শিবা একমাস ধরে ট্রেনিং করেছে ই সি পি সি এ রিং—এ। গোরাবাবুর সঙ্গে লালবাগান জিমন্যাসিয়ামের বহু ব্যাপারেই বনিবনা নেই। তাই ওখানে তিনি শিবাকে যেতে দেন না। আশ্চর্য ঘটক বা গোমসের সঙ্গে শিবার সম্পর্ক ছেদ হয়ে গেছে গোরাবাবুর বাড়িতে এসে ওঠার পর থেকেই। গত একমাস সে নিয়মিত স্পার করেছে সুনীলের সঙ্গে; ভোরে দৌড়েছে গঙ্গার ধার দিয়ে; স্কিপ করেছে; হেভিব্যাগে ঘুসি মেরে মেরে আঙুলের গাঁটে কড়া তৈরি করে ফেলেছে। সে নিশ্চিত ছিল ফাইনালে হারের শোধ তুলে নেবে।
লড়াইয়ের আগে সে ত্রিপল ঘিরে বানানো ড্রেসিংরুমের এককোণে বেঞ্চে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল। ত্রিপলের ওধারে দশহাত দূরেই আর একটি ড্রেসিংরুমে রোজারিও। তাদের লড়াই ছিল সবার শেষে। আগের লড়াইয়ের বক্সাররা তৈরি হচ্ছে রিং—এ যাবার জন্য। ছোট্ট জায়গাটায় ভীড় ছিল। সেই সময় কান্তি সরকার এসেছিল।
‘কিরে, এভাবে শুয়ে কেন, একটু ফ্রি হ্যান্ড কর, স্যাডো কর।’
‘করছি।’ শিবা পাশ ফিরে বলল। কান্তিকে দেখে সে একটু অবাক হল, ভালও লাগল। লালবাগানেই তার বক্সার জীবনের জন্ম, প্রথম ঘুসি খাওয়ার অভিজ্ঞতা এই কান্তিরই হাতে। যদিও এই লোকটিকে সে মনের গভীরে ঘৃণা করে তবু লালবাগানের মানুষ কাছে পেয়ে তার বুকে তিরতির আবেগ বইতে শুরু করে।
‘তোর কথা আশ্চর্যদা, গোমস প্রায়ই বলে। শিবা বড় হয়ে একদম ভুলে গেছে আমাদের।’
শুনে কলকল করে উঠল শিবার বুকের মধ্যে, একটু অভিমানও হল।
‘বারে, ওরা ত কেউ আমার খোঁজ নেয় নি! বোম্বাইয়ে গোমস যদি রিং—এর পাশে থাকত আমি হারতুম না। কিছুতেই না।’
‘খোঁজ নেয় নি কিরে? বোম্বাইয়ে দু—দিনে তিনটে নক আউট করলি, সেই দু—দিন লালবাগানে আশ্চর্যদা শুধু গল্পই করেছে শিবার হেভিব্যাগ ফাটানোর। গোমস কেক কিনে এনে বিলিয়েছে। এই দ্যাখ না আজ সকালে গোমস চারটে কমলালেবু দিয়ে বলল, আমার গুড উইশ জানিও আর লড়াইয়ের আগে খেতে বলো। এনার্জি দেবে, স্ট্যামিনা পাবে।’
কান্তি সরকার হাতের কাগজের মোড়ক থেকে প্লাস্টিকের টিফিন কৌটো বার করল।
‘একেবারে ছাড়িয়েই এনেছি।’ এই বলে সে এগিয়ে ধরল কৌটোটা। শিবা একমুঠো কমলার কোয়া তুলে নিয়ে মুখে পুরল। গোমসের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল এসে গেছে।
‘গোমস বলেছে আজ ফার্স্ট রাউন্ড নক আউট হবেই।’
‘সত্যি?’
‘সত্যি। ওর দারুণ বিশ্বাস তোর উপর। বলেছে, শিবার স্পিডের কাছে দাঁড়াবার মতো কেউ এখন ইন্ডিয়ায় নেই। অমন পাঞ্চের জোরও কারুর নেই।’
কান্তি কৌটোটা এগিয়ে ধরল আবার। শিবা আরো কয়েকটা কোয়া তুলে মুখে পুরল। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে। ঠিক তখনই ড্রেসিংরুমের বাইরে যাবার পর্দা তুলে দাঁড়াল সাধু। শিবা তাকাল। সাধুর মুখ ধীরে ধীরে হাসিতে ভরে উঠল। ও নাকি কখনো হাসে না, তাই শিবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। পর্দাটা ফেলে দিয়ে সাধু চলে গেল।
‘ব্যাটা এখানে কেন? সুবিধের ব্যাপার নয়। দাঁড়া আমি দেখে আসছি।’ বলতে বলতে কান্তি সরকার উঠল এবং যাবার সময় অন্যমনস্কের মতো টিফিন কৌটোটা হাতে নিয়েই বেরিয়ে গেল।
অদ্ভুত এক অজানা ভয়ে শিবা অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করে। সাধু হাসল কেন? বাইরে তখন তুমুল চীৎকার। ব্যান্টাম ওয়েটের একটা লড়াই চলেছে। সুনীল বাইরে রয়েছে লড়াই দেখতে।
শিবা ড্রেসিংরুমের পর্দা তুলে রিং—এর দিকে তাকাল। গুমোট ভ্যাপসা পরিবেশ। রিং—এ দু জন বক্সার ঘামছে। একজন জ্যাব করছে, প্রদীপ শিখার মতো হাতটা দপদপাচ্ছে আর অন্যজন পতঙ্গের মতো জ্যাবের আওতায় আসছে আর পিছিয়ে যাচ্ছে। একজন ভারী মন্থর অন্যজন চটপটে। শিবা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একবার ঝাপসা দেখল যেন। চোখে ঘাম গড়িয়ে পড়েছে কি? দু—হাতে চোখ কচলাল। মাথার মধ্যে একবার ঝিমঝিম করে উঠল। তাড়াতাড়ি সে ড্রেসিংরুমে ঢুকে জাগ থেকে জল নিয়ে চোখে ঝাপটা দিল। বার কয়েক চোখের পাতা পিট পিট করে নিয়ে দূরে একটা লোকের দিকে তাকাল। পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছে কিন্তু এক একবার অসাড় হয়ে আসছে মাথার মধ্যে। ঝিমধরা ভাব মাথা থেকে শরীর বেয়ে নীচে নামছে।
সুনীল এল। শিবা তাকাল তার মুখের দিকে। মনে হল একবার যেন মুখটাকে সে ঝাপসা দেখল।
‘সুনীল, কেমন যেন লাগছে রে। শরীরটা অবশ মনে হচ্ছে।’
‘নার্ভাস হোস নি শিবা, এখন নার্ভাস হলে বিপদ।’
‘না না, নার্ভাস হই নি। মাথার মধ্যে কি রকম যেন—ঠিক বোঝাতে পাচ্ছি না তোকে।’
শিবার আঙুলে ব্যান্ডেজ জড়াতে শুরু করেছে সুনীল। কথা বলল না। ড্রেসিংরুমে ঢুকলেন গোরাবাবু সঙ্গে প্রিয় হালদার।
‘সব ঠিকঠাক আছে ত?’
সুনীল ঘাড় নাড়ল। গোরাবাবু হাত রাখলেন শিবার কাঁধে।
‘ফার্স্ট রাউন্ডেই।’
কাঁধে কয়েকটা চাপড় দিলেন। শিবা একদৃষ্টে তাকিয়ে ব্যান্ডেজ জড়ানোর কাজ দেখছে।
‘শিবা করতে পারলে অনেক টাকা তুমি পাবে। অভাব থাকবে না। খাওয়া পরার যা কষ্ট পেয়েছ মনে আছে ত?’
শিবা মুখ তুলল না। প্রিয় হালদার ফিসফিস করে গোরাবাবুর কানে কি বলল। তিনি মাথা নাড়লেন, তারপর ঝুঁকে শিবার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘অনেক টাকা আমার গেছে এবার যেন না যায়, তাহলে কিন্তু তোমার কেরিয়ার আজই খতম হবে।’
শিবা যখন মুখ তুলল, গোরাবাবুরা তখন ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে গেছে। তার হাঁটু দুটো আলগা লাগছে, কাঁধ থেকে হাত দুটো খুলে পড়বে মনে হচ্ছে। এ রকম কেন হচ্ছে? মরীয়া হয়ে সে মনে মনে ব্যাপারটা বুঝতে চাইল না। যদি না পারি তাহলে কেরিয়ার খতম! পারব না কেন? কিন্তু শরীরটা এ রকম করছে কেন? চোখে ঠিক দেখতে পাচ্ছি না কেন? কেরিয়ার খতম হলে কোথায় যাব, কি খাব, কোথায় থাকব?
