‘পাপ্পা কাম অন……ফাইট?’
শিবার স্মৃতির রেলগাড়ি একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তার মাথা থেকে বেরিয়ে রওনা হয়ে গেল। ঘণ্টা পড়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু হবে। মাথাটা এখন গ্রামের স্টেশনের নির্জন প্ল্যাটফর্মের মতো ফাঁকা। রোজারিও উঠে এগিয়ে আসছে। সেদিন সাধুর চোয়াল ভেঙে শাস্তি দিয়েছিল একজন। সে কোথায় এখন? যখন রোজারিওর মুখোমুখি হল শিবা, তখন তার মনের গভীরে শুঁয়োপোকার মতো একটা ভয় নড়ে বেড়াতে শুরু করেছে। অসহায় বোধ করে সে দু—পাশে দ্রুত তাকিয়ে নিল। চীৎকার উঠল ‘কীল, কীল। শিবাজী কীল।’
সে এখন কোথায়?
শিবা একটা জ্যাব ছুঁড়েই পাশে সরে গেল। রোজারিওর চোখের দিকে তাকিয়ে পুরু চশমার কাচ দেখতে পেল সে। বিদ্যুতের তীব্র আলো পড়ে বরফ কুচির উপর সূর্যরশ্মির মতো ঝকমক করছে। শিবার চোখ ধাঁধিয়ে আসছে। সে শুধুই ঘুরতে শুরু করল রিং—এর ভিতর রোজারিওকে দূরে রেখে।
‘কাম অন শিবাজী….নক হিম, নক হিম আউট।’
রোজারিওর দুটো হাত সাপের ফণার মতো এক একবার এসে ছোবল দিয়ে যাচ্ছে শিবার মুখে, বুকে কাঁধে। দর্শকরা এবার শিবাকে দুয়ো দিতে শুরু করল। তারা মার দেখতে চায়, রোজারিও মারছে।
দ্বিতীয় রাউন্ড শেষ হতেই শিবা নিজের কর্নারে এসে দু—হাতে মুখ ঢেকে বসল।
‘ফেক, ফেক নকলি হ্যায়, শিবাজী ইজ এ চিট।’
চীৎকার। সাত—আট হাজার দর্শক খেপে গেছে। সুনীল জল এগিয়ে দিল। সে খেল না। তোয়ালে দিয়ে হাওয়া করে যাচ্ছে, কথা না বলে। শিবা বুঝে গেছে সে হারছে এবং হারবে। মনের মধ্যে অবসন্নতা, শরীরও অবসন্ন লাগছে। নিজের উপর আর আস্থা নেই। যতবার সে রোজারিওর দিকে তাকিয়ে রক্তে ভেজা গেঞ্জি, ফুলে ওঠা নাক, তাকে বিষণ্ণ করেছে। প্রতিবারই তার মনে হয়েছে, এই লোকটা আজ হারবে না। ঠিক করেই রিং—এ নেমেছে। গোমস বলেছিল, চ্যাম্পিয়ন তৈরি হয় তাদের ভিতরের, একেবারে ভিতরের জিনিস থেকে—সেটা হল ইচ্ছা,….মনের জোর যাকে বলে উইল। রোজারিওর ইচ্ছা : ছেলের সামনে উজ্জ্বল বীর হবে। ছেলের মনে বাবার এই ছবি চিরকালের জন্য আঁকা থাকুক।
শিবা মাথা নাড়ল। সে কারুর জন্য ছবি আঁকতে চায় না। তার কোনো ইচ্ছা নেই, শুধু কিছু টাকা রোজগার করা ছাড়া। মনের জোর না থাকলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না।
শিবা চ্যাম্পিয়ন হতে পারে নি। তৃতীয় রাউন্ড ছিল দ্বিতীয়বারেই পুনরাবৃত্তি। পয়েন্টে সে হেরে যায়। ধিক্কার আর দুয়ো শুনতে শুনতে সে রিং থেকে নামে। ড্রেসিংরুমে যাবার সময় দেখতে পায় বেঙ্গল ক্রিকেট টিমের তিনটি মেয়ে। তাকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। সুনীল বলল, ‘গোরাবাবু আজই তোকে দেখা করতে বলেছে।’
.
ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামের লাগোয়াই অ্যাসটরিয়া হোটেল। দর্শকরা চলে যাবার পর স্টেডিয়াম ফাঁকা হয়ে যেতে শিবা ড্রেসিং রুম থেকে বেরোয়। মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে সে হোটেলে এল। সঙ্গে সুনীল। চারতলায় লিফট থেকে বেরিয়ে ৪১২ নম্বর ঘরের সামনে ইতস্তত করে টোকা দিল। দরজা খুললেন গোরাবাবু স্বয়ং।
”এসো।”
ওরা দুজনে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করলেন। থমথমে মুখ।
”কাল কি বলেছিলে আমায়?”
শিবা মাথা নিচু করে রইল।
”আমার কত টাকা ক্ষতি করেছ তা জান? অপদার্থ হাম্বাগ কোথাকার। খেতে পাচ্ছিলে না, মাথার উপর একটা চালা পর্যন্ত ছিল না, তুলে এনে খাইয়েছি, ঘর দিয়েছি, টাকা দিয়েছি আর তার বদলে পেলাম লোকসান আর ক্ষতি। ইডিয়ট, অশিক্ষিত শুধু বুকনিসর্বস্ব।”
রাগে কাঁপছিলেন গোরাবাবু। হঠাৎ দু—পা এগিয়ে এসে শিবার গালে ঠাস করে চড় কষালেন। হতভম্ব চোখে শিবা তাকিয়ে রইল।
”সব জারিজুরি ভেঙে যাবে এই লেফট হুক চোয়ালে পড়লে।” গোরাবাবু বিদ্রূপে ভেংচে উঠলেন। ‘কোথায় সেই লেফট হুক? পাঁঠার মতো শুধু বড়াই, ফার্স্ট রাউন্ডে জিতবই। থার্ড ক্লাস বক্সার একটা, শুধু গায়ের জোর ভাঙিয়ে বরাত জোরে নক আউটগুলো করে ধরাকে সরা দেখা! লাথি মেরে বিদায় করব। কথা শুনে বিশ্বাস করে এখন লোকসান হল তেরো হাজার টাকা। পারবে, পারবে এই টাকা ফিরিয়ে দিতে?’
মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে শিবাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। গোরাবাবু যদি তাড়িয়ে দেয় তাহলে সে যাবে কোথায়?
‘মনে রেখো এই লোকসান উশুল করে দিতে হবে। ইনভিটেশন টুর্নামেন্ট কলকাতায় হবে ঠিক হয়েছে। অনেক বড় টাকার খেলা। এই রোজারিও সঙ্গেই তোমায় লড়তে হবে। যদি আবার আমায় ডোবাও তাহলে চিরতরে যাতে তোমার বক্সিং ঘুচে যায় সে ব্যবস্থা আমি করব। যাও।’
গোরাবাবু আঙুল দিয়ে দরজা দেখালেন। নিঃশব্দে ওরা দু—জন বেরিয়ে এল। রাস্তায় পা দিয়েই শিবা জিজ্ঞাসা করল সুনীলকে, ‘আমি পারলুম না কেন বল ত?’
‘তোকে দেখে মনে হচ্ছিল তোর মন যেন লড়াইয়ে নেই, অন্য কোথাও।’
.
বহুদিন আগে বোম্বাইয়ে রাস্তায় সুনীলের বলা কথাকটি এই বিকেলে মনে পড়ল।
অন্য কোথাও! কোথায় ছিল মন?
জুতোর ফিতে বাঁধার জন্য ঝুঁকতেই শিবার স্ফীত পেটে চাপ পড়ল। বিড়বিড় করল : ট্রেনিং শুরু করতে হবে কাল থেকেই।
ঘর থেকে বেরিয়ে অন্যমনস্কের মতো দরজায় তালা দিল। মালগাড়ি শান্টিংয়ের শব্দ বন্ধ হয়েছে। আকাশের হালকা হলুদ রং বদলে শ্লেট রং ধরেছে। নিমগাছে অজস্র কিচিরমিচির চলেছে। এই রকম সময়ে সে বড় একা বোধ করে এখন একবার ই সি পি সি এ—তে যেতে পারলে ভাল হত। ওখানে সুনীল আছে। ওর সঙ্গে তিন রাউন্ড স্পার করে এলে কেমন হয়। তারপরই সে হতাশভাবে মাথা নাড়ল। শরীরটাকে তৈরি না করে স্পার করার মানে হয় না। তাছাড়া মহাদেবদার ওখানে এখন সুনীল থাকবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত। বঙ্গবাসীতে রাতে বি কম পড়ে। ছেলেটা ভাল, প্রচুর সাহায্য করেছে বেঙ্গল চ্যামপিয়নশিপে তার হাতে মার খাওয়ার পরও।
