত হয়ে গেল। ঠিক এই কথাগুলো, প্রায় এই কথাগুলোই ঠিক এইরকম স্বরেই তো মা বলেছিল… কত বছর আগে…কত বছর? মা তখন রাঁধুনির কাজ করত জমিদার মুখুজ্যেবাড়িতে।
ঝোলের বাটিটা হাতে নিয়ে শিবা তারাময়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। উৎকণ্ঠিত মুখ। ঠিক এইরকমই তখন দেখাত মাকে।
”খেয়ে বল, ঠিক হয়েছে কি না, নুন কম হয়েছে? ঝাল?”
”ঝোলে চুমুক দিয়ে কয়েক সেকেন্ড পর শিবা মাথা নেড়ে জানাল, ঠিক আছে।
তখনই কিন্তু শিবার মাথার মধ্যে সামান্য গোলমাল ঘটে গেল। আলুর দমের ডেকচিটা মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে মুখুজ্যেবাড়ির বাগানের পাঁচিলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। পাঁচিল শেষ হওয়ার পর বাঁ দিকে দেবদাস পাঠক রোড, যেটা গিয়ে মিশেছে বি টি রোডে।
পাঁচিলে একটা জায়গা ভাঙা। শিবা ডেকচি মাথায় দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখুজ্যেদের রান্নাঘরটা এই ভাঙা জায়গাটা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। জানলাটায় তারের জাল লাগানো। আগে তো জাল ছিল না! শিবার মাথার মধ্যে শুরু হওয়া গোলমালটা রূপান্তরিত হল ঘূর্ণিঝড়ে। সাঁ—সাঁ করে দশটা বছর পিছিয়ে গিয়ে তার স্মৃতি আছড়ে পড়ল রান্নাঘরের ওই জানলাটার কাছে।
.
উনুনের ঠিক পেছনেই জানলাটা। জানলার বাইরেই আবর্জনার স্তূপ আর কাঁচা নর্দমা। সে দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়াল ঘেঁষে। ওধারে লোহার ফটক। বাগানটা ঝোপঝাড়ে ভরা। একটা কাঁঠাল আর গোটা—তিনেক আমগাছ ছাড়া বাগান বলার মতো আর কোনও বড় গাছ নেই। পাঁচিলের ভাঙা জায়গাটা দিয়ে সে প্রতিদিন ঢুকত। রান্নাঘরের জানলার পাশে কাদা প্যাচপ্যাচে জমিতে নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করত। তখন বারবার দু’ধারে তাকিয়ে দেখত কেউ তাকে দেখে ফেলল কি না। কোনও কোনওদিন আধঘণ্টাও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, যদি রান্নাঘরে গিন্নিমা কিংবা ভৃত্য হরিহর হাজির থাকত। যখন কাদায় পায়ের পাতা ডুবিয়ে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থেকে সে অপেক্ষা করত, রান্নাঘর থেকে তখন ভারী সুন্দর রান্নার গন্ধ ভেসে আসত। জিরে, পাঁচফোড়ন, গরম মশালা, কখনও—বা রসুন বা পেঁয়াজ। এইসব জিনিস দিয়ে রাঁধা খাবার তাদের বাড়িতে হত না।
