”না, না, মামি, এতদিন হয়ে গেল, ব্যথাটাথা কিছু নেই, একদম ফিট।” শিবা তাড়াতাড়ি তার শারীরিক ক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণাটা ভেঙে দেওয়ার জন্য আর—একটু যোগ করল, ”দু’বার ডেকচিভরা আলুর দম ঘাড়ে নিয়ে এক মাইল যেতে হয়, বালতি—বালতি জল টিউকল থেকে বয়ে আনতে হয়, প্লেট, গ্লাস ধুতে হয়, খদ্দেরকে দেখতে হয়, এসব কি শরীরে ক্ষমতা না থাকলে করা যায়?”
পূর্বপল্লী আর দেবদাস পাঠক রোডের বহু লোকের মনে ধারণা তৈরি হয়ে গেছে, শিবার শরীরে আগের মতো আর জোর নেই। সাধুর লোকেরা যেভাবে মেরে রাস্তায় ফেলে রেখে দিয়েছিল, তারপর তো শক্তি ফিরে পাওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। বক্সার হিসেবে ও তো শেষ হয়েই গেছে। সবাই ওকে একটু করুণার চক্ষেই দেখে। এজন্য সে অস্বস্তি বোধ তো করেই, মনে মনে রেগেও ওঠে। গায়ে জোর নেই, এটা তার কাছে লজ্জার ব্যাপার।
দাওয়ায় জলভরা বালতিতে প্লাস্টিকের মগ ভাসছে। শিবা মগে জল নিয়ে মুখ ধুয়ে চলে যাওয়ার জন্য দু’ পা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল। ”মামি, এখানকার গুণ্ডা—মাস্তানরা ঘুসোঘুসি করে না, তাই তাদের গায়ের জোর থাকারও দরকার হয় না। বোমা, পিস্তল, পাইপগান আর চার—পাঁচজনে চেপে ধরে একজনকে ছোরা মারার জন্য কি এক্সাইজ করার দরকার হয়?”
”সাধুর শরীরে কিন্তু প্রচণ্ড জোর আছে, একসময় ও এক্সাইজ করত।” শক্তি দাসের চোখে, স্বরে সমীহ ও ভয় ফুটে উঠল।
দপ করে উঠেই শিবার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। পুরনো সিনেমার বিবর্ণ ছবির মতো একসার ঘটনা ও মানুষ তার মাথার মধ্যে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। সে ধীরে—ধীরে মাথাটা দু—তিনবার নেড়ে স্বীকার করল কথাটা। হ্যাঁ, সাধুর শরীরে ক্ষমতা আছে, ওয়েটলিফটার ছিল। শিবা কথা না বলে চলে গেল।
”শিবার গায়েও জোর আছে।” সাগরমামি নরম গলায় বলল শিবার ঘাড় আর পিঠের দিকে তাকিয়ে।
”জোর বলে জোর। ওর একটা ঘুসিতেই সাধু চিতপটাং হয়েছিল, তখন তো ওর বয়স মাত্র সতেরো!” শক্তি দাস প্রায় চার বছর ধরে তার জমিয়ে রাখা বিস্ময় থেকে খানিকটা ব্যয় করে ভারমুক্ত হল। ”এখন সে বিত্তান্ত কাউকে বললে তো ভাববে গাঁজায় দম দিয়ে গপ্পো ফাঁদছি!”
”কাউকে বলার দরকার কী? যেমন দাঁতন করছ তাই করো, শিবা যেমন আছে তেমনই থাক।” নিঃসন্তান সাগরমামি স্বামীর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ঘরের মধ্যে যাওয়ার সময় বলল, ”সাধটাধ পূরণ করার ইচ্ছেটা আর ওর মধ্যে চাগিয়ে তুলো না।”
”চাগিয়ে কি আর তুলতে হয়, এসব ব্যাপার আপনা থেকেই হয়ে যায়।” দাঁতনকাঠিটা চিবোতে—চিবোতে শক্তি দাস আপন মনে বলল, ”ঘুসিটা কি আর আগে থেকে ভেবেচিন্তে তারপর মেরেছিল? ওটা না মারলে শিবা কোনওদিন কি বক্সার হতে পারত? ঘর থেকে স্ত্রীকে বেরিয়ে আসতে দেখে শক্তি দাস এবার জোরে—জোরে দাঁতন ঘষতে শুরু করে দিল।
যে বৃত্তান্তর কথা শক্তি দাস উল্লেখ করল, সেটা লোকের মুখে—মুখে পল্লবিত হয়ে এখন কিংবদন্তির চেহারা নিয়েছে। এই অঞ্চলে নবাগত কাউকে সে কাহিনী বললে সত্যিই সে বিশ্বাস করবে না।
দুর্দণ্ড প্রতাপশালী সাধন ঘোষ, যে এখন অনেকের কাছে সাধনবাবু বা সাধুদা, কয়েক বছর আগে সে কিন্তু সবার কাছে পরিচিত ছিল সাধু গুণ্ডা নামে। তখন বোমা, ছোরা, পাইপগান নিয়ে রাহাজানি, গুণ্ডামি, ট্রাক থেকে মাল লুট ছাড়াও, দাঙ্গা বাধানো, ধর্মঘট ভাঙা, ভাড়াটে তোলা, ভোটের বুথ দখল করা, বস্তিতে আগুন দেওয়া, রাস্তার বাজার থেকে তোলা আদায়, এমনকী স্কুলের পরীক্ষায় টোকাটুকির ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা ব্যাপারে সাধুর কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল।
গত তিন বছর ধরে সে একটা কালীপুজো করছে ধুমধামিয়ে । তার পাড়া মিলনপল্লী থেকে বি টি পর্যন্ত সাতদিন আলোর বন্যায় ভেসে যায়। সর্বত্র লোডশিডিং হলেও সাধুর কালীপুজোয় হয় না। পুজোয় সে পঞ্চাশজন গরিবকে বস্ত্র বিতরণ করে। এম.পি., এম.এল. এ, ফুটবলার, ফিল্মস্টাররা আসে, গানের ফাংশন হয়, গুণিজন সংবর্ধনা হয়, যাত্রা হয়, তিনদিন সিনেমা দেখানো হয়। এলাকায় সাধু খুবই জনপ্রিয়। বহু লোক ওকে ভক্তিশ্রদ্ধাও করে। বছরে একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ের যাবতীয় খরচ সে দেয়। এজন্য কেউ—কেউ তাকে রবিনহুডের সঙ্গে তুলনা করে।
কিন্তু চার বছর আগে সাধু যখন ভয়াবহ গুণ্ডা হিসেবেই পরিচিত অর্থাৎ যখনও সে ‘বাবু’ হয়ে ওঠেনি, সেই আমলের একটা সন্ধ্যায় ঘটনাটা ঘটেছিল।
শিবা তাকে ঘুসিটা মেরেছিল।
।। ৩ ।।
দশ কিলোগ্রাম আলু, তারই দম। রাত্রে সমান মাপে আধখানা করে আলুগুলো কেটে সিদ্ধ করে রাখেন তারাময়ী। ভোরবেলায় কয়লার উনুন ধরিয়ে তিনি আলুর দম তৈরি করতে বসেন। নিতুর নির্দেশমতোই ঝোলটা বেশি, ঝালটাও বেশি, এমন একটা দম তাকে তৈরি করতে হয় যাতে রসুনের গন্ধটা যেন নাকে লাগে। জুট মিলের মজুররা এমন জলখাবারই পছন্দ করে যেটা দামে শস্তা, খেতেও বেশ! পাউরুটি কোয়ার্টার পাউন্ড আর আলুর দম দু’ টুকরো দেড় টাকা। ওরা ঝোলটাই বেশি করে চায়। একটার সময় টিফিনের ভোঁ বাজলে নিতু আর শিবার দম ফেলার সময় হয় না। দশ কিলো আলুর দম আর কুড়ি থেকে পঁচিশ পাউন্ড পাউরুটি আধ ঘণ্টায় উড়ে যায়। এইসঙ্গে আছে চা আর ওমলেট।
