শিবা হাঁটতে হাঁটতে, আহিরিটোলা থেকে বেরিয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। একটা ৩২ নম্বর বাস তার সামনে দাঁড়াল। কন্ডাক্টর—’শ্যামবাজার, বরাহনগর, দক্ষিণেশ্বর’ বলে চীৎকার করতেই, কিছু না ভেবেই সে ছুটে গিয়ে উঠল। মনটা কোথায় ছিল, এবার যেন সে তার হদিশ পাচ্ছে।
শ্যামবাজারে সে বাস বদল করল। ড্রাইভারের পিছনে দাঁড়াবার জায়গা পেল। পিঠের উপর ভীড়ের চাপ। মুখ নিচু করে সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। দেবদাস পাঠক রোডের দিকে যত এগোচ্ছে তার বুকে ধুকপুকানি ততই বাড়ছে। ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর একটা প্রশ্ন তার মনে বারবার জেগে উঠতে লাগল : কেন যাব? শেষবার বলে এসেছে—’আসব, হ্যাঁ সোনার বকলস পরেই আসব। সেদিন সবাই এসে আমার পা চাটবে।’ নিশ্চয় ওরা সেকথা মনে রেখেছে। ওখানে গেলে সবাই তাকিয়ে থাকবে কিন্তু কেউ কথা বলবে না। কেউ অবাক চোখে, কেউ বিদ্রূপভরা চোখে। কিন্তু ওদের সকলের অন্তরেই ত থাকবে একই জিনিস—ঘৃণা। হেট।
দেবদাস পাঠক রোডের মোড়ে বাস থামতেই শিবা জানালা দিয়ে তাকাল। জায়গাটা ঠিক একই রকম রয়েছে। মোড়ে বসে আছে ফল নিয়ে আজম, হাওয়াই চটি নিয়ে শামুয়া, সকালের বাসি কাগজ সাজিয়ে রতনের বাবা। ঠেলাগাড়িতে প্লাস্টিকের জিনিস নিয়ে লোকটা যার নাম সে জানে না। স্ট্যান্ডে দুটো রিক্সা। সিটের উপর বসে আছে কালু আর বড়ভোলা। চায়ের গ্লাস হাতে পচা দর্জির দোকানে ঢুকল। গ্রেট বেঙ্গলের সন্তাোষ আর পল্টু, ওদের পিঠটুকু মাত্র সে দেখতে পেল। সন্তাোষ ছুটছে আর রেঞ্চ হাতে পল্টু তাড়া করেছে। প্রায়ই খুনসুটি বাধে ওদের মধ্যে। ননীটা কোথায়? উলটোদিক থেকে দক্ষিণমুখো একটা বাস থেমে গিয়ে শিবার দৃষ্টি আড়াল করল।
তার বাসটা স্টার্ট নিয়েছে। এখানে বাস প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে গেছে। শিবা নামল না, নামতে সাহস হল না। দেবদাস পাঠক রোড ছাড়িয়ে বাস এগোল, শিবা কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়েই আছে। লোভীর মতো, যতটুকু দেখা যায় এই অঞ্চলটা, চোখ দিয়ে চেটেপুটে নিতে লাগল।
রাস্তার আধখানা খুঁড়ে পাইপ বসানো হচ্ছে। বাকি আধখানা দিয়ে গাড়ি যাতায়াত করে। দু—দিকেই সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে। হর্নের আওয়াজ আর চীৎকার চলেছে। শিবা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখল এই গোলমালের কারণ একটা রিক্সা।
বিরাট তিনটে বস্তা, দুটো পাদানিতে একটা সিটে বসানো। রিক্সার একটা চাকা পড়েছে গর্তে। রিক্সাওয়ালা সিটে কুঁজো হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে পায়ের। তার জামায় বোতাম নেই। জিরজিরে বুকের পাঁজরগুলো যেন ফেটে পড়বে। ঘাড়ে গর্ত হয়ে কণ্ঠার হাড় ঠেলে বেরোচ্ছে। রস বার করে নেওয়া আখের ছিবড়ের মতো শুকনো পা দুটোয় যতটুকু পেশী আছে, দড়ির মতো তা পাকিয়ে উঠেছে। রিক্সাটা বিন্দুমাত্রও নড়ছে না।
‘আরে নেমে গিয়ে পিছন থেকে ঠ্যাল না।’
বাস ড্রাইভারের চীৎকার শুনে রিক্সাওয়ালা মুখ তুলল। ননীর বাবা রাধেশ্যাম!
শিবা প্রায় লাফ দিয়ে বাস থেকে নামল। রাধেশ্যাম রিক্সা থেকে নামার আগেই সে রিক্সার পিছনে গিয়ে দু—হাত লাগিয়েছে, সামনে ঝুঁকে মুখটা রাস্তার দিকে নিচু করে। একটা চাকা গর্তে আটকে গেছে। ঠেললেও ওঠে না। অমানুষিক শক্তিতে শিবা চাকাটা টেনে তুলে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিতেই রিক্সাটা এগিয়ে গেল। শিবা মুখ তুলতেই অবাক রাধেশ্যামের সঙ্গে একবার চোখাচোখি হল মাত্র। তারপরই প্যাডেল করতে করতে সে রিক্সা নিয়ে চলে গেল।
বোধ হয় চিনতে পারে নি। না পারুক, শিবার মন ঝলমল করে উঠল খুশিতে। তার হাতে কাদা, হাঁটুর কাছে এবং জুতোয়ও কাদা। সপ্রশংস চোখে বাসযাত্রীরা তার দিকে তাকিয়ে। সে হাত নেড়ে অপেক্ষমাণ বাস ড্রাইভারকে চলে যাবার ইঙ্গিত করে দক্ষিণমুখো বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। উত্তরে আর তার যাবার দরকার নেই। কিছু একটা করতে পেরেছে, এখন এটাই তাকে ভীষণ উত্তেজিত করে তুলেছে। এই রাধেশ্যামই একদিন তাকে ‘ভগমান’ বলেছিল। হয়তো ও জানে না, আজ শিবাই তার রিক্সাকে টেনে তুলেছে। কোনোদিনই জানবে না। না জানুক, শিবা খুশিতে ঝরঝরে বোধ করল।
রাত্রে শিবাকে ডেকে পাঠালেন গোরাবাবু।
‘টুর্নামেন্টটার ডেট এগিয়ে আনতে হল, এশিয়ান গেমস ট্রায়ালের আগেই করার জন্য। তুমি তৈরি আছ ত?’
‘হ্যাঁ।’ শিবা বেশ উৎসাহভরেই বলল। যদিও সে জানে লড়াইয়ের জন্য তার শরীর একদমই অপ্রস্তুত।
‘রোজারিওর সঙ্গেই লড়তে হবে। ওর কাছে হারের শোধ নেবে বলে তুমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—এইভাবে পাবলিসিটি করা হবে। ফার্স্ট রাউন্ডেই নক আউট করবে বলেছ, এই কথাটাও থাকবে। ক্যাসিয়াস ক্লে—র কায়দায় আর কি। সে যেমন আগেই বলে, কত রাউন্ডে নক আউট করবে, সেই রকমই খবরের কাগজে বলা হবে। পোস্টারও দেওয়া হবে। পারবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার অনেক টাকা লোকসান করেছ, মনে আছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘অবশ্য টাকায় নক আউটটা ম্যানেজ করতে পারি। কিন্তু বেহরাম সেজন্য অনেক টাকা চাইবে। তার থেকে তুমি যদি করেই ফেলতে পার তাহলে ও পথে যাব না, দরকারই হবে না। অনেক টাকা ধরব তোমার উপর, পারবে?’
‘হ্যাঁ। ফার্স্ট রাউন্ডেই করব।’
পাঁচ
ফার্স্ট রাউন্ডেই শিবা নক আউট হয়েছিল। টিনের চালার ইনডোর স্টেডিয়ামে রিং তৈরি করে, তার চারদিকে গ্যালারি বসিয়ে টিন দিয়ে ঘিরে, প্রথম অল ইন্ডিয়া ইনভিটেশন বক্সিং টুর্নামেন্ট শুরুর সাতদিন আগে থেকেই প্রচার হয়েছিল দারুণ লড়াই হবে শিবাজী আইচের সঙ্গে ফ্রান্সিস রোজারিওর। প্রেস কনফারেন্স, পোস্টার, হ্যান্ডবিল, ব্যানার হোর্ডিং ইত্যাদি সব মিলিয়ে ফ্রি স্টাইল কুস্তিতে দারা সিং—কে যেমন তুলে ধরা হয়, তেমনি ভাবেই এই লড়াইটাকে চাঞ্চল্যকর উত্তেজক করে তোলা হয়েছিল প্রচার মারফৎ।
