রোজারিও দূরে দূরে ঘুরছে। হয়তো জেনে গেছে শিবার মনের কথা। শিবা এগোল। রিংটাকে আড়াআড়ি কেটে এগোতে এগোতে সে রোজরিওকে কর্নারে নিয়ে যাচ্ছে। দর্শকরা বুঝতে পেরেছে খতম করার জন্য শিবা এবার একটা কিছু করবে। তারা প্রায় একসঙ্গেই চীৎকার করে উঠল : ‘কীল, কীল, কীল।’
শিবার লেফট হুক তৈরি হয়ে ওঠার আগেই রোজারিও এগিয়ে এসে জড়াজড়ি করে ফেলল। শিবার গলায় ওর ডান হাত। জোরে হাত চালাবার পথ বন্ধ। ব্যর্থ ঘুসি রোজারিওর বগলের নীচে মারতে মারতে শিবা ঠেলে সরাতে চাইল। কিন্তু রোজারিও ছাড়ছে না।
‘ব্রেক।’ রেফারি হুকুম দিল।
পিছিয়ে যেতে গিয়ে শিবার ডান পা সামান্য পিছলে গেল। অতি সামান্য এবং শিবার চোখ পলকের জন্য ক্যানভাসের দিকে নেমেছিল। তখনি ঠিক কানের উপর রোজারিওর রাইট সুইংটা এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে একটা স্ট্রেট লেফট। শিবা দড়াম করে ক্যানভাসের উপর পড়ল।
মাথার মধ্যে ভোমরার ডাক শুরু হয়েছে। ঘরের দরজা খুলছে…গাঢ় হলুদ আর সবুজ আলো দপ দপাচ্ছে। শিবা এই জাগরণ, আধ—স্বপ্ন অবস্থাটা জানে। ভোমরা ডাকের মতো মাথার ঝিমঝিমানিটা বন্ধ করে দিতে পারলে ঘরের মধ্যে ঢুকেও সে বেরিয়ে আসতে পারবে। মাথা ঝাঁকাল সে। হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসল। এলোমেলো বোধটা ঠিক হয়ে আসছে। দেখতে পাচ্ছে রোজারিওকে দূরে কর্নারে দাঁড়িয়ে।
‘সেভেন….এইট….’
উঠে দাঁড়াল শিবা। তিন মিনিটের অনেকখানি চলে গেছে। আর নয়, আর নয়, এবার ওকে মেরে শুইয়ে দিতে হবে, শুইয়ে দিতে হবে। মনে মনে শিবা গর্জে উঠে তেড়ে গেল। চারদিকে ঢেউয়ের মতো ভেঙে পড়েছে গর্জন। নক আউট চাই! নক আউট!
শিবার মুখে জ্যাব পড়ল। পেটে একটা ডান হাতের। সে কিছুই অনুভব করল না। রোজারিওর ঘুসিতে জোর নেই। শিবা খুঁজছে, বাঁ হাতের পাল্লায় রোজারিওকে পেতে। পেয়েও গেল। লেফট হুকের সঙ্গে সঙ্গে নাকের নীচে ছুঁড়ে দিল স্ট্রেট রাইট।
পড়ে গেছে রোজারিও। গলগল রক্ত ঝরছে নাক থেকে। বাজ পড়ার মতো একসঙ্গে কয়েক হাজার কণ্ঠের উল্লাস কাঁপিয়ে তুলল স্টেডিয়ামকে। যা চাইছিল ওরা তা পেয়েছে।
‘পাপ্পা….পাপ্পা।’
একটা কচি গলা ডেকে উঠল। ছোট্ট ফোঁপানি উঠল।
‘পাপপা। পাপ….পা।’
রোজারিওর ক্যানভাস থেকে মুখ তুলল। দু—হাতে ভর দিয়ে দেহের উপরিভাগ তুলে তাকাল যেদিক থেকে ডাকটা আসছে। দু—চোখে ঠিকরে উঠল দুর্দমনীয় জেদ আর ইচ্ছা, যন্ত্রণায় গালের পেশীগুলো দুমড়ে যাচ্ছে। প্রাণপণে সে দেখতে চাইছে তার রক্তমাংসের প্রতিচ্ছবিকে যার সামনে সে নায়ক হয়ে বিরাজ করতে চায়।
‘ফাইভ…সিক্স…’
‘পাপ্পা গেট আপ।’
রোজারিওর মাথাটা অল্প অল্প নড়ে উঠল। টপ টপ রক্ত থুতনি বেয়ে গেঞ্জির উপর পড়ছে। বিড়বিড় করে কিছু বলল। তারপর শরীরের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে যখন উঠে দাঁড়াল রেফারি তখন ”টেন” উচ্চচারণ করছে।
কর্নার থেকে শিবা দ্রুত এগিয়ে আসছে। রোজারিও মুখের সামনে দু—হাতের গার্ড রেখে টলতে টলতে পিছিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই ঘণ্টা পড়ল প্রথম রাউন্ড শেষ হবার। শিবা বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইল রোজারিওর দিকে। সাদা গেঞ্জিটা লাল হয়ে গেছে। গালে, কাঁধে রক্তের ছোপ। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। সম্মোহিতের মতো শিবা সিং—এর বাইরে তাকাল। নীল বড় বড় চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে। এক হাতে আঁকড়ে রয়েছে তার মায়ের বাহু।
অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা আর দুঃখ শিবার মনের মধ্যে ছেয়ে আসছে। ধীরে ধীরে সে নিজের কর্নারে ফিরে এল। অবসাদে তার শরীর ভেঙে পড়তে চাইছে। আবছা একটা স্মৃতি, একটা চেহারা, টুকরো কথা ক্রমশ এগিয়ে আসছে রেলগাড়ির মতো গমগম শব্দ তুলে।
শিবার মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে সুনীল ঝড়ের মতো নির্দেশ উপদেশ ধমক, অনুরোধ দিয়ে চলল। কিছুই ঢুকল না তার কানে। অপর কর্নারে টুলে বসা রোজারিওর দিকে তাকিয়ে সে। এবং এই সময়েই তার মাথার মধ্যে স্মৃতির রেলগাড়িটা এসে পৌঁছল। তার থেকে নেমে এল ভবানী স্যার আর সাধু। এগিয়ে এসে সাধু ভবানী স্যারের ডান হাতটা মুঠোয় ধরল। সাধুর হাতের পেশীগুলো দপ করে লাফিয়ে উঠেই পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। স্যারের মুখে যন্ত্রণার কুঞ্চন একবার ফুটে উঠেই মিলিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক হল। সাধুর ফর্সা মুখ টকটকে দেখাচ্ছে, কপালে বিনবিনে ঘাম, চোয়াল শক্ত হচ্ছে।
‘শিবা তুই ভুল করছিস।’ সুনীল বলে যাচ্ছে। ‘নক আউট করার জন্য চেষ্টা করিস নি, পারবি না। রোজারিও পয়েন্ট তুলে নিচ্ছে। তুই বাজে লড়ছিস?’
ফ্যাল ফ্যাল করে শিবা তাকিয়ে রইল সুনীলের মুখের দিকে। তার ওই ঘুসি খেয়েও রোজারিও উঠে দাঁড়াল। তিনটে নক আউট এই ঘুসিতেই হয়েছে অথচ ও উঠে দাঁড়াল! কিসের জোরে উঠল! তার চোখের সামনে ভাসছে ভবানী স্যার। মাথাটি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে যাচ্ছে, শরীরটা আস্তে আস্তে কুঁজো হয়ে এল ভবানী স্যারের—’আমি নুইব না, নুইব না।’
শিবার বুক থরথর করে কাঁপতে লাগল। রোজারিও নুয়ে পড়ল না। কি অসম্ভব ক্ষমতায় সে উঠে দাঁড়াল। এই ক্ষমতা পেল কোথা থেকে? রোজারিও এখন ভবানী স্যার হয়ে গেছে, শিবা শিউরে উঠে ভাবল, তাহলে এখন আমি কি সাধু হয়েছি? সেদিন শিবা নামে একজন সাধুকে ঘাড় ধরে টেনে ঘুরিয়ে দিয়ে বলেছিল—
