‘ডিমটারে কি করবেন? আমারে দিয়া দেন, খিদে লাগছে।’
হাত বাড়িয়ে ননী এগিয়ে এল, শচীন তাড়াতাড়ি ওর হাতে ডিমটা তুলে দিল। সেটা হাতে নিয়ে ননী কামড় দিতে গিয়ে দিল না। ফিরিয়ে দিল শচীনকে।
‘নাহ, একসাথেই খাব। ওস্তাদরে আগে ফিট কইর্যা তুলি। ওরে কবে বাড়ি নিয়া যেতে হবে?’
‘ডাক্তার ত বললেন দিন দশেকের আগে নয়।’ নিতু উদ্বিগ্নস্বরে বলল।
‘অঃ, ফিট হইতে আরও মাস দুয়েক। অ কিসু না। তারপর আবার—’ ননী ডান হাত মুখের কাছে ধরে বাঁ হাতে দু—তিনটে জ্যাব ছুঁড়ল। ‘তোর থলিমলি, দড়িদড়া সব তদ্দিনে রেডি হইয়া যাইব। বুঝলেন স্যার, শিবা বড়া জবরদস্ত আদমি। ধর্মেন্দর কা মাফিক বহুত বড়া ফাইটার হ্যায়।’
শিবা একদৃষ্টে তাকিয়ে ননীর মুখের দিকে। তার মনে হচ্ছে ননীর চোখে জল, সকলের চোখে জল। কোথায় যেন একটা নাড়ির বাঁধন রয়েছে এদের সঙ্গে তার। চোখের জলের সঙ্গে সঙ্গে নাড়ির মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়ে আসছে তার মনে, তার চেতনায়। সে যেন নতুন করে জন্মাচ্ছে। এইবার তার কান্না পাচ্ছে। শিশুকে যখন মাতৃজঠর থেকে বার করা হয় তখন সে কেঁদে ওঠে। শিবা সেইভাবে কেঁদে উঠতে চায় এখন। এখন তার মনে হচ্ছে এদের ভালবাসাই ছিল তার ক্ষমতা, শক্তি। নিজেকে তার নতুন মনে হচ্ছে।
‘শিবা আমার ছোট থেকেই বাড়ন্ত।’ প্লাস্টারের বাইরে যতটুকু শরীর, তাতে হাত বুলোচ্ছে মা। ‘ওকে বড় ভেবে সবাই বড়দের মতো ব্যবহার করেছে। ওর শিশুমনের কথা কেউ ভাবে নি।’
শিবার প্লাস্টারে মোড়া শরীরের মধ্যে তখন একটা কান্না গোমরাচ্ছে। চোখবন্ধ করল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। চোখের কোল বেয়ে জল নামল।
‘ব্যথা করছে, যন্ত্রণা হচ্ছে শিবা?’ সাগর মামী ঝুঁকে পড়েছে। শিবা চোখ খুলল না। সে তখন মনে মনে বলছে, তোমাদের সবার পা আমার মুখের কাছে আনো আমি চাটব।
শিবার ফিরে আসা
শিবার ফিরে আসা – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
।।১।।
হাসপাতালের ডাক্তার বলেছিলেন, একদম নড়াচড়া নয়। পাঁচ হপ্তা পর প্লাস্টার খোলা হবে।
সেদিন তার বেড—এর পাশে ওরা সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল।
শ্রীকান্তদা বলেছিল, ”কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় শরীরে অত আঘাত নিয়ে অতটা ছুটে যাওয়া! ওটা আমার কথা নয়, ডাক্তারবাবুই বললেন। পাজরে, পেটে, মাথায়, কোথায় না মেরেছে, হাত দুটোর অবস্থা তো…”
ভবানী—সার বলেছিলেন, ”তোমার পক্ষে এখন কথা বলা তো সম্ভব নয়, পরেই নয় বলব। মনের জোর এবার তোমায় সারিয়ে তুলবে।”
শচীনকাকু একটা খোলা ছাড়ানো সিদ্ধ ডিম বার করে মুখের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিল। তখন সাগরমামি ছোট্ট একটা ধমক, ”খাবে কী, চিবিয়ে কিছু খাওয়ার ক্ষমতা কি ওর আছে?”
”ডিমটারে কী কইরবেন?” ননী বলেছিল। ”আমারে দ্যান, ক্ষুধা লাগচে।” ডিমটা শচীনকাকুর হাত থেকে তুলে নিয়ে, কামড় বসাতে গিয়ে থমকে গেছল ননী। ”নাহ, আগে ওস্তাদরে ফিট কইরা তুলি, তারপর ভাগ কইরাই খামু। অ নিতুদা, অরে কবে বাড়ি লইয়া যাইতে পারুম?”
”ডাক্তার তো বললেন, দিন দশেকের আগে নয়।”
”অঃ। তারপর ফিট হইতে—হইতে আরও তিন—চার মাস, এইডা কোনও সময়ই না।” তারপর মুখের কাছে ঝুঁকে ননী বলেছিল, ”তোর বস্তাফস্তা, দড়িদড়া, গ্লাভস সব তদ্দিনে আবার রেডি হইয়া যাইব।”
প্লাস্টারের বাইরে যতটুকু শরীর, তাতে হাত বুলোতে—বুলোতে মা বলেছিল, ”ছোট থেকেই বাড়ন্ত গড়ন। বেশি বয়সী ভেবে সবাই ওর সঙ্গে বড়দের মতো ব্যবহার করেছে, ওর মনটা যে বাচ্চচা হয়ে গেছে সেটা আর কেউ ভেবে দেখেনি।”
চোখ দুটো এধার—ওধার ঘুরিয়ে শিবা সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। ঘাড় ঘোরাবার ক্ষমতা ছিল না। তখন তাকে দেখাচ্ছিল মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত প্লাস্টারে মোড়া মমির মতো।
সেই সময় তার মনে হচ্ছিল, যন্ত্রণা তার শরীরে নয়, সেটা যেন, যারা তার বেড ঘিরে দাঁড়িয়ে, তাদেরই মনে। সবার চোখ ব্যথায় ঘন, নরম, ছলছল হয়ে রয়েছে। তখন তার মনে হয়েছিল, একটা নাড়ির বাঁধন যেন রয়েছে তার সঙ্গে দেবদাস পাঠক রোডের দু’ ধারের মানুষদের, তার সঙ্গে ‘পূর্বপল্লী’ কলোনির প্রতিবেশীদের। ওদের চাহনিতে কী একটা যেন রয়েছে, শিবা সেটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল সে আবার নতুন করে যেন জন্মাচ্ছে। এইবার সে কেঁদে উঠবে। মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় বাচ্চচা যেমন করে কেঁদে ওঠে, সেইভাবে কান্না তার গলায় উঠে আসছিল। সে তখন মনে—মনে বলেছিল, ”আমি ফিরব, ফিরে আসব, আবার আমি রিং—এ উঠব।”
।। ২।।
”অ শিবা, ওঠ ওঠ।”
কাঁধ ধরে মা নাড়া দিল যাকে, সে শুধু ” উঁ উঁ উঁ ” বলে পাশ ফিরল।
”ওঠ বাবা। নিতু কখন উঠে বেরিয়ে গেছে, দেরি করিসনি আর।”
”হুঁউউ।”
আরও মিনিট পাঁচেক শুয়ে থেকে শিবা প্রায় লাফিয়েই উঠে পড়ল। ছ্যাঁচা বাঁশের দেওয়ালের ঘর। দেওয়ালের ফাঁকগুলোয় জোনাকির মতো বিন্দু—বিন্দু আলো থেকে সে অনুমান করার চেষ্টা করল সূর্য কতটা উঠেছে। তার মনে হল এখন সাড়ে ছ’টার বেশিই হবে। অবশ্যই তা হলে দেরি হয়ে গেছে।
ওদের একটাই ঘর। তাতে দুই ভাই আর মা থাকে। ঘরটা লম্বায় দশ হাত, চওড়ায় আট হাত। মেঝেয় একসময় সিমেন্টের একটা আস্তরণ ছিল, এখন সবটাই প্রায় চটা ওঠা। ঝাঁট দিলে চুন—সুরকির গুঁড়ো ওঠে। দেওয়ালগুলোয় একটি করে দু’ হাত লম্বা জানলা। দড়িতে ঝুলছে জামা—প্যান্ট ইত্যাদি। চন্দনের ও সিঁদুরের দাগ লাগা লক্ষ্মীর পট যে দেওয়ালে, তার বিপরীত দেওয়ালে আঁটা শীর্ণকায় একটি লোকের আবক্ষ বাঁধানো ফোটো।
