‘সুনীল আমার শরীরে কিছু একটা হয়েছে। জোর নেই মাথা ঝিমঝিম করছে।’
শিবা দু—হাতে জড়িয়ে ধরল সুনীলের হাত। চোখে জল এসে গেছে।
‘আমি পারব না রে।’
‘কিছু খেয়েছিস?’
‘না। শুধু কয়েকটা কমলার কোয়া, কান্তিদার হাত দিয়ে গোমস পাঠিয়েছিল।’
‘কখন, কখন?’
‘খানিকটা আগে।’
বজ্রাহতের মতো সুনীল তাকিয়ে রইল শিবার মুখের দিকে। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘আর কিছু করার নেই।’
সত্যিই কিছু করার ছিল না রোজারিওর। শিবা কুঁজো হয়ে যথারীতি বুনো মোষের মতো এগিয়ে গেছল তার দিকে।
এত দূর থেকে সে প্রথম জ্যাবটা পাঠাল যে পৌঁছলই না। রোজারিও অবাক হয়ে যায়। তীক্ষ্ন চোখে লক্ষ্য করে তার মনে হয় শিবা দেখতে পাচ্ছে না ভাল করে। সে এগিয়ে আসে। পরপর দুটো রাইট—লেফট শিবার কাঁধে আর রগের কাছে মারে। ঘুসি খেয়ে পিছিয়ে গিয়েই আবার এগিয়ে এসে শিবা লেফট হুক চালায় এবং রোজারিওর মুখের এক বিঘৎ সামনে দিয়ে ঘুসিটা বাতাস কেটে বেরিয়ে যায়।
এরপর শিবার এক হাতের মধ্যে এসে রোজারিও প্রথমে দুই পাঁজরের মাঝে বুকে, তারপর থুতনিতে আপার কাট বসায়। কাটা কলাগাছের মতো শিবা দড়াম করে পড়ে যায়। ততক্ষণে গ্যালারিতে দর্শকদের মধ্যে চীৎকার শুরু হয়ে গেছে। কাঠের টুকরো, জুতো, আইসক্রীমের কৌটো, এমনকি ইঁটও পড়তে শুরু করেছে রিং—এর মধ্যে।
‘সাজানো…..সাজানো লড়াই।’
‘পয়সা ফেরত চাই।’
দর্শক গ্যালারি থেকে নেমে আসার উপক্রম করছে। প্রচণ্ড লড়াই দেখার জন্য এসে তারা দেখল এক মিনিটেরও কমে নক আউট হল তাদের নায়ক। রেফারির দশ গোনা শেষ হবার পরও শিবা ওঠে নি। রিং—এর মধ্যে সুনীল লাফিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আরো লোক উঠে, সুনীলকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে শিবাকে তুলে নিয়ে গেল রিং থেকে। লোকগুলি যেন তৈরি হয়েই ছিল এরকম কিছু ঘটবে।
শিবাকে সঙ্গে নিয়ে ওই লোকগুলো ট্যাক্সিতে গোরাবাবুর বাড়ি পৌঁছল। তার মাথার মধ্যে ঝিলিক দিচ্ছে তীক্ষ্ন যন্ত্রণা, সারা শরীরে আলস্য, পায়ে জোর নেই দাঁড়াবার। ড্রেসিংরুমে আধঘণ্টা নিস্পন্দ শুয়েছিল সে সংজ্ঞাহীনের মতো।
তাকে নিয়ে লোকগুলি ট্যাক্সি থেকে নেমে বাড়ির মধ্যে ঢুকল। কাউকেই সে চেনে না। ওদের রুক্ষ চেহারা, কর্কশ কণ্ঠস্বর, অমার্জিত ভাবভঙ্গি দেখে শিবার শরীর ছমছম করল। ভিতরের বৈঠকখানা ঘরের দরজা ভেজানো। একজন ভিতরে ঢুকে গেল। তারপরই দরজার দুটো পাল্লা খুলে দাঁড়াল সাধু।
টেবল ল্যাম্পের চাপা আলোয় ঘরটা অন্ধকার। সাধুর কাঁধের পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে গোরাবাবু চেয়ারে বসে। হঠাৎ শিবার দুটি বাহু পাশের দুটি লোক আঁকড়ে ধরল। ছাড়িয়ে নেবার জন্য হাত ঝাঁকতে গিয়ে শিবা বুঝতে পারল, বৃথা চেষ্টা। তার দেহে কোনো জোর নেই।
‘তোকে একদিন না একদিন পাব, আমি জানতুম।’
ঠান্ডা গলায় মৃদু স্বরে সাধু বলল, ইশারা করতেই লোক দুটো শিবাকে ঠেলে দিল ঘরের মধ্যে। টাল সামলে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধের উপর হাতুড়ির মতো পড়ল সাধুর জোড়া মুষ্ঠি। যন্ত্রণায় অস্ফুট আর্তনাদ করে শিবা নিচু হতেই, সাধু ডান পা তুলে লাথি কষাল তার পেটে। পিছন দিকে হেলে পড়ে যাচ্ছিল। ওরা তাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিল।
‘সাধু একদম খতম করো না।’
ঘাড় ফিরিয়ে সাধু পিছনে গোরাবাবুর দিকে তাকাল। চোখে হিংস্র বীভৎস চাহনি।
‘বয়স অল্প, পৃথিবীর অনেক কিছুই এখনো ত দেখে নি। দেখুক, শুনুক, বুঝুক। সেজন্য একটা সুযোগ না দিলে অন্যায় করা হবে।’ বলতে বলতে গোরাবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আবার সাধু এগিয়ে এসে শিবার সামনে দাঁড়াল। মুখোমুখি, এক হাত দূরে। দু—জনে একদৃষ্টে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে প্রায় এক মিনিট। দু—হাতে সাধু ধরল শিবার দুই বাহু। সাপের মতো হিসহিস করছে সাধুর নিঃশ্বাসের শব্দ।
‘আমার চোয়ালের কথা মনে আছে? আমার গায়ে হাত তোলার সাহস কেউ আজ পর্যন্ত দেখায় নি। তুই এখনো বেঁচে আছিস এটাই আশ্চর্য ব্যাপার।’
শিবার মনে হল দুটো সাঁড়াশি তার বাহু চেপে ধরেছে। মাথার মধ্যে ঘূর্ণিটা সমানে চলেছে। পেটে যন্ত্রণা হচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে সাধুর ডান হাতের বাইসেপস শক্ত হচ্ছে। ঘুসি মারার আগে এই রকম হয়। কিছু করার নেই।
দক্ষতা নেই কিন্তু জোর আছে ঘুসিটায়। শিবার কানের পাশে যেন বোমা ফাটল। মাথাটা হেলে পড়ল। মাথার মধ্যে ভোমরা ডেকে উঠল। সাধু বাঁ হাতে ঘুসি চালাল। শিবার মুখ ঘুরে গেল।
হেভিব্যাগে পাঞ্চ করার মতো দুহাতে সাধু ঘুসি মেরে যেতে লাগল তার সারা শরীরে। পিছন থেকে ওরা তাকে ধরে আছে। কখন সে জ্ঞান হারাল শিবা তা জানে না।
কখন সে জ্ঞান ফিরে পেল তাও শিবা জানে না। গাঢ় অন্ধকার। বহু দূরে ট্রাক চলার শব্দ আর হর্ন শোনা যাচ্ছে। তাকে কোথাও ফেলে দিয়ে গেছে। নরম মাটি, ঘাস, গাছপালার গন্ধ। শিবা ওঠার চেষ্টা করে পারল না। শরীরে কোনো অনুভূতি নেই শুধু ভোঁতা একটা যন্ত্রণা ছাড়া। হামা দিয়ে সে কয়েক হাত এগোল। অন্ধকার অন্ধকার চারিদিকে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটতে নোনতা স্বাদ পেল। সামনের দুটো দাঁত বোধ হয় নেই, ফাঁকা লাগছে। মাথা ঘুরে সে আবার শুয়ে পড়ল। দপদপ করছে আলো, গাঢ় হলুদ আর সবুজ। …দেয়ালে ঝুলছে বিবেকানন্দ আর রামদা, টপটপ রক্ত ঝরছে রামদা থেকে। ….একঘেয়ে সুরে মন্ত্র পড়ছে ন্যাড়ামাথা লোকেরা, তাদের মধ্যে বটকেষ্ট। ভোমরা ডাকটা ক্রমশ বাড়ছে।
