আমি কি নক আউট হয়ে গেছি? শিবা ওঠার চেষ্টা করল। রোজারিও উঠেছিল। রোজারিও মুখ তুলে বারবার রিং—এর পাশে তাকাচ্ছিল। কি অদ্ভুত ওর চোখ! ক্ষীণভাবে শিবার কানে ডাক এল : ”পা…প…পা। পা…প….পা।” ছেলের সামনে রোজারিও বীর হতে চায়।
বীর হতে চায়।
শিবা চাড় দিয়ে হাঁটুর উপর বসেই আবার গড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রণা এবার সারা শরীরে ঢেউয়ের মতো আছড়াচ্ছে। বুকে ব্যথা, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু রোজারিও বীর হতে চায়। কেন আমিও হব না? হব, হব।
দু—হাতে চাড় দিয়ে শিবা অদ্ভুত এক চীৎকার করে উঠে দাঁড়াল। ঝাপসা দেখছে, হাঁটু থরথর করে কাঁপছে। হাঁ করে বাতাস গিলে খেতে লাগল। অন্ধকার, অন্ধকার চারদিক। দূর থেকে ট্রাকের শব্দ আসছে, হেডলাইটের আলো ক্ষীণ স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে। দু—হাত পাশে ছড়িয়ে মুখটা আকাশের দিকে তুলে শিবা দুলতে লাগল।
‘আমি হাত বাড়াব; বল বল আমায় হাত বাড়াতে বল মা।’
তারপর বুনো খ্যাপা হাতির মতো শিবা টলতে টলতে এগোল ঝোপঝাড় মাড়িয়ে, গাছে ধাক্কা খেতে খেতে। নালায় আছড়ে পড়ল, অসমান জমিতে ঠোক্কর খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
‘গেট আপ পাপ্পা। গেট আপ শিবা, কাম—অন শিবা।’ বিড়বিড় করতে করতে শিবা এগোল। অন্ধের মতো দু—হাত বাড়িয়ে। একটা জায়গায় পৌঁছে সে বুঝল এটা বড় রাস্তা। দূর থেকে আলো আর এঞ্জিনের শব্দ এগিয়ে আসছে। শিবা দাঁড়িয়ে রইল হাত তুলে।
পরপর চারটে ট্রাক চলে গেল ওর হাতকে ভ্রূক্ষেপ না করে। মাথাটা ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়; বুকে, পিঠে আর তলপেটের উপর যেন পাহাড় থেকে অবিরাম পাথরের চাঙড় ভেঙে ভেঙে পড়ছে। শিবা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে টলছে। জামাটা ফালা ফালা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বুক। বিড়বিড় করে যাচ্ছে সে : ‘গোমস গোমস এবার আমি কি করব? কি বলছ তুমি? রানিং ইজ দি সোর্স অফ স্ট্যামিনা…বাংলামে বোলিয়ে; স্ট্যামিনা, রিজার্ভ ট্যাঙ্ক…দৌড় দৌড়, রোড ওয়ার্ক কর। ঠিক।’
হঠাৎ শিবা দৌড়তে শুরু করল পিচের রাস্তার ধারে মাটির উপর দিয়ে। অন্ধকার ঠেলে ঠেলে। এলোমেলো পা ফেলে সে ছুটছে। মাঝে মাঝে ট্রাকের আলো তাকে ঝলসে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। শিবা ভ্রূক্ষেপ করল না।
‘রোড ওয়ার্ক, এখন আমার ট্রেনিং চলছে। হট যাও, হট যাও, শিবাজী আইচ এখন দৌড়চ্ছে। ধাক্কা লাগলে তোমরা চুরমার হয়ে যাবে। এখন আমি স্বপ্ন দেখছি, খোয়াব, ভিশ্যন! ইয়েস গোমস ইয়েস…লড়াইয়ের হারজিত হয় জিমে, রাস্তায়। এই যন্ত্রণা জমা থাকবে শরীরের ভেতরে…জমা থাকবে ট্যাঙ্কে।’
আধঘণ্টা পর শিবা হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তার ধারে, নালায়। দেহের সহ্য করার সাধ্যের বাইরে চলে গিয়ে সে দৌড়াচ্ছিল। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা অসাধ্য কাজ। কিন্তু শিবা তখন সাধারণের ঊর্ধ্বে উঠে গেছল। নালায় সামান্য জল ছিল। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে জলের কাছে এনে কয়েক ঢোঁক জল খেয়েই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
দেবদাস পাঠক রোডের মোড়ে ভোরবেলায় আনাজপাতি নিয়ে যারা বসে তারাই প্রথম দেখতে পায়। মুখটা দেখতে পায় নি। রক্তাক্ত দেহ, ছেঁড়া জামা দেখে ভেবেছিল খুন করে ফেলে যাওয়া লাস। ভয়ে কাছে আসে নি। ভীড় জমে গেছল। চিনতে পারে প্রথম বটকেষ্ট। দোকান খোলার জন্য সে যাচ্ছিল। তারপর আসেন ভবানী স্যার। রিক্সাওয়ালারাই শিবাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
দু—দিন পর বিকেলে শিবা হাসপাতালের বেড থেকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। তখন অন্যান্য রুগিদের বেডের কাছে ভীড়। আত্মীয়—স্বজন, বন্ধুবান্ধব দেখতে এসেছে। তার বেডের পাশে কেউ নেই। উদাস চোখে সে তাকিয়ে। আজ দুপুর থেকে সে জ্ঞান ফিরে পেয়েছে, মানুষ চিনতে পারছে।
হঠাৎ তার মাথার দিকের বারান্দায় কণ্ঠস্বর শুনল : ”না গো ওদিকটা নয়, এই দরজাটা দিয়ে, আমি বলছি।”
শিবা টের পেল ঘরের মধ্যে কারা ঢুকল। ঘাড় ঘোরাবার ক্ষমতা তার নেই। মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত প্লাস্টারে মোড়া। মমির মতো তাকে দেখাচ্ছে। চোখের মণি যতদূর সম্ভব ঘুরিয়ে সে দেখল তার মাথার কাছে মা আর সাগর মামী।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে দেখতে পেল দাদাকে, তার পিছনে শ্রীকান্ত দাস। সবাই তার দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টে। কেউ কথা বলছে না। শিবার চাহনি সবার মুখের উপর দিয়ে বারবার ঘুরতে লাগল।
‘ডাক্তার বলেছেন একদম নড়াচড়া নয়। পাঁচহপ্তা পর প্লাস্টার খোলা হবে।’ নিতুর গলা।
‘ডাক্তার বলেছে, কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় শরীরে এমন আঘাত নিয়ে অতটা ছুটে যাওয়া। মাংস একেবারে থেঁতো হয়ে গেছে।’ শ্রীকান্ত দাসের গলা।
পিছনের বারান্দায় আবার কণ্ঠস্বর। ওরা মুখ ফিরিয়ে তাকাল এবং সরে গেল নবাগতদের জায়গা করে দেবার জন্য।
ভবানী স্যার আর শচীন কাকু।
‘কথা বলা ত সম্ভব নয়, পরেই নয় বলব।’ ভবানী স্যার হাসলেন। ‘মনের জোর এবার তোমায় সারিয়ে তুলবে।’
ইতিমধ্যে শচীন জামার পকেট থেকে একটা জিনিস বার করে ফেলেছে। খোসা ছড়ানো একটা সিদ্ধ ডিম।
‘ওমা খাবে কি করে! ওর কি চিবিয়ে কিছু খাবার ক্ষমতা আছে?’ সাগর মামীর কথায় শচীন অপ্রতিভ হয়ে ডিমটা তাড়াতাড়ি পকেটে রাখল।
সবার অলক্ষেই প্রায় ননী কখন যেন ওদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
