ছবিটা শিবার মৃত বাবা দয়ালচাঁদ আইচ—এর। লম্বাটে মুখ, পাতাকাটা চুল, আয়ত চোখ দুটিতে আত্মবিশ্বাস ও জেদ প্রকাশ পাচ্ছে। স্কুলে পড়ার সময় বিয়াল্লিশের ”ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে আট মাস জেল খাটেন। বড় ছেলের নাম নেতাজি ও মেজো ছেলের নাম শিবাজি রেখেছিলেন সংগ্রামী মানসিকতাকে শ্রদ্ধা জানাতে। তার পরের দুটি ছেলে, যারা অল্পবয়সে কলেরায় মারা যায়, তাদের নামের সঙ্গে কোনও দেশবরেণ্যর স্মৃতি আর তিনি জড়াননি। তারা শুধুই দিলীপ আর নীলেশ। প্রায় ভিখারি অবস্থায়, তিক্ত, ভগ্ন হৃদয়ে, বিনা চিকিৎসায় তিনি যক্ষ্মা রোগে মারা যান এই ঘরে। জমিদার মুখুজ্যেদের পোড়ো জমি তাঁরই নেতৃত্বে জবরদখল করে গড়ে উঠেছে ‘পূর্বপল্লী’, নামকরণ দয়াল আইচেরই।
ঘরের কোণে একটা বেঞ্চ। তার ওপর গোল করে পাকানো দুটো মাদুর মোড়া কাঁথা ও বালিশ। শিবা তার নিজের শয্যা অর্থাৎ কাঁথা—মাদুর ওই দুটির ওপর রেখে দিল। একটা টেবিল ঘরের অন্য দেওয়াল ঘেঁষে। সেখান থেকে গুঁড়ো মাজনের কৌটোটা তুলে ঢাকনা খুলেই শিবা ভ্রূ কোঁচকাল। চেঁচিয়ে বলল, ”মা, নিতুদা মাজন শেষ করে রেখে গেছে। এখন কী করি?”
ঘরের বাইরে চার হাত চওড়া মাটির দাওয়া। টালির চালটা তার ওপর এত ঝুঁকে পড়েছে যে, মাথা নামিয়ে বাইরে থেকে দাওয়ায় উঠতে হয়। দাওয়ায় এক প্রান্তে ইটের কোমর—উঁচু দেওয়ালে ঘেরা অংশটা রান্নার জায়গা। করুণা তখন উনুনে কয়লা সাজাচ্ছিলেন। চেঁচিয়ে বললেন, ”কি আবার করবি, ছাই দিয়ে মেজে নে।”
”না।” শিবা বিরক্ত মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ”ওতে দাঁত খারাপ হয়ে যায়।”
দাওয়া থেকে নেমে ডান দিকে প্রায় কুড়ি হাত দূরের তাদেরটার মতোই আর—একটা টালির ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল।
”মামি আছ নাকি?”
”কেন রে শিবা?” ঘরের ভেতর থেকে সাগরমামি সাড়া দিল।
”তোমার কাছে মাজন আছে, সাদা মাজন?” আমাদের ফুরিয়ে গেছে।”
”দাঁড়া দিচ্ছি।”
সাগরমামি ঘর থেকে বেরিয়ে এল, হাতে লাল প্লাস্টিকের একটা কৌটো। পেছনে তার স্বামী শক্তি দাস।
”এইসব মাজনটাজনে দাঁত মাজিস না, এতে দাঁত শক্ত হয় না।” শক্তি দাসের হাতে নিমের দাঁতন। সেটা চিবোতে শুরু করল। ”এই যে নিমের রস, এটা শুধু দাঁতেরই নয়, লিভারের পক্ষেও ভাল।”
সাগরমামি কড়া চোখে একবার স্বামীর মুখে তাকিয়ে কৌটোটা শিবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ”আধ ঘণ্টা ধরে নিমের কাঠি চিবোতে গেলে মেয়েদের চলে না।”
”তুমি ঢেলে দাও।” শিবা বাঁ হাতের তালু মেলে ধরল। কৌটোর ঢাকনা খুলে ঝাঁকিয়ে মাজন বার করতে গিয়ে সাগরমামি থমকে গেল।
”তোর আঙুলটা তো এখনও বাঁকা রয়ে গেছে!”
শিবার বাঁ হাতের তর্জনীটা দু’ আঙুলে ধরে সাগরমামি নাড়ানাড়ি করে দেখতে লাগল।
”আগে আরও বাঁকা ছিল।” শিবা বলল।
”ব্যথা করে?”
”না, একদমই না।” শিবা হাসল।
”কতদিন হল বল তো?”
”সাড়ে তিন বছর তো হবেই।”
কৌটোটা ঝাঁকিয়ে তালুতে মাজন ঢেলে সাগরমামি বলল, ”তবু ভাল, বড়রকমের কোনও অঙ্গহানি হয়নি। যা মার তোকে মেরেছিল, ভাবলে এখনও শিউরে উঠি।”
‘ওদের টার্গেট ছিল শিবার দুটো হাত। আর যাতে না ঘুসি ছুড়তে পারে সেজন্য অকেজো করে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য।” শক্তি দাস বহুবার বলা এবং শোনা কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করল। শুধু নতুন একটা কথা যোগ করল, ”শিবার ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান হওয়ার সাধটা আর পূরণ হল না। ওই একবারই যা ফাইনালে—”
শিবা তখন ডান হাতের তর্জনীতে মাজন লাগিয়ে দাঁতে ঘষতে শুরু করে দিয়েছে। ঘষা বন্ধ রেখে শক্তি দাসের দিকে একবার তাকাল। কিছুই বলল না। চাউনি থেকেও বোঝা গেল না ব্যাপারটা নিয়ে সে কখনও ভেবেছে কি না।
”না শিবা না, ঘুসোঘুসিতে আর যাসনি।” সাগরমামির আন্তরিকতা তার চোখে ফুটে উঠল। ”এ বড় মারাত্মক খেলা। তুই এইই ভাল আছিস। গরিবের ছেলে গতর খাটিয়ে কাজকম্মো করে খেতে হবে, ঘুসোঘুসি গুণ্ডা—বদমাশরা করুক।”
”আহহা, শিবা গুণ্ডা হওয়ার জন্য ঘুসি চালাবে নাকি? এর নাম বক্সিং, রীতিমত শিক্ষা করতে হয়, ট্রেনিং করতে হয়। লড়াই হয় মোটা কাছি দিয়ে ঘেরা উঁচু একটা দালানের মতো জায়গায়…সেদিন শ্রীকান্তদার ঘরে টিভিতে দেখলে না, দু’জনে লড়ছিল। হাতে পরা ছিল বস্তার মতো দুটো গ্লাভস। ওটা পরে ঘুসি মারলে তেমন লাগে না।”
”লাগে না তো, ঘুসি খেয়ে একজন দড়াম করে চিতপটাং হয়ে আর উঠল না কেন? বাজে বকা তোমার একটা ওব্যেস। লাগে কি লাগে না তা আর আমায় বোঝাতে এসো না।”
সাগরমামির মুখঝামটা ভোরবেলায় আরম্ভ হলে সেটা রোদ চড়ার সঙ্গে—সঙ্গে একই তেজে চড়বে। শক্তি দাস দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত তার এই জ্ঞানটুকু এবার বিজ্ঞতা সহকারে প্রয়োগ করল।
”দড়াম করে চিতপাত হল কেন, সেটা তোমার মতো বুদ্ধিমতীকে কি বুঝিয়ে দিতে হবে? একজনের ঘুসির জোর বেশি, আর—একজনের শরীরের ক্ষমতা কম, ব্যস। শিবার শরীরের ক্ষমতা আমার থেকে বেশি, এই আমি যদি এখন ওকে ঘুসি মারি—” শক্তি দাস দাঁতনটা দাঁতে চেপে দু’হাতের ঘুসি পাকাল। সাগরমামির চোখও সঙ্গে—সঙ্গে বিস্ফারিত হল।
”তার মানে? তুমি ওকে ঘুসি মারবে নাকি? খবদ্দার বলছি, এই সেদিন অত ঝড় বয়ে গেল ওর শরীরের ওপর দিয়ে, ছেলের অখনও গায়ের ব্যথা মরেনি।”
